নারী

উজ্জীবক বার্তা, সংখ্যা-১৫, মে-জুন-২০০৪

 

ঘরণীর ঘরকাব্য
 

ঘরণী' - ছিমছাম গোছানো একটি অফিস ঘর ৷ বাইরে বেশ বড় করেই টানানো একটি সাইনবোর্ড ৷ নিত্যদিন ঘরের ভিতরে প্রশিক্ষণরত ১৫/২০ জন নারী ৷ দেয়াল জুড়ে সাজানো রয়েছে নকসী কাঁথা, ব্লক-বাটিকের কাপড়, থ্রীপিস ৷ প্রশিক্ষণ দেয়া হয় আচার, সস, মোমের শো-পিস, শাক-সবজি, নার্সারী, ব্লক-বাটিক, নকসী কাঁথা, এমব্রয়ডারীসহ সব রকমের দর্জির কাজ

সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা এবং প্র
শিক্ষক পপি রহমান ৷ বয়স ৪২ ৷ স্বামী মো: লুত্‍ফর রহমান ৷ দুই সন্তানের জননী ৷ নোয়াখালী জেলা শহরের অধিবাসী তিনি ৷ বিএ পাশ ৷ ৭ ভাই-বোনের মধ্যে ৩য় ৷ এডভোকেট পিতা মারা গেছেন অনেক আগেই ৷ মা সাধারণ গৃহিনী ৷ ছোট বেলা থেকে গঠনমূলক সামাজিক কাজে ব্যাপক আগ্রহ পপির ৷ বাবার বাড়িতে পড়াশুনার পাশাপাশি সামাজিক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত হওয়ার ইচ্ছা থাকলেও বিরূপ পারিপার্শ্বিকতার কারণে তা হয়ে ওঠেনি

 

 

 

বর্তমানে 'ঘরণী' প্রতিষ্ঠানটি একটি পূর্ণাঙ্গ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে ৷ ৬০০০ টাকা দিয়ে শুরু করা প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান পুঁজি দাঁড়িয়েছে ৬,০০,০০০ টাকা ৷ কেন্দ্রটি থেকে এ পর্যন্ত ১,৩০০ নারী বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষিত হয়ে আত্মকর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন ৷ 'ঘরণী'তে বর্তমানে ৩ জন বেতনভুক্ত কর্মচারী আছেন এবং ৫৪ জন স্বল্পকালীন কাজের ভিত্তিতে নিয়োজিত আছেন


এইচএসসি পাশ করার পর বিয়ে হয় পপি রহমানের
৷ স্বামীর সহযোগিতা এবং শ্বশুর-শাশুড়ীর অনুপ্রেরণায় বিএ পাশ করেন তিনি ৷ বিএ পাশ করার পর নিজের মধ্যে তাড়না তৈরী হয় নিজেকে স্বাবলম্বী করে তোলার ৷ স্বামীর পাশে দাঁড়ানোর ৷ সংসারের হাল শক্ত করে ধরার ৷ তাছাড়া একজন শিক্ষিত নারী হয়েও স্বামীর ঘাড়ে বোঁঝা হয়ে থাকাটা তাঁর কাছে অপমানজনক বলে মনে হয়েছিলো

পপি এমন কিছু করতে চাইলেন যাতে একদিকে তার সাবলম্বিতার স্বপ্ন পূরণ হয়
৷ আরেক দিকে এলাকার পিছিয়ে পড়া নারীদের কল্যাণের পথ প্রশস্ত হয়
নোয়াখালীতে নিজেদের বাড়ীতে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা 'দি হাঙ্গার প্রজেক্টে'র আঞ্চলিক অফিস
৷ এখানেই কথা হয় আঞ্চলিক সমন্বয়কারী আবু নাসের খান পান্নুর সাথে ৷ পপি, পান্নুকে তার ভাবনার কথা জানায় ৷ পান্নু তাঁকে পরামর্শ দেয় 'উজ্জীবক প্রশিক্ষণে' অংশ নেয়ার জন্য ৷ মানুষকে তার নিজ জীবনের হাল ধরার কারিগররূপে গড়ে তুলতে উজ্জীবিত, অনুপ্রাণিত ও সংগঠিত করার প্রচেষ্টার লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত উজ্জীবক প্রশিক্ষণ এর ৬ষ্ঠ ব্যাচে অংশ নিলেন তিনি
যে 'সাহস' আর 'শক্তি' সম্ভব-অসম্ভবের দোলাচলে দুলছিলো, তা যেন পথ খুঁজে পেল
৷ পপি রহমান এক গভীর প্রেরণা অনুভব করলেন নিজের ভেতর ৷ 'নারীর ক্ষমতায়ন' এবং 'আত্মশক্তি'র আলোচনা তার মনোজগতে যে পথ রচনা করলো সে কেবলই সামনে চলার, এগিয়ে যাবার

প্রশিক্ষণলব্ধ বোধ থেকেই তিনি ১৯৯৫ সালের ১লা মার্চ 'ঘরণী' প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করলেন ৷ পুঁজি নিজের জমানো ৬,০০০ টাকা ৷ নিজের পরিচিত কয়েকজনের সাথে আলাপ আলোচনা করে সামান্য পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কয়েকজন নারীকে দিয়ে শুরু করলেন 'ঘরণী'র কাজ ৷ প্রথম প্রথম কষ্ট হয়েছিলো মেয়েদেরকে সম্পৃক্ত করতে

তিনি হতদরিদ্র কিশোরী, নারীদেরকে বুঝাতে লাগলেন ব্যক্তি মানুষ চেষ্টা করলেই অন্যের উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনতে পারে
৷ নিজের যেটুকু শক্তি, মেধা, ইচ্ছে আছে তা দিয়েই সে তার ভাগ্যের পরিবর্তন করতে পারে ৷ আত্মশক্তি মানুষকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আসনে বসাতে পারে ৷ এ বিশ্বাস ধীরে ধীরে গ্রথিত হতে শুরু করে তার পরিচালিত 'আত্ম উন্নয়নে সুপ্তশক্তির বিকাশ' শীর্ষক কর্মশালায়

মেয়েরা 'ঘরণী'র উদ্দেশ্য, আদর্শের সাথে পরিচিতি লাভ করে
৷ তারাও আগ্রহী হয় পপি রহমানের মতো সেলাই, ব্লক-বাটিকের কাজে দক্ষ হওয়ার জন্য ৷ তাদের অভিভাবকরাও স্বচ্ছন্দে পপি রহমানের কাছে তাদের মেয়েদের প্রশিক্ষণে পাঠাতে লাগলেন ৷ পপি রহমান তাদেরকে বুঝাতে সমর্থ হয়েছেন যে, মেয়েদেরকে এ বিরুদ্ধ সমাজ ব্যবস্থায় টিকে থাকতে হলে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে শিক্ষিত হতে হবে ৷ তার জন্যে আয়-রোজগার প্রয়োজন

বর্তমানে 'ঘরণী' প্রতিষ্ঠানটি একটি পূর্ণাঙ্গ
প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে ৷ ৬০০০ টাকা দিয়ে শুরু করা প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান পুঁজি দাঁড়িয়েছে ৬,০০,০০০ টাকা ৷ কেন্দ্রটি থেকে এ পর্যন্ত ১,৩০০ নারী বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষিত হয়ে আত্মকর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন ৷ 'ঘরণী'তে বর্তমানে ৩ জন বেতনভুক্ত কর্মচারী আছেন এবং ৫৪ জন স্বল্পকালীন কাজের ভিত্তিতে নিয়োজিত আছেন

পপি তাঁর ভবিষ্যত্‍ পরিকল্পনাতে 'ঘরণী'কে
 শুধুমাত্র প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান হিসেবেই নয়, সেই সাথে সমাজ সচেতনতামূলক কার্যক্রমের অগ্রণী প্রতিষ্ঠানে পরিণত  করার প্রবল ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন ৷ প্রজনন স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা, নারী নির্যাতন ও এসিড নিক্ষেপ প্রতিরোধ ইত্যাদি বিষয়ের উপর কাজের পরিকল্পনা রয়েছে পপি রহমানের
 

 

Previous Story<Index>Next Story


Home  / Feedback

© 2005 The Hunger Project-Bangladesh. All rights reserved.