পূর্বাঞ্চল

উজ্জীবক বার্তা, সংখ্যা-১৫, মে-জুন-২০০৪

উজ্জীবক ফারুক - প্রবল অটল বিশ্বাস যার নি:শ্বাস-প্রশ্বাসে
 

কিশোরগঞ্জ জেলার বাজিতপুর উপজেলার সরারচর ইউনিয়নের একটি গ্রাম 'পুরাণগাঁও' ৷ এ গ্রামেরই একটি যৌথ পরিবারে ফারুকের জন্ম বাবার পেশা কৃষি, চাচা সরকারি চাকুরীজীবি বড় ভাই-বোনেরা প্রায় সকলেই স্থানীয় বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষকতা করেন ৷ স্বচ্ছল, শিক্ষিত, উদার পারিবারিক আবহে বড় হয়েছেন ফারুক ৷ সরারচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশুনা শেষ করে ভর্তি হন সরারচর শিবনাথ হাইস্কুলে এখান থেকেই এস,এস,সি পাশ করেন ৷ এইচ, এস, সি পাশ করেন বাজিতপুর ডিগ্রী কলেজ থেকে ৷ খুব ইচ্ছে ছিলো সেনাবহিনীতে যোগ দেয়ার, কিন্তু সুযোগ হয়নি ৷ এতে একরকম ভেঙ্গে পড়েন ৷ ফলে বি, এ পরীক্ষায় খারাপ করেন ৷ বাড়ীতেও প্রচন্ড চাপের মধ্যে পড়েন ৷ একদিকে বাড়ীর চাপ, আরেক দিকে অপরিকল্পিত জীবন নিয়ে নিজস্ব বিপর্যস্ততা - সব মিলিয়ে ফারুকের দিন কাটছিলো চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে
ফারুকের বন্ধু মুর্তজা আলী সুমন
৷ সে 'দি হাঙ্গার প্রজেক্টে'র একজন উজ্জীবক ৷ তার হাত ধরেই অংশ নেন ৩৯ তম উজ্জীবক প্রশিক্ষণে ৷ ১৯৯৯ সালের কথা ৷ যে ঘরটিতে প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হচ্ছিল সেখানে মনীষীদের বানী লেখা ব্যানার টানানো ছিলো চারিদিকে ৷ জ্বলজ্বলে অক্ষরে নজরুলের দু'ছত্র কবিতায় দৃষ্টি আটকে যায় ফারুকের
 

'প্রবল অটল বিশ্বাস যার নি:শ্বাস প্রশ্বাসে / যৌবন যার জীবনের ঢেউ কলতরঙ্গে হাসে
মরা মৃত্তিকা করে প্রাণায়িত / শষ্য-কুসুমে ফলে
কোনো বাঁধা তার রোধে নাকো পথ / কেবলই সম্মুখে চলে
৷'


ফারুকের মনেও দানা বাঁধে প্রবল অটল বিশ্বাস
৷ চারদিনের প্রশিক্ষণে অনেক নতুন কথা, নতুন ভাবনা, নতুন দৃষ্টিভঙ্গির সাথে পরিচয় ঘটে ফারুকের ৷ বুকের গভীরে সে অনুভব করে নতুনতর প্রেরণার বিকাশ
ফিরে এসে নিজের গ্রাম আর আশেপাশের এলাকায় বৈঠক ও কর্মশালা করতে থাকে
৷ নিজে ২০০০ সালে বাজিতপুর যুব উন্নয়ন থেকে হাঁস-মুরগী পালনের উপর ১২ দিনের প্রশিক্ষণ নেন ৷ এ ছাড়াও সিডা এবং পশু সম্পদ বিভাগ থেকে 'বাণিজ্যিক মুরগী উত্‍পাদন ব্যবস্থাপনা' বিষয়ে দক্ষতা বৃদ্ধিমূলক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন ৷ উদ্যোগ গ্রহণের প্রাক্কালে সহযোগিতার হাত প্রসারিত করেন ফারুকের বড় ভাই ও বড় বোন ৷ ব্যক্তিগত ডিপিএস থেকে টাকা ভাঙ্গিয়ে তারা ফারুককে দেন ৷ ২০০০ সালের অক্টোবরে ২৫০০ ব্রয়লার মুরগি দিয়ে ফারুকের পোলট্রি ফার্ম শুরু হয় ৷ শুরুতেই 'আফতাব কোম্পানী' নামক একটি সংস্থার সাথে শেয়ারে কাজ শুরু করেন ৷ সংস্থাটি দিয়েছিলো ২০০০ মুরগীর বাচ্চা আর খাবার ৷ ফারুক দিয়েছিলো মুরগী পালার জায়গা, লেবার খরচ, চিকিত্‍সা খরচ এবং নিজের শ্রম
প্রাথমিকভাবে প্রতি ৪০ দিনে প্রকল্প থেকে মুনাফা আসতে থাকে ১৬ থেকে ২০ হাজার টাকা
৷ কিন্তু কিছুদিন যাওয়ার পর ফারুক দেখলো এই শেয়ার থেকে তার খুব একটা লাভ আসছে না ৷ তা ছাড়া সংস্থাটির সাথে মতেরও অমিল হচ্ছিল ৷ অবশেষে মে, ২০০৩ থেকে একক ভাবেই খামার করা শুরু করলো সে ৷ বাচ্চা কেনা থেকে শুরু করে মার্কেটিং পর্যন্ত সবই নিজস্ব উদ্যোগে করতো সে ৷ এখন প্রতি ৪০ দিনে তার লাভ আসছে ২৮ থেকে ৩৪ হাজার টাকা ৷ এই টাকা থেকে বড় দু'ভাই এবং বোনের ঋন শোধ করেছে ফারুক ৷ সংসারে টাকার যোগানও দিচ্ছে সে ৷ ফলে যৌথ পরিবারে আর্থিক স্বচ্ছলতা বেড়েছে
ফারুকের সাফল্য তার প্রতিবেশী যুবকদেরকেও উদ্যোগী করে তুলছে
৷ অনেকেই ব্যক্তিগত ও যৌথ খামার গড়ে তুলেছে ৷ এদের মধ্যে কামাল, মেনু ও সবুজের নাম উল্লেখযোগ্য ৷ অনেকে আবার খামারের মতো বড় আকারে না হলেও কয়েকটি করে মুরগী নিয়ে বাড়ীতে পালন করতে শুরু করেছে ৷ এতে তারা সামান্য হলেও লাভবান হচ্ছেন
 

'আত্ম উন্নয়ন সংস্থা' নামে একটি স্থানীয় সংগঠন গড়ে তুলেছে সে ৷ সংস্থার প্রাথমিক সদস্য ১৫ জন ৷ সংগঠনের প্রাথমিক
লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে দু'টি ৷ প্রথমত: সমিতির মাধ্যমে কোনো ঋনদানকারী সংস্থা বা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ঋন নিয়ে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা ৷ দ্বিতীয়ত: শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারীর ক্ষমতায়নসহ গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ইস্যুগুলো নিয়ে প্রচারাভিযানের মাধ্যমে সচেতনতা বাড়ানো ৷ এছাড়া টিএলএম প্রোগ্রামের বয়স্ক শিক্ষা কার্যক্রমের সাথে ফারুকরা যুক্ত হয়েছে ৷ ২০টি বয়স্ক স্কুলের মধ্যে ৬টি মহিলা স্কুল তাদের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে
প্রতি বছর 'আন্তর্জাতিক নারী দিবস' ও 'কন্যা শিশু দিবস' পালন করে তারা
৷ ফারুক ও তার সমিতির সদস্যরা নারী নির্যাতন রোধে সোচ্চার ভূমিকা পালন করে ৷ সমপ্রতি ফারুকের ফার্মের একজন নারী কর্মচারী ধর্ষণের শিকার হলে ফারুকদের উদ্যোগে ধর্ষনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয় ৷ সামাজিক শালিশের মাধ্যমে ঐ ব্যক্তি পরে ধর্ষিতাকে বিবাহে সম্মত হয় ৷ এ কাজটি করতে গিয়ে ফারুকদের ঝুঁকি নিতে হয়েছিলো, তবুও তারা পিছপা হয়নি ৷ ফলে মানুষের আস্থা ও ভালোবাসা অর্জনে তারা সক্ষম হয়েছে
পরিবেশ নিয়েও কাজ করতে চায় ফারুক
৷ শুরু করেছে সে নিজের বাড়ী থেকে ৷ বাড়ীর ফাঁকা জায়গায় নিজের জমির আলে এবং বাড়ী সংলগ্ন রাস্তায় অনেকগুলো নিম, আম আর রেইন ট্রি লাগিয়েছে ৷ গ্রামের সকলকে উদ্বুদ্ধ করছে নিজ নিজ বাড়ীতে বনজ, ফলজ আর ভেষজ গাছ লাগাতে
 

 

Previous Story<Index>Next Story


Home  / Feedback

© 2005 The Hunger Project-Bangladesh. All rights reserved.