|
দক্ষিণাঞ্চল |
|
উজ্জীবক বার্তা, সংখ্যা-১৫, মে-জুন-২০০৪ |
পাল্টে গেছে পল্লবের জীবনের গতিমুখ.............
|
উজ্জীবক প্রশিক্ষণ
থেকে ফিরে পুরনো বন্ধুদের সাথেও বসেছিলেন তিনি
৷ জীবন পরিবর্তনের আশা
তাদের মাঝেও ছড়িয়ে দেবার চেষ্টা করেছেন এবং করে চলেছেন এখনও
৷ এলাকার উজ্জীবকদের
সাথে পল্লবের রয়েছে সার্বণিক যোগাযোগ
৷ সম্মিলিত সামাজিক
উদ্যোগগুলোতে পল্লব অংশগ্রহণ করে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা নিয়ে
৷ |

বটিয়াঘাটা নামের
উত্পত্তি অনুসন্ধান করলে যে আদি শব্দটির সন্ধান পাওয়া যায় তা হলো 'বৈঠাঘাটা'
৷
খুলনা শহরের অদূরে,
তিনটি নদীর সঙ্গমস্থলে এই ইউনিয়ন
৷
শহর থেকে ১২ কিমি
যাওয়ার পর ফেরী বা ইঞ্জিন চালিত নৌকায় ১০ মিনিটের নৌপথ পেরোলেই বটিয়াঘাটা বাজার
৷ বাজারের মনোহারী
দোকানের ভীড়ে একটু খুঁজলেই পাওয়া যাবে এক উজ্জ্বল লাল সাইনবোর্ড-"রসমতী মোবাইল
সেন্টার"
৷ ছোট্ট ঘরে ছিমছাম দোকান
৷ ঘরের ভেতরেও লাল
ব্যানারে লেখা দোকানের নাম
৷ টেবিলের ওপারে বসে আছে যে
কমবয়সী ছেলেটি, তারই নাম পল্লব
৷
পল্লবের পুরো নাম- পল্লব কুমার মহলদার
৷ পিতার নাম সহদেব
মহলদার
৷ অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের
মতো তিনিও কৃষিজীবি
৷ নিজেদের জমি চাষ করার
পাশাপাশি তারা বর্গা জমিও চাষ করেন
৷ চার ভাই, এক বোনের
সংসারে পল্লব সবার ছোট
৷ বোনটির বিয়ে হয়ে গেছে
৷ ভাইয়েরা সবাই
প্রতিষ্ঠিত
৷ সবচেয়ে বড় ভাই পাশ্ববর্তী
কাজদিয়া কলেজের শিক্ষক
৷ মেজভাই স্থানীয়
গোডাউনের এজেন্ট
৷ তার আরও রয়েছে ধান-তিলের
ব্যবসা
৷ সেজ ভাইও স্বাবলম্বী
৷ তার নিজের স্কুটার আছে
৷ বটিয়াঘাটা খেয়াঘাট
থেকে খুলনার ময়লাপোতা পর্যন্ত চলে তার স্কুটার
৷ খেয়াঘাটে আগে পল্লবদের
যে তিনটি দোকান ছিলো, সেগুলোও তিনিই দেখতেন
৷
কর্মঠ, উদ্যমী আর স্বাবলম্বী এই তিন ভাই-এর মাঝে পল্লবই ছিলো খাপছাড়া স্বভাবের
৷ ছেলেবেলা থেকেই
স্বভাবটা তার উগ্র আর বেপরোয়া
৷ পাড়াজুড়ে মারামারি করা
আর সবার সাথে ঝামেলা বাধানোতেই যেন তার আনন্দ
! বিচার বিবেচনা করে
কখনও চলতে শেখেনি সে
৷ ভবঘুরের মতো তখন এখানে ওখানে
ঘুরে বেড়াতো পল্লব
৷ এলাকার সন্ত্রাসীদের সঙ্গও
তাকে বিপথগামী করে তুলেছিলো
৷
২০০২ সালের জলমা চক্রাখালী হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাশ করে পল্লব
৷ স্বভাবের কারণেই
লেখাপড়ায় বেশী এগুনো হয়নি
৷ বাবা-বোন আর ভাইয়েরা মিলে
ব্যবসার জন্য তাকে এক-দেড় লাখ টাকা দিয়েছিলো
৷ পল্লব শুরু করেছিলো
মুরগির ফার্মের ব্যবসা
৷ অস্থিরতা আর অনভিজ্ঞতার কারনে
এ ব্যবসায় মার খায় সে
৷ জীবন হয়ে ওঠে আরও অগোছালো,
আরও উদ্দেশ্যহীন
৷
২০০৩ সালের ১০ থেকে ১৩ জুলাই চক্রাখালী স্কুলে অনুষ্ঠিত হয় ৩২০-তম উজ্জীবক প্রশিক্ষণ
৷ পল্লব ঘটনাক্রমে এ
প্রশিক্ষণে
একজন অংশগ্রহণকারী হিসেবে উপস্থিত ছিলো
৷ চারদিনের এই প্রশিক্ষণ
থেকে পল্লব অনেক বিষয় সম্পর্কে নতুন করে ধারণা লাভ করলেও যেটি সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য
তা হলো- পল্লব এই প্রথম অনুভব করেছিলো জীবনটাকে পাল্টাবার সুতীব্র তাগিদ
৷
এই তাগিদের প্রেক্ষিতেই
প্রশিক্ষণ
থেকে ফিরে পল্লব শুরু করে বেগুনের চাষ
৷ বাড়ির পাশেই নিজেদের
১৫ কাঠা জমিতে বেগুনের চারা লাগায় সে
৷ বাগানের কাজে পল্লবকে
সর্বোতোভাবে সাহায্য করেছিলো তার বাবা আর মা
৷ প্রথম মৌসুমে এই
ক্ষেত
থেকে তেমন লাভ না হলেও, এই কাজে
নিবিষ্ট হবার মধ্য দিয়ে পল্লবের স্বভাবগত অস্থিরতা আর বেপরোয়া জীবন যাপন পাল্টে যায়
৷ বদলে যায় জীবনের
গতিমুখ
৷
২০০৩-এর শেষদিকে, বাজারে নিজেদের যে তিনটি ঘর ছিলো, তার একটিতে পল্লীফোনের দোকান
দেয় পল্লব
৷ দোকানে মোবাইল সংযোগও নেয়া
হয়েছে
৷ জীবন পাল্টাবার এই শুভ
উদ্যোগটিকে মায়ের নামে নামাঙ্কিত করেছে পল্লব
৷ দোকানটি চালু করতে
তাকে মোট বিনিয়োগ করতে হয়েছিলো সাড়ে দশ হাজার টাকা
৷ আর এ দোকান থেকে
বর্তমানে তার মাসিক আয় গড়ে ৬ হাজার টাকা
৷ এছাড়া পল্লব সোনালী
ব্যাংকের ছাগল পালন প্রকল্পের আওতায় ২০,০০০ টাকা লোন নিয়েছেন
৷
অপেক্ষা
করছেন শুকনো মৌসুমের জন্য৷
বর্ষা গেলেই চারটি ছাগল কিনে নতুন প্রকল্পে হাত দেবেন তিনি
৷
উজ্জীবক প্রশিক্ষণ
থেকে ফিরে পুরনো বন্ধুদের সাথেও বসেছিলেন তিনি
৷ জীবন পরিবর্তনের আশা
তাদের মাঝেও ছড়িয়ে দেবার চেষ্টা করেছেন এবং করে চলেছেন এখনও
৷ এলাকার উজ্জীবকদের
সাথে পল্লবের রয়েছে সার্বণিক যোগাযোগ
৷ সম্মিলিত সামাজিক
উদ্যোগগুলোতে পল্লব অংশগ্রহণ করে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা নিয়ে
৷
উগ্র, উদ্ধত, বেপরোয়া ছেলেটি আজ এক বিনম্র তরুণ, নিষ্ঠাবান কর্মী, জীবন যুদ্ধের
সাহসী যোদ্ধা
৷
|
© 2005 The Hunger Project-Bangladesh. All rights reserved. |