উত্তরাঞ্চল

উজ্জীবক বার্তা, সংখ্যা-১৫, মে-জুন-২০০৪

 

 রাজশাহীর রেশমা: সাহসী সংগ্রামে অনন্য

সাধারণ গ্রামের এক সাধারণ মেয়ে রেশমা ৷ রেশমা আক্তার ৷ পরিবার বা নিজের এমন কোন বৈশিষ্ট্য ছিলো না যা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করবে, পরিচিত করে তুলবে ৷ দু'বছর আগের চিত্র এই ৷ অথচ আজকে রেশমা নামটি একটি প্রিয় পরিচিত নাম ৷ পুরো ইউনিয়নবাসীদের কাছে অনুপ্রেরণার উত্‍স

রাজশাহী জেলার মোহনপুর উপজেলার মৌগাছি ইউনিয়নে জন্ম রেশমা আক্তারের
৷ গ্রামের নাম মাটিকাটা ৷ শৈশবেই বাবা হদন আলীকে হারান তিনি ৷ পাঁচ সন্তানকে নিয়ে মা ফুলজান বেগমের অতি দরিদ্র অসহায় সংসার ৷ সন্তানদের লেখাপড়ার প্রবল আকাঙ্খা  দাবিয়ে রাখতে হয় দারিদ্রের কষাঘাতে ৷ একমুঠো খাবার যোগাড় করতেই প্রাণপাত ৷ মাঠে জমাজমিও নেই যা থেকে নির্ভরতা জুটবে ৷ স্বামীর ধান, চালের ক্ষুদ্র ব্যবসার উপর পুরো পরিবার নির্ভরশীল

অভাব অনটনের মধ্যেও লেখাপড়ায় প্রবল আগ্রহ তার
৷ প্রাইমারী শেষ করে হাঁস-মুরগী পালনের সামান্য টাকা দিয়ে হাই স্কুলে লেখাপড়া চালিয়ে যান ৷ স্বপ্ন দেখেন একদিন শিক্ষিত হয়ে বড় মানুষ হয়ে ওঠার ৷ উপার্জন করে পরিবারের হাল ধরার ৷ কিন্তু প্রত্যন্ত গ্রামের পরিবেশ চারপাশ থেকে যেন দেয়াল তৈরী করে রাখে রেশমার স্বপ্নের পথে ৷ পথ খোঁজে সে

এমনি সময় একদিন বড় ভাই দুলাল তাকে একটি
প্রশিক্ষণের কথা বলে ৷ সে জানায় দি হাঙ্গার প্রজেক্ট' নামে একটি সংস্থা মৌগাছি কলেজে উজ্জীবক প্রশিক্ষণ পরিচালনা করবে ৷ এই ইউনিয়নেরই কিছু সমাজ সেবক এবং শিক্ষক আয়োজন করেছেন প্রশিক্ষণটির ৷ রেশমাকে সেই প্রশিক্ষণে যেতে বলে দুলাল ৷ ডিম বিক্রি বাবদ অনেক কষ্টে জমানো পঞ্চাশ টাকা 'রেজিষ্ট্রেশন ফি' হিসেবে জমা দিয়ে উজ্জীবক প্রশিক্ষণে অংশ নেয় রেশমা
 

প্রশিক্ষণের চারটি দিন তাঁর জীবনে সোনালী রোদ নিয়ে এসেছিল ৷ এ দিনগুলোতে তাঁর বিশ্বাস প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যে, নারী হোক কিংবা পুরুষই হোক, ব্যক্তি মানুষ চেষ্টা করলেই অন্যের উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনতে পারে


১৫-১৮ এপ্রিল ২০০২ এ ৩২৯-তম ব্যাচের উজ্জীবক
প্রশিক্ষণটি এক বাধ ভাঙ্গা ঢেউ তোলে তার মনের গভীরে ৷ এতদিনে বুকের কোণের আবদ্ধ স্বপ্ন যেন মুক্তির পথ খুঁজে পায় ! নিজেকে আর মেয়ে হয়ে জন্মাবার জন্য অসহায় মনে হয় না তার প্রশিক্ষণের চারটি দিন তাঁর জীবনে সোনালী রোদ নিয়ে এসেছিল ৷ এ দিনগুলোতে তাঁর বিশ্বাস প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যে, নারী হোক কিংবা পুরুষই হোক, ব্যক্তি মানুষ চেষ্টা করলেই অন্যের উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনতে পারে ৷ নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে ৷ নিজের যেটুকু শক্তি, মেধা, ইচ্ছে আছে তা দিয়েই সে ভাগ্যের পরিবর্তন করতে পারে

এ বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে রেশমা নিজেকে প্রস্তুত করলো জীবনের আরেকটি যুদ্ধের জন্য
৷ শুরু হলো স্রোতের বিরুদ্ধে লড়াই, পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার বিরুদ্ধে লড়াই -আত্মনির্ভরশীলতার ভিত্তিতে, আত্মশক্তির বিশ্বাসে, অন্যকে সম্পৃক্ত করার ইচ্ছায় ৷ উদ্দেশ্য নিজের ভাগ্য পরিবর্তন এবং এলাকার মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন ৷ টাকা ছাড়া কিচ্ছু হবে না, মেয়েদের কাজ শুধু হাঁড়ি ঠেলা এবং বাচ্চা লালন পালন করা -এ জাতীয় বদ্ধমূল ধারনা থেকে মুক্ত হয়ে নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের পাশাপাশি এলাকার নারীদেরকে সংগঠিত করে তাদের অবস্থার পরিবর্তনের জন্য নিজের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলেন এবং কাজে নেমে গেলেন

হাঁস-মুরগী পালনের মাধ্যমে তাঁর পরিবারে আর্থিক স্বচ্ছলতা বেড়েছে
৷ পুষ্টির সংস্থান হয়েছে ৷ মুরগী এবং মুরগীর ডিম বিক্রি করে বছরে ২-৩ হাজার টাকা আয় হয় ৷ পাশাপাশি মাসিক ৫০০ টাকার বিনিময়ে সে লোক বীমাতে চাকুরী নিয়েছে

মামাতো ভাই লিটনের ঔষধের দোকান ছিলো মৌগাছি বাজারে
৷ লিটন চাকরী নেয়াতে দোকান বন্ধ হয়ে যায় ৷ রেশমা তখন দোকানের হাল ধরে ৷ সঙ্গে মোবাইল ফোনের ব্যবসা ৷ পুঁজি ৪০,০০০ টাকা থেকে ৬০,০০০ টাকা হয় ৷ ব্যবসাকে চাঙ্গা করার উদ্দেশ্যে লিটন রেশমার জন্য মাসিক ৫০০ টাকা বেতন ধার্য করে ৷ নারীরা এখানে ব্যবসা তো দূরের কথা, বাইরের কোনো কাজই করে না ৷ তাই তাঁর উদ্যোগ এলাকায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছে
  
নিজস্ব লেখাপড়া, আয়-রোজগারের পাশাপাশি সে এলাকার স্যানিটেশন, পরিচ্ছন্নতা, শিশু স্বাস্থ্য, পুষ্টি এবং শিশু
শিক্ষার জন্য কাজ করছে ৷ মানুষকে, এ সকলবিষয়ে সচেতন করার জন্য নিয়মিত উঠান বৈঠক করে সে ৷ ১৫টি পরিবার তার ব্যক্তিগত উদ্যোগে স্যানিটেশনের আওতায় এসেছে ৷ ২৫ জন ছেলেমেয়েকে তাদের অভিভাবকদের বুঝিয়ে স্কুলে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে

তার প্রত্যাশা এস এস সি পাশ করে সেনাবাহিনীতে যোগ দেবে
৷ অন্যথায় পরিবার ও এলাকার উন্নয়নের কাজ করবে ৷ গ্রামের নারীদের সংগঠিত করে আত্মনির্ভরতা অর্জনের প্রচেষ্টা শুরু করবে ৷ 
 

Previous Story<Index>Next Story


Home  / Feedback

© 2005 The Hunger Project-Bangladesh. All rights reserved.