ক্ষুধা-দারিদ্র্য অবসান ও আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনে
দি হাঙ্গার প্রজেক্টের নীতিমালা
(Principles
of The Hunger Project for achieving self-reliance)
গত
কয়েক বছর থেকে আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাব্রতী সংস্থা দি হাঙ্গার প্রজেক্ট সমগ্র
বাংলাদেশের আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনে এক ব্যতিক্রমধর্মী কর্মকান্ড শুরু করেছে৷
সমাজের সর্বস্তরের প্রতিনিধি সমন্বয়ে স্থানীয় সংগঠন ও স্থানীয় নেতৃত্ব
সৃষ্টির মাধ্যমে এ কর্মকান্ড একটি সংঘবদ্ধ সামাজিক আন্দোলনে রূপ নিয়েছে৷
নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. অমর্ত্য সেন ও বিশ্বব্যাংক এর প্রেসিডেন্ট
জেমস্ ডি. উলফেনসন এর এক যৌথ রচনায় উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিদিন পৃথিবীতে
মোট ৪০,০০০ শিশু অপুষ্টি তথা অনাহারজনিত কারণে মারা যায় (দৈনিক প্রথম আলো,
২২ জুন ১৯৯৯) এই অবস্থা বিরাজ করছে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর৷
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে অপুষ্টিজনিত ক্ষুধার কারণে প্রতিদিন ৬৫৫ জন
শিশু অকালে মৃত্যুবরণ
করে৷
বাংলাদেশ সম্ভবত বিশ্বের একমাত্র দেশ যেখানে মানুষগুলো অপুষ্টির কারণে
ক্রমশ আকারে ছোট হয়ে যাচ্ছে৷
প্রোটিন গ্রহণের আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী বাংলাদেশের ৫ বত্সরের নিচে
শিশুদের মাত্র ৬% কে স্বাভাবিক বলা যাবে৷
বাকি ৯৪% অপুষ্টিতে আক্রান্ত৷
(UNICEF
et al. “A Fork in the Path,” undated)
এই ব্যাপক অপুষ্টি - যার অপর নাম 'নীরব ক্ষুধা' (chronic
persistent hunger)
দূর করা সম্ভব৷
আমরা যদি এ ব্যাপারে সচেতন হই, নিজেরা দায়িত্ব নেই এবং সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ
করি তবে এ অবস্থার পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী৷ 'দি
হাঙ্গার প্রজেক্ট' বাংলাদেশে সেই লক্ষ্য অর্জনে তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে
সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে কাজ করে যাচ্ছে৷
আমরা মনে করি, বাংলাদেশের সকল মানুষের জন্যে ক্ষুধা অবসানের লক্ষ্যে কাজ
করা কেবল একটি নৈতিক বিষয়ই নয়, একটি বাস্তব প্রয়োজন৷
ক্ষুধার অবসান বলতে জীবনের সার্বিক অবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তন বোঝায়৷
ক্ষুধার অবসান মূলত একটি মানবিক বিষয়৷
মানুষ এর শিকার৷
মানুষের একক, দলবদ্ধ এবং সমন্বিত প্রচেষ্টাতেই তা দূর করা সম্ভব৷
অনুদাননির্ভর গতানুগতিক কর্মসূচীর মাধ্যমে শুধুমাত্র স্বল্পসংখ্যক মানুষকে
সুবিধা প্রদান না করে গোটা সমাজ থেকে স্থায়ীভাবে ক্ষুধা অবসানের লক্ষ্যে
সমগ্র জনগোষ্ঠীকে ক্ষমতায়িত করার ব্রত নিয়ে দি হাঙ্গার প্রজেক্ট কাজ করে
যাচ্ছে৷
বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ যাতে একটি নতুন ভবিষ্যত্ - ক্ষুধামুক্ত -
আত্মনির্ভরশীল ভবিষ্যত্ গড়ে তুলতে পারে - এ লক্ষ্যে যথাযথ কর্মকৌশল চিহ্নিত
ও বাস্তবায়নে জনগণকে সহায়তা করতে হাঙ্গার প্রজেক্ট প্রতিশ্রুতিবদ্ধ৷
হাঙ্গার প্রজেক্ট এর কাজের উদ্দেশ্যই হলো এমন একটি সহায়ক পরিবেশ গড়ে তোলা
যাতে মানুষ তাদের অবস্থা পরিবর্তনে এগিয়ে আসে, দায়িত্ব নেয় এবং কার্যক্রম
শুরু করে৷
প্রয়োজন এক নতুন বিশ্বাস, দৃষ্টিভঙ্গী ও
নীতিমালা
দি হাঙ্গার প্রজেক্ট মনে করে, বাংলাদেশ থেকে ক্ষুধা অবসান করতে হলে প্রয়োজন
এক নতুন বিশ্বাস দৃষ্টিভঙ্গী ও নীতি৷ এমন বিশ্বাস যে, আমাদের পক্ষে ক্ষুধার
অবসান করা সম্ভব৷ এ বিশ্বাস বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দি হাঙ্গার প্রজেক্ট
তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ১০টি নীতি প্রণয়ন করেছে৷ উপর
থেকে চাপিয়ে দেয়া কিংবা কেবল পন্ডিতদের বিজ্ঞ মতামতের ভিত্তিতে এগুলো
প্রণীত হয়নি৷ তাই এগুলো বেদবাক্য বা শেষ কথা নয়৷ এই নীতিগুলো এমন এক
বিশ্বাসের প্রতিফলন যা অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে অর্জিত এবং যা অভিজ্ঞতার
ভিত্তিতেই পরিবর্তনশীল৷
আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনের ১০টি নীতিকে মোট ৩টি ভাগে ভাগ করা হয়েছে৷ এগুলো
হলো -
মানুষ হিসেবে আমাদের বৈশিষ্ট্য
নতুন ভবিষ্যত্ সৃষ্টির ভিত্তি
এক নতুন চিন্তাধারা ও কর্মসূচী
এখানে আমরা যে ১০টি নীতি সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরেছি তা আত্মনির্ভরশীলতা
অর্জনের লক্ষ্যে আমাদের কার্যক্রম পরিচালনার নীতিমালা
৷ কোন একটি এলাকায়
আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনে বা ক্ষুধা অবসানে কি পদক্ষেপ নেয়া হবে এ নীতিমালা
তা বলে দেয় না কিন্তু এগুলোকে পরিচালন নীতি (guiding
principles)
হিসেবে ব্যবহার করলে তা এমন এক পথরেখা সৃষ্টি করতে পারে যা সাফল্যের সূচনা
করবেন ৷ এগুলোই ছিল তাদের হাতিয়ার৷ সারাদেশে কয়েক হাজার উজ্জীবক এই নীতিমালা
অনুসরণ করে নিজেদের এলাকার সমস্যাগুলো সমাধানের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে৷
দি হাঙ্গার প্রজেক্ট এর নীতিমালাগুলো কোন দার্শনিক সংকটের প্রেক্ষাপটে জন্ম
নেয়নি৷ এগুলো সারাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পরিচালিত কার্যক্রমের
অভিজ্ঞতাপ্রসূত বিশ্বাস, অন্ধবিশ্বাস নয়৷ মানুষের আত্ম উন্নয়ন প্রচেষ্টার
অগ্রগতির গভীর বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে তা গৃহীত হয়েছে৷ আলোচ্য ডকুমেন্টে উক্ত
১০টি নীতি সংক্ষিপ্তভাবে উপস্থাপন করা হলো৷
মানুষ হিসেবে আমাদের বৈশিষ্ট্য
মানুষ হিসেবে আমরা কারা, আমাদের সামর্থ্য কি এবং কিভাবে সেই সামর্থ্য
ক্ষুধা অবসানে ভূমিকা রাখতে পারে তার অনুসন্ধান ক্ষুধা অবসানের ক্ষেত্রে
জরুরী৷ কেননা, মানুষ সম্পর্কে আমাদের যে বিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গী তার উপরই
আত্মনির্ভরশীলতার কার্যক্রমগুলো গৃহীত হয়ে থাকে৷ আমরা মনে করি, মানুষ
হিসেবে আমাদের বৈশিষ্ট্য দুটি স্তম্ভ বা নীতির উপর দাঁড়িয়ে আছে৷
১. মানুষের
অন্তর্নিহিত ক্ষমতা বা আত্মশক্তি
(The
Human Spirit): দি হাঙ্গার প্রজেক্ট
বিশ্বাস করে, সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে সকল মানুষই একটি বিশেষ ক্ষমতার
অধিকারী৷ তা হলো আত্মশক্তি৷ আত্মশক্তি হলো একজন মানুষের অন্তর্নিহিত কতগুলো
মানবিক গুণাবলী বা বৈশিষ্ট্যের সমষ্টি৷ যেমন, আত্মমর্যাদাবোধ, সৃজনশীলতা,
ইচ্ছাশক্তি, আত্মবিশ্বাস, প্রত্যাশা, প্রত্যয়, প্রতিশ্রুতি, একতাবদ্ধ হয়ে
কাজ করার ক্ষমতা ইত্যাদি৷ এ সকল গুণাবলীর দ্বারা মানুষ নিজেকে পরিচালিত
করে৷ এগুলোই একজন মানুষের মূল পূঁজি৷ এ বৈশিষ্ট্যগুলোর জন্যই আমরা
নিচ/অন্যান্য প্রাণী থেকে আলাদা৷ একজন মানুষ ধনী বা স্বল্পবিত্তের ঘরে
জন্মাতে পারে কিন্তু তাতে করে আত্মশক্তির কোন তারতম্য ঘটে না৷
ধনী-স্বল্পবিত্ত, জাতি, ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সবারই তা রয়েছে৷ আত্মশক্তিতে
বলীয়ান ব্যক্তি কখনও দরিদ্র থাকতে পারে না৷ তাই আত্মশক্তিতে বলীয়ান মানুষ
গড়ার মাধ্যমেই আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গঠন করা সম্ভব৷
দি হাঙ্গার প্রজেক্ট বিশ্বাস করে, কেবলমাত্র জীবনের নূ্যনতম চাহিদাগুলি
মেটানো ছাড়াও একজন মানুষের আত্মমর্যাদার সাথে বেঁচে থাকার চাহিদা রয়েছে৷
প্রত্যেক মানুষই তার জীবনকে অর্থবহ করতে চায়৷ এ চেতনার ভিত্তিতে একজন মানুষ
কেবল তার নিজের জীবনই নয়, অন্যের জীবনেরও উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক পরিবর্তন
সাধন করতে পারে৷ তাই সমাজের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া মানুষটিও নিজের জীবনের হাল
ধরতে ও অন্যকে সহায়তা করতে পারে৷
২. পারস্পরিক
সম্পৃক্ততা (Interconnectedness): মানুষ হিসেবে আমাদের
প্রত্যেকের জীবনের সঙ্গে প্রতিটি মানুষের, এমনকি এই পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণী
ও পরিবেশের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে৷ প্রতিটি মানুষের কর্মকান্ড সমগ্র মানব
সমাজ ও প্রাকৃতিক পরিবেশের দ্বারা প্রভাবিত হয় এবং তাদের উপরও প্রভাব
বিস্তার করে৷ বস্তুত আমাদের সকলের জীবন একই সুতোয় গাঁথা৷ যে সমস্যা আমরা
একা সমাধান করতে পারি না সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টায় তা সহজেই সমাধান করা সম্ভব৷
কারণ একতাই শক্তি৷ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে, "দারিদ্র্য হলো ভূতের ভয়ের মত,
একা থাকলে আসে সমবেত হলে পালায়"৷ আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যকে পুরো সমাজ
এমনকি সমগ্র মানব জাতির জন্য বিস্তৃত করা অত্যাবশ্যক৷ তাই 'এ পক্ষ' বনাম 'ও
পক্ষ' (us vs them) এই মনোভাব বা দ্বন্দ্বের মানসিকতা পরিত্যাগ করে ক্ষুধার
অবসানে একতাবদ্ধ হয়ে কাজ করা প্রয়োজন৷
ক্ষুধা-দারিদ্র্য দূরীকরণের লক্ষ্যে আমাদের একক এবং সমবেত কর্মকান্ড যেন
প্রাকৃতিক পরিবেশের উপর বিরূপ প্রভাব না ফেলে৷ তা না হলে আমাদের বর্তমান
উন্নয়ন প্রচেষ্টা আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যত্ উন্নয়ন কার্যক্রমকে ব্যাহত
করবে৷ যা হবে স্থায়ী ও টেকসই উন্নয়নের (sustainable
development) পরিপন্থি
যেমন, বর্তমানে চাষের ফলন বাড়ানোর জন্য রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হচ্ছে
কিন্তু এর ফলে পরিবেশের উপর যে বিরূপ প্রভাব পড়ছে তা ভবিষ্যত প্রজন্মের
জন্যে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে৷ আরেকটি উদহারণ, ধরা যাক আমরা আমাদের
আর্থিক চাহিদা মেটানোর জন্য গাছ কেটে বিক্রি করলাম কিন্তু নতুন করে গাছ
লাগানো হলো না৷ এর ফলে ভবিষ্যত প্রজন্ম কি গভীর সংকটের মুখে পড়বে ভাবা যায়!
এ ধরনের উন্নয়ন পদক্ষেপ পারস্পরিক সম্পৃক্ততার নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ
নয়৷
নতুন ভবিষ্যত সৃষ্টির ভিত্তি
ক্ষুধা অবসান করতে হলে আমাদেরকে বিরাজমান অবস্থার (status
quo) পরিবর্তন
ঘটাতে হবে৷ চলমান গতানুগতিক কার্যক্রম আর উপলদ্ধি দিয়ে তা করা যাবে না৷
মানব ইতিহাসের সবচেয়ে পুরাতন ও জটিল সমস্যা 'ক্ষুধা' অবসান করতে আরও ৪টি
নীতির প্রয়োজন৷ আমরা এই ৪টি নীতিকে আমাদের কাঙ্ক্ষিত নতুন ভবিষ্যত সৃষ্টির
ভিত্তি বলছি৷
৩. প্রত্যাশা
(Vision):
আত্মনির্ভশীলতা অর্জনে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বা
নীতি হলো প্রত্যাশা৷ প্রত্যাশা একটি জাতির বা যে কোন কার্যক্রমের জন্য খুবই
গুরুত্বপূর্ণ৷ প্রত্যাশা হলো ভবিষ্যতের এমন একটি রূপরেখা যা অর্জন করা
সম্ভব এবং অর্জন করা প্রয়োজন৷ সাধারণত আমরা প্রত্যাশা এবং
স্বপ্ন/লক্ষ্য/আশা ইত্যাদিকে এক বলে মনে করি৷ কিন্তু প্রত্যাশা হলো এমন
একটি আশা যার সংগে যুক্ত থাকে প্রত্যয়৷ অর্থাত্ প্রত্যয়+আশা = প্রত্যাশা৷
প্রত্যাশা একজন মানুষকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়৷ সকলেরই জীবনে কোন না কোন
প্রত্যাশা রয়েছে৷ বর্তমানে কি কার্যক্রম হাতে নেয়া হবে তা নির্ভর করছে
ভবিষ্যতের জন্য আমরা কি প্রত্যাশা করছি তার উপর৷ যেমন, যে ছাত্রটি ভবিষ্যতে
ডাক্তার হতে চায় সে বর্তমানে জীববিজ্ঞান বা বিজ্ঞান বিষয়ে অধিক মনোযোগী
হবে৷ নেলসন ম্যান্ডেলা জীবনের ২৭টি বছর কারাগারে কাটিয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকা
থেকে বর্ণবাদী বৈষম্য বিলোপের প্রত্যাশায়৷ শুধু ব্যক্তির নয়, জাতীয় জীবনেও
প্রত্যাশা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ৷ আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণার উত্স
ছিল স্বাধীন স্বদেশ গড়ার প্রত্যাশা৷ ইতিহাসের শিক্ষা হলো প্রত্যাশাবিহীন
জাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়৷
যে প্রত্যাশা নিয়ে দি হাঙ্গার প্রজেক্ট কার্যক্রম পরিচালনা করছে তা হলো -
বাংলাদেশের সকলের জন্য একটি সুন্দর, আত্মনির্ভরশীল ভবিষ্যত্ সৃষ্টি করা৷
এমন একটি ভবিষ্যত্ , যেখানে সকল নারী, পুরুষ ও শিশু একটি সুখী,
স্বাস্থ্যবান, উত্পাদনশীল এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবন লাভ করবে৷
৪. প্রতিশ্রুতি বা
অঙ্গীকার (Commitment): প্রতিশ্রুতি হলো একজন মানুষের
সেই শক্তি যা তার প্রত্যাশা বাস্তবায়নে তাকে গতিশীল রাখে৷ প্রতিশ্রুতির
শক্তিবলে সে তখনও কার্যক্রম অব্যাহত রাখে যখন অন্যেরা বলে এটা সম্ভব নয়৷
এমনকি ব্যক্তি নিজেও যখন দ্বিধান্বিত হয়ে পড়ে তখনও প্রতিশ্রুতির শক্তি তাকে
এগিয়ে নিয়ে যায়৷ প্রতিশ্রুতি একজন সাধারণ মানুষকে অসাধারণ মানুষে পরিণত
করে৷ প্রতিশ্রুতি আমাদেরকে শত বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও সামনে এগিয়ে যাওয়ার
প্রেরণা যোগায়৷ 'বর্তমান বাস্তবতা' ও 'ক্ষুধা অবসানের প্রত্যাশা' এই দুইয়ের
মধ্যে যে দূরত্ব রয়েছে তা দূর করতে প্রতিশ্রুতি বা অঙ্গীকারের প্রয়োজন৷
প্রতিশ্রুতির শক্তিই হলো ক্ষুধা অবসানের চাবিকাঠি৷
ক্ষুধা-দারিদ্র্য অবসান একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ, তাই আমাদেরকেও দুঃসাহসী হতে
হবে৷ এর জন্য প্রয়োজন প্রতিশ্রুতির শক্তিতে বলীয়ান হওয়া৷ বাংলাদেশের
প্রতিটি এলাকা থেকে ক্ষুধা-দারিদ্র্য অবসান করার জন্য প্রয়োজন একদল সাহসী ও
প্রতিশ্রুতিবদ্ধ মানুষ৷ আমাদের দৃষ্টিতে ক্ষুধা অবসানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ
ব্যক্তি হলেন, নজরুলের ভাষায় "প্রবল অটল বিশ্বাস যার নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসে/
... কোন বাধা তার রোধে নাকো পথ / কেবল সমুখে চলে"৷ মুক্তিযোদ্ধারা
প্রতিশ্রুতির শ্রেষ্ঠ উদহারণ৷ স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ার জন্য তাদের দৃঢ়
প্রতিশ্রুতি ও মনোবলের কাছেই মূলত পাকিস্তানীদের পরাজয় ঘটেছে, তাদের
অস্ত্রের কাছে নয়৷
৫. নেতৃত্ব
(Leadership): নেতৃত্ব সকল মানবিক সাফল্যের চাবিকাঠি৷ ক্ষুধা
অবসানের অভিযানে নেতৃত্ব খুবই প্রয়োজন৷ এর জন্য জাতীয় থেকে স্থানীয় পর্যায়ে
অনেক নেতৃত্ব (a
community of leaders) প্রয়োজন৷ সমাজের সকল স্তর থেকে
আগত এই নেতৃত্ব হবে ন্যায়পরায়ন, সত্ ও আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনের নীতিমালার
প্রতি শ্রদ্ধাশীল৷ ক্ষুধা-দারিদ্র্য দূরীকরণের অভিযানে নেতৃত্বের অভাব
সম্পর্কে হা-হুতাশ করা বাঞ্ছনীয় নয়৷ আমরা মনে করি, একটি গ্রামে কাজ করার
জন্য যে নেতৃত্ব প্রয়োজন, তা সেই গ্রামেই রয়েছে৷ একটি দেশের জন্য যে
নেতৃত্বের প্রয়োজন, তাও সেই দেশে রয়েছে৷ তাই আমাদের কাজ হলো স্থানীয় জনগণের
মধ্যে থেকে যাতে সেই নেতৃত্ব গড়ে ওঠে এবং বিকশিত হয় সে ব্যাপারে সহায়তা
করা৷
এই নেতৃত্বের অন্যতম কাজ হবে জনগণের মধ্যে ক্ষুধা অবসানের প্রত্যাশা ও
প্রতিশ্রুতি জাগিয়ে তোলা এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে জনগণকে উদ্ধুদ্ধ ও
সংগঠিত করা৷ গতানুগতিক নেতৃত্ব থেকে এ নেতৃত্ব সম্পূর্ণ ভিন্ন৷ যারা এগিয়ে
আসে, দায়িত্ব নেয়, ঝুঁকি গ্রহণ করে এবং অন্যের নেতৃত্বকে বিকশিত করে তারাই
নেতা৷ নেতৃত্ব পরিচালিত হয় প্রত্যাশা ও প্রতিশ্রুতির দ্বারা এবং বিকশিত হয়
যথাযথ কার্যক্রম গ্রহণের লক্ষ্যে মানুষকে সংগঠিত করার মাধ্যমে৷
৬. কৌশল ও কার্যক্রম
(Strategy
and action): ক্ষুধা-দারিদ্র্য অবসানের
মত বিশাল কর্মকান্ডে সফলতার জন্য অর্থনির্ভর এবং উপর থেকে চাপিয়ে দেয়া
গতানুগতিক পদক্ষেপগুলোর গন্ডিমুক্ত হতে হবে৷ সীমিত সম্পদের মাধ্যমে ক্ষুধার
মত জটিল সমস্যা মোকাবেলা করতে হলে প্রয়োজন সৃজনশীল ও কম ব্যয়ে অধিক ফল
লাভের কৌশল (high
leverage action)৷ আমাদেরকে এমন কার্যক্রম হাতে নিতে
হবে যা অগ্রযাত্রায় জ্যামিতিক মাত্রায় (২, ৪, ৮, ১৬ ইত্যাদি) অবদান রাখবে৷
আমাদের পদক্ষেপ স্থানীয় কোন কাজের পুনরাবৃত্তি (duplicate) যাতে না ঘটায়
তাও নিশ্চিত করতে হবে৷ এ ধরনের আত্মবিশ্লেষণের আলোকে সম্পদ সংগ্রহ ও
পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে নমনীয় দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন৷
কৌশলগত কার্যক্রমের উদাহরণ হিসেবে আমরা 'ক্যারম' খেলার উল্লেখ করতে পারি৷
ক্যারম খেলায় সাধারণত লক্ষ্য করা হয় কিভাবে এক চালে একাধিক গুটি পকেটে ফেলা
যায়৷ যে যত বেশী গুটি এক চালে ফেলতে পারে তাকেই তত ভালো খেলোয়াড় বা কৌশলী
বলা হয়ে থাকে৷ ক্যারম খেলায় পরবর্তী চালের চিন্তা আগে করে বর্তমান চাল
দেওয়া হয়৷
প্রয়োজন এক নতুন চিন্তাধারা ও কর্মসূচী
দি হাঙ্গার প্রজেক্ট দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, প্রকৃত অর্থে কার্যকর একটি কৌশল
নির্ধারণ ও কার্যক্রম গ্রহণের জন্যে গতানুগতিক চিন্তাধারার গন্ডি অতিক্রম
করতে হবে৷ মানুষের সৃজনশীলতার ভিত্তিতে গৃহীত নতুন চিন্তাধারা ও কর্মকৌশল
ক্ষুধা অবসানের কার্যক্রমের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হতে হবে৷ নিচের চারটি নীতি
(১০টির মধ্যে) হলো সেই নতুন চিন্তাধারার মূল উপাদান (key
elements)৷
৭. আত্মনির্ভরশীলতা
(Self-reliance): প্রচলিত চিন্তাধারায়
স্বল্পবিত্তের মানুষগুলোকে সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, সমাধান হিসেবে
নয়৷ তাদেরকে আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনের প্রাথমিক কারিগর বা উপাদান হিসেবে নয়,
উপকারভোগী হিসেবে মনে করা হয়৷ যে প্রচেষ্টা মানুষকে 'উপকারভোগী' হিসেবে
চিহ্নিত করে তা তাদের আত্মমর্যাদাবোধ কেড়ে নেয়৷ দি হাঙ্গার প্রজেক্ট
বিশ্বাস করে, নিজের জীবন এবং উন্নয়নের নিয়ন্তা হওয়ার অধিকার, দায়িত্ব এবং
ক্ষমতা প্রতিটি মানুষের আছে৷ তাই আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনের কার্যক্রম শুরু
হতে হবে মূলত স্থানীয় জনগণের নিজস্ব সৃজনশীলতা, দক্ষতা, সম্পদ ও সিদ্ধান্ত
গ্রহণের মাধ্যমে৷ এগুলোই হলো আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনের ভিত্তি৷ উন্নয়ন
কর্মীদেরকে কেবল আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনের লক্ষ্যে কাজ করলেই চলবে না,
আত্মনির্ভরশীলতার ভিত্তিতেও কাজ করতে হবে৷ আত্মমর্যাদাকে ভূলুন্ঠিত করে কোন
সহযোগিতা গ্রহণ করলে তা আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনের মূল চেতনার সাথে
সঙ্গতিপূর্ণ হবে না৷ ভিক্ষা দিয়ে ভিক্ষুক বানানো যায়, কিন্তু আত্মনির্ভরশীল
করে তোলা যায় না
৷
৮. সহায়ক পরিবেশ (Enabling
environment):
একথা অনস্বীকার্য যে, একজন মানুষের আত্মউন্নয়ন
প্রচেষ্টা কতখানি সফল হবে তা নির্ভর করে সমাজে কি ধরনের সহায়ক পরিবেশ
বিরাজমান তার উপর৷ উদাহরণ স্বরূপ
বলা যেতে পারে বীজ বপনের পর সেটির যথাযথ অঙ্কুরোদ্গমের জন্য চাই পর্যাপ্ত
আলো, বাতাস, পানি ইত্যাদি৷ এ আলো, বাতাস,
পানিই হচ্ছে বীজের বিকাশের জন্য সহায়ক পরিবেশ৷ বীজটির
অঙ্কুরোদ্গমের সকল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র সহায়ক পরিবেশের অভাবে
বীজটি নষ্ট হয়ে যেতে পারে৷ একই ভাবে
আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনের লক্ষ্যে মানুষের প্রচেষ্টাগুলো সফল হওয়ার জন্যও
চাই সহায়ক পরিবেশ৷ এটা চিরন্তন যে,
মানুষ তার উন্নয়নের জন্য প্রতিনিয়ত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং যাবেই৷ এ ক্ষেত্রে
প্রয়োজন একটি সহায়ক পরিবেশ - যার ফলে তাদের আত্মনির্ভরশীল উন্নয়ন প্রচেষ্টা
সফল হবে৷
সহায়ক পরিবেশ মানুষের উন্নয়ন প্রচেষ্টাকে বেগবান ও বিকশিত করে তাকে
আত্মনির্ভরশীলতার পথে চালিত করে৷ সহায়ক পরিবেশ
সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি কবিতার উদ্ধৃতি দেয়া যেতে পারে, "তোরা
পারবিনে কেউ ফুল ফোটাতে / যতই তোরা পাপড়ি টানিস, আঘাত করিস বোঁটাতে / তোরা
পারবিনে কেউ ফুল ফোঁটাতে৷" অর্থাত্ আমরা যেমন জোর করে ফুল ফোটাতে পারিনা,
পারিনা ফল পাকাতে, তেমনি কেবল উপর থেকে সার্কুলার জারি বা একদল
কর্মকর্তা-কর্মচারীর উপর নির্ভর করে মানুষকে আত্মনির্ভরশীল করে তুলতে পারি
না৷ বরং একজন মালীর মতো
গাছের জন্য একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে পারি যা আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনের
পথ প্রশস্ত করবে৷
৯. নারীর ক্ষমতায়ন বা বিকাশ (Empowerment
of women):
ক্ষুধা ও দারিদ্র্য অবসানে নারীরাই মূল চাবিকাঠি৷ সাধারাণত
খাদ্য উত্পাদন, পুষ্টি, পরিবার-পরিকল্পনা, প্রাথমিক স্বাস্থ্য ও শিক্ষার
মতো অত্যাবশ্যক ক্ষেত্রসমূহে নারীরাই প্রাথমিক ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন
করে থাকে৷ একজন শিক্ষিত,
স্বাস্থ্যবান ও উপার্জনশীল নারী ভবিষ্যত্ প্রজন্মের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও
সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পারে৷
আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনে তাই নারীর ক্ষমতায়নকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া আবশ্যক৷ এর মাধ্যমে
একদিকে যেমন তাদের নিজেদের জীবন, তেমনি তাদের সাথে সম্পৃক্ত পরিবারের সকলের
অবস্থার উন্নয়ন নিশ্চিত হবে৷
নারীর ক্ষমতায়নের মূলকথা হলো এটি একটি চেতনাবোধ৷ এর ভিত্তি হলো
একটি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও আত্মবিশ্বাস৷ সৃষ্টির সেরা
জীব হিসেবে নারীরাও অসাধারণ শক্তির আধার৷ পুরুষদের
তুলনায় তাদের বুদ্ধি, বিবেচনা, সৃজনশীল ক্ষমতা, মেধা, কর্মোদ্যম ইত্যাদি
কোনো অংশেই কম নয়৷ তারাও সম্পূর্ণ৷ নারীদেরকে
এসকল ক্ষমতার স্বীকৃতি দেয়া, তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দেয়া এবং
তাদের প্রতিভা বিকাশের জন্য সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করাই নারীর ক্ষমতায়নের মূল
উদ্দেশ্য৷ নারীরা শিক্ষিত,
সুস্বাস্থ্যের অধিকারী, সংগঠিত এবং কর্মসংস্থান ও রোজগারে সক্ষম হলে আমাদের
আগামী বংশধরদের জন্য একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দ্বার আপনা থেকেই খুলে যাবে৷ এ বিবেচনাই
হওয়া উচিত নারীর ক্ষমতায়নের প্রধান শর্ত৷
আমরা মনে করি নারীর সম্পূর্ণতার পরিপূর্ণ বিকাশ প্রয়োজন৷ তার
সৃজনশীলতা, আত্মমর্যাদা ও উত্পাদনশীলতা একটি পরিবার বা সমাজের জন্য সমভাবে
গুরুত্বপূর্ণ৷ যেমন রোকেয়া নারীর
ক্ষমতায়নের গুরুত্ব প্রসঙ্গে বলেছেন, "যে শকটের (গাড়ি) একচক্র বড় (পতি) এবং
এক চক্র (পত্নী) ছোট হয়, সে শকট অধিক দূর অগ্রসর হতে পারে না; সে কেবল একই
স্থানে (গৃহ কোণেই) ঘুরিতে থাকিবে ...৷" তাই, নারীর ক্ষমতায়ন অর্থ পুরুষকে
ক্ষমতাহীন করে ফেলা নয়৷ আমরা বিশ্বাস
করি সকলের জন্য একটি আত্মনির্ভরশীল ভবিষ্যত অর্জন করতে হলে নারী-পুরুষ
উভয়েরই অংশগ্রহণ প্রয়োজন৷
বিশ্বব্যাপী দায়িত্ব ও অংশীদারিত্ব (Global
responsibility):
ক্ষুধা-দারিদ্র্য বিচ্ছিন্নভাবে কোন একটি এলাকার বা জাতির সমস্যা নয়৷ এটি বিশ্ব
মানবতার জন্য একটি সমস্যা৷ তাই
বিশ্বব্যাপী সহযোগিতা এ সমস্যা সমাধানের জন্য অপরিহার্য৷ তবে সেই
সহযোগিতা যেন চ্যারিটি বা দান-খয়রাতের ভিত্তিতে না হয়৷ অনুদান বা
দান-খয়রাত অনেক সময় দাতার অপরাধবোধ থেকে সৃষ্টি হয়৷ এ ক্ষেত্রে
গ্রহীতার অবস্থার কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন হলো কি না তা নিয়ে দাতা সাধারণত
ভাবে না৷ কিন্তু মর্যাদাপূর্ণ
ও টেকসইভাবে ক্ষুধা অবসানের জন্য প্রয়োজন মানুষের প্রতি গভীর ভালাবাসা,
অঙ্গীকার ও তাদের উন্নয়নে বিনিয়োগ৷ চ্যারিটি নয়৷ এ বিনিয়োগের
প্রতিদান (return)
হবে ক্ষুধা-দারিদ্র্যের অবসান৷
কেন এই নীতিমালা?
গতানুগতিক উন্নয়ন প্রচেষ্টার ব্যর্থতার একটি বড় কারণ হলো সফল অভিজ্ঞার অন্ধ
অনুকরণ৷ কোনো
নির্দিষ্ট এলাকায় সৃষ্ট মডেলের পুনরাবৃত্তির প্রবণতা৷ অথচ যে কোনো
সফল প্রচেষ্টার মূলে থাকে স্থানীয় জনগণের উদ্যোগ ও সৃজনশীলতা - যা বিকশিত
হয় ব্যতিক্রমীভাবে এবং যার পুনরাবৃত্তি বস্তুত অসম্ভব৷ তাই এক এলাকার
সমাধান কৌশল অন্য এলাকার সমস্যা সমাধানে কার্যকর নাও হতে পারে৷ প্রতিটি
এলাকায় আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনের জন্য ভিন্ন ভিন্ন কর্মপদ্ধতি ও কৌশল
প্রয়োজন৷ তবে এ ১০টি নীতি (guiding
principles)
সকলের জন্য দিকনির্দেশনা সৃষ্টি করতে পারে৷ কার্যক্রম
গ্রহণে এগুলো কষ্ঠিপাথর হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে৷
মানুষকে ক্ষমতায়িত করার প্রক্রিয়া সমপ্রসারণের মাধ্যমে ক্ষুধার অবসান হবে,
কোনো মডেল অনুকরণ করে নয়৷ যে গ্রামে
ক্ষুধা-দারিদ্র্য বিরাজমান সেখানে প্রতিটি ব্যক্তির প্রত্যাশা, নেতৃত্ব ও
সৃষ্টিশীলতা বিকশিত হলে তাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা এবং সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণের
মাধ্যমে তারা নিজেরাই সফলতা অর্জন করবে৷
নীতিমালা অনুশীলন বা প্রয়োগ
কোনো উদ্যোগ এই ১০টি নীতির আলোকে পরিচালিত হচ্ছে কি না তা কিভাবে বোঝা
যাবে? এর কোনো সরল-সোজা উত্তর নেই৷ আত্ম
অনুসন্ধান, বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যেতে
পারে৷
তবে, নীচে প্রতিটি নীতিমালার সাথে কতগুলো প্রশ্ন যেভাবে জুড়ে দেয়া হয়েছে
কার্যক্রম গ্রহণের ক্ষেত্রে সেই প্রশ্নগুলো করা এবং তার সদুত্তর থেকে একটি
সিদ্ধান্তে পৌঁছা
সহজ হবে বলে আমাদের বিশ্বাস৷
ক্রম
নীতি
প্রতিটি
কার্যক্রম গ্রহণের ক্ষেত্রে নিজেকে প্রশ্ন করুন-
১.
আত্মশক্তি
কাজটি কি মানুষের
আত্মশক্তির স্বীকৃতি দিচ্ছে? কিভাবে
কাজটি কি মানুষের
আত্মশক্তি বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি করবে? কিভাবে
২.
পারস্পরিক
সম্পৃক্ততা
কাজটি কি জনগণকে
একতাবদ্ধ / সম্পৃক্ত করবে, নাকি বিভেদ সৃষ্টি করবে? কিভাবে?
কাজটি কি প্রাকৃতিক
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করবে? কিভাবে?
৩.
প্রত্যাশা
কাজটির জন্য মানুষের
মধ্যে প্রত্যাশা সৃষ্টি হয়েছে কি? কিভাবে?
৪.
প্রতিশ্রুতি
কাজটির প্রতি জনগণ কি
প্রতিশ্রুতিবদ্ধ? কিভাবে?
৫.
নেতৃত্ব
কাজটির মাধ্যমে
স্থানীয় নেতৃত্বের বিকাশ হচ্ছে কি? কিভাবে?
৬.
কৌশল ও
কার্যক্রম
কাজটি কি কৌশলগত?
কিভাবে?
এটি কি অন্যের কাজের
পুনরাবৃত্তি? কিভাবে?
কাজটি কি কম খরচে অধিক
ফল সৃষ্টি করবে? কিভাবে?
৭.
আত্মনির্ভরশীলতা
কাজটি কি
আত্মনির্ভরশীলতার ভিত্তিতে গৃহীত? কিভাবে?
কাজটির মাধ্যমে কি
পিছিয়ে পড়া জনগণ আত্মনির্ভর হবে? কিভাবে?
৮.
সহায়ক পরিবেশ
কাজটি জনগণের জন্য
সহায়ক? কিভাবে?
এর ফলে কি জনগণের জন্য
নতুন কোনো সুযোগ সৃষ্টি হবে? কিভাবে?
৯.
নারীর
ক্ষমতায়ন
কাজটির ফলে নারীর
সার্বিক অবস্থার উন্নয়ন হবে? কিভাবে?
এর ফলে কি নারীরা
তাদের সৃজনশীলতা, মেধা, নেতৃত্ব ইত্যাদি বিকাশের সুযোগ পাবে?
কিভাবে?
১০.
বিশ্বব্যাপী
দায়িত্ব ও অংশীদারিত্ব
কাজটিতে যদি বিদেশীদের
অংশগ্রহণ থাকে তবে কি তা অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে - নাকি এটা
তাদের চ্যারিটি বা দান-খয়রাত? কিভাবে?
পরিশেষে:
ক্ষুধা অবসান বা আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনকে দি হাঙ্গার প্রজেক্ট কোনো
কর্মসূচি নয়, একটি সামাজিক গনজাগরণ হিসেবে গ্রহণ করেছে৷ কারণ ক্ষুধা অবসানের মতো বিশাল কার্যক্রম পরিচালনায়
সকলের অংশগ্রহণ অত্যাবশ্যক৷ দি হাঙ্গার প্রজেক্ট
একা এ ভবিষ্যত গড়ে তুলতে পারবে না৷ সে কারণে দি
হাঙ্গার প্রজেক্ট কখনই সত্যিকার অর্থে শুধুমাত্র একটি সংগঠন হিসেবে বিবেচিত
হয় না৷ আমরা এই সংগঠনকে বিবেচনা করি একটি অভিযান
হিসেবে৷ আত্মনির্ভর বাংলাদেশ এবং পৃথিবী সৃষ্টির
কাঠামো অর্জনে কৌশলগত কার্যক্রম গ্রহণের জন্য নিবেদিত ব্যক্তি এবং
প্রতিষ্ঠানের এটি একটি প্রতিশ্রুতি ও একটি সম্মিলিত অভিযান৷ সমাজের সর্বস্তরে এ অভিযান জোরদার করা প্রয়োজন৷ উপরোক্ত ১০টি নীতি এই অভিযান সফল করবে বলে আমরা দৃঢ়ভাবে
বিশ্বাস করি৷
দি হাঙ্গার
প্রজেক্ট-বাংলাদেশ
৩/৭ আসাদ এভিনিউ
মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭, বাংলাদেশ