| দুর্যোগ মোকাবেলায় কন্যাশিশুর জন্য চাই আরো সংগঠিত উদ্যোগ | |
| কন্যাশিশু দিবস সংখ্যা |
উজ্জীবক বার্তা, বর্ষ-৩, সংখ্যা-১৭, সেপ্টেম্বর-২০০৪ |
|
ড. আতিউর রহমান
|
|
সম্প্রতি এক ভয়াবহ বন্যার মুখোমুখি হয়েছিলো বাংলাদেশ ৷ মোট ভূ-খন্ডের প্রায় অর্ধেকই পানির নিচে চলে গিয়েছিলো ৷ পানি নেমে গেছে, তবে ঢাকা শহরের আশেপাশের জায়গাজমি ও জলাঞ্চল ভূমিদস্যুদের দখলে চলে যাবার কারণে পানি সেভাবে দ্রুত নামতে পারেনি ৷ ফলে ঢাকায় জলাবদ্ধতা এক তীব্র রূপ নিয়েছিলো ৷ ঢাকার পরিবেশ মারাত্মক হুমকরি মুখে পড়েছিলো ৷ দুর্গন্ধময় এক পরিবেশে মানুষের জীবন কেটেছে ৷ স্যানিটেশন ও খাবার পানির সমস্যায় মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিলো ৷ গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি পানির নিচে চলে যাবার কারণে শ্রমিকদের কাজও বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো ৷ তবে ঢাকার বাইরে চর ও হাওড় অঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি ঘটেছিলো ৷ তাছাড়া, সিলেট সহ বেশ কিছু অঞ্চলে বন্যার আক্রমণ খুবই তীব্র ছিল ৷
|
|
বন্যার ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে সরকারী ও বেসরকারী মহলে যখন তীব্র বিতর্ক চলছে, তখন একটি কথা কেউ খেয়াল রাখছে না যে, সকল শ্রেণীর মানুষ একই রকম বিপদে পড়ে নি ৷ যাদের আয় সামান্য, জমিজমা অল্প এবং ঘরবাড়ি কাঁচা তাদের দুরাবস্থা অন্যদের চেয়ে বেশ বেশী ছিল এবং এখনও আছে ৷ এদের এবং বন্যার্ত আরও অনেক নিম্নআয়ের পরিবারে নারীর অবস্থা বন্যার সময় এবং বন্যাত্তোর সময়েও অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ৷ সাধারণত সংকট এলে গরীব এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের মানুষ দু'ভাবে তা মোকাবেলার চেষ্টা করেন ৷ প্রথম তারা কম খরচে কোনোমতে বেঁচে থাকার চেষ্টা করেন ৷ তিন বেলার জায়গায় দুবেলা, দুবেলার জায়গায় এক বেলা খাওয়া, পেটপুরে না খেয়ে আধ পেট খেয়ে কোনোভাবে বেঁচে থাকার চেষ্টা করেন ৷ এক্ষেত্রে বৈষম্য লক্ষ্য করবার মতো ৷ বাড়ির কর্তার জন্য এরমধ্যেও মোটামুটি ভালো পরিমাণ খাবার জোটে ৷ ছেলে সন্তানও ভালোই খাবার পায় ৷ কন্যাসন্তানেরা তাদের ভাইদের চেয়ে কম খাবার পায় ৷ আর ঘরের গৃহিনীর কপালে কখনও খাবার জোটে, কখনও বা না খেয়েই থাকতে হয় ৷ এ কারণেই বন্যার সময় বা তার পরপরই ডায়রিয়া, ভাইরাল জ্বর, সর্দ্দিকাশির প্রকোপ পুরুষদের চেয়ে নারীদের মধ্যে বেশি করে দেখা যায় ৷ বিশেষ করে কমবয়সী কন্যাশিশুদের এ সময়টায় খুব করে অসুখ বিসুখে পড়তে দেখা যায় ৷ এরা অপুষ্টির শিকার হয় বলে রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতাও তাদের কম ৷ তাই অসুখ বিসুখও তাদেরই হয় বেশি ৷ সে কারণেই দেখা যায় যে, বন্যার পর পরই কন্যাশিশুর মৃত্যুর হার বেড়ে যায় ৷ তাই বন্যা পরবর্তী পুর্নবাসন কর্মসূচির পরিকল্পনা গ্রহণের সময় শিশুদের, বিশেষ করে কন্যাশিশুদের অপুষ্টির সমস্যাটির কথা ভালো করে মাথায় রাখতে হবে ৷ বন্যার সময়ও আমরা দেখেছি যে, শিশুদের জন্য আলাদা করে ত্রাণের ব্যবস্থা সেভাবে করা হয়নি ৷ পরিবারের জন্য চাল বা রুটি দেয়া হলেও শিশুদের জন্য দুধ বা বিস্কুট দেবার উদ্যোগ খুব বেশি দেখা যায়নি ৷ আমরা ক্ষুদ্র একটি ত্রাণ দল নিয়ে জামালপুর ও গাইবান্ধা গিয়েছিলাম ৷ বড়দের জন্য চাল রুটি দেবার পাশাপাশি শিশুদের জন্য হাইপ্রোটিন বিস্কুট ও লংলাইফ দুধ দেবার ব্যবস্থা করেছিলাম ৷ কয়েকদিনের বন্যায় অভুক্ত থাকা শিশুদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য এই দুধ ও বিস্কুট দারূন ভূমিকা রেখেছিল ৷ সে কারনেই, শিশুদের কথা, আরও স্পষ্ট করে বলা চলে, কন্যাশিশুদের কথা মনে রেখে যেন আমরা বন্যা প্রতিরোধের চিন্তা করি ৷
|
|
নিজেদের খাবার দাবারের পরিমাণ কমিয়ে দেয়ার পাশাপশি দুর্বিপাকে পড়া পরিবারের সদস্যদের সামান্য সঞ্চয়ও হাত ছাড়া করে ফেলতে হয় ৷ হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল পানির দামে বিক্রি করে দেয়া ছাড়াও নারীর যক্ষের ধন গয়না আগে ভাগে বিক্রির চাপ আসে ৷ এমনিতেই নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতা খুবই সামান্য ৷ বিপদে পড়লে গয়না বিক্রি করে কোনো মতে তাঁদের বাঁচার সুযোগ থাকে ৷ কিন্তু সংকটের শুরুতেই পুরুষরা যেভাবে নারীর শেষ সম্বল বিক্রি করে দেবার জন্যে চাপ সৃষ্টি করে তা সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক ৷ তাছাড়া সংকটকালে অনেক সময় গৃহিনীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয় যে, তারা যেন তাদের পিতামাতার কাছ থেকে কিংবা ভাইদের কাছ থেকে তাদের প্রাপ্য সম্পত্তির ভাগ নিয়ে আসে ৷ মনে রাখা চাই, এই সম্পত্তির ভাগ কিন্তু যে কোনো নারীর হাতের পাঁচ ৷ যদি স্বামী মারা যায়, কিংবা স্বামী পরিত্যাগ করে তখন নারীকে কপর্দকহীনভাবেই বাপের বাড়িতে আসতে হয় ৷ যদি সে আগেই তার ভাগের জমি নিয়ে থাকে, তাহলে এমন সংকটকালে তাকে দারূন উপেক্ষার শিকার হতে হয় ৷ অথচ বন্যা বা প্রাকৃতিক সংকট তেমনি এক ঝুঁকিপূর্ন অবস্থায় নারীকে ঠেলে দেয় ৷
|
|
এবারের বন্যার ফলে নিঃসন্দেহে গরীব দুঃখী মানুষের দুঃখ কষ্ট বেড়েছে ৷ কিন্তু গরীব নারীর কষ্ট অন্যদের চেয়ে আরও বেশি বেড়েছে ৷ তবে যেসব গরীব নারী নিজেদেরকে গ্রুপ বা সমিতির সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছে তাদের অবস্থা এমনটি হয়নি ৷ উল্টো সম্মিলিতভাবে তারা বন্যার মতো সংকট দূর করতে পেরেছে ৷ তাদের সঞ্চয়ের অংক থেকে তারা ঋণ নিয়েছে ৷ তারা যে সংগঠনের সদস্য সেই সংগঠনের কর্মীরাও বন্যার্ত সদস্যদের জীবনকে ঝুঁকিমুক্ত করতে এগিয়ে এসেছে ৷ এভাবে সংগঠিত নারীর জীবনচলা দুর্যোগে, দুঃসময়ে অসংগঠিতজনদের চেয়ে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ ছিল ৷ বন্যা-উত্তর সময়েও তারা আরও ভালোভাবে বাঁচার অবলম্বন ঐ সংগঠনের কর্মকান্ডের ভেতর খুঁজে পেয়েছেন ৷ অন্যদের মতো তাঁদের গয়না-গাটি বা গরু-ছাগল বা হাঁস-মুরগী পানির দামে বিক্রি করতে হয়নি ৷ কিংবা মহাজনের কাছে অধিক সুদে দাদনও নিতে হয়নি ৷
|
|
অবশ্য সংগঠিত নারীর সংখ্যা এখনও অনেক কম ৷ যদিও বাংলাদেশে এনজিও ও অন্যান্য নাগরিক সংগঠনের সদস্য সংখ্যা নেহায়েত কম নয়, তবুও বিপুল পরিমাণ দরিদ্র মানুষের বিচারে এখনো আরও সংগঠন গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে ৷ তবে সরকারকে এসকল স্থানীয় সংগঠন গড়ার জন্যে সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে ৷ বাংলাদেশে এখন এক কোটিরও বেশি পরিবার ক্ষুদ্র ঋণের অধীনে চলে এসেছে ৷ এদের শতকরা নব্বই ভাগই নারী ৷ এই সংগঠিত নারীদের পক্ষে যতোটা সফলতার সঙ্গে বন্যার মোকাবেলা করা সম্ভব হয়েছে, অন্যদের পক্ষে তা সম্ভব হয়নি ৷
|
|
তাই আরও বেশি করে নারীদের জন্য সংগঠনের সদস্য হবার সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে দারিদ্র নিরসনের লড়াইতে আমরা আরও সফল হবো ৷ একই সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্য খাতে নারীর দিকে সম্পদ প্রবাহের গতি বাড়াতে হবে ৷ ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভাসহ স্থানীয় সরকারগুলোতে নারীর প্রতিনিধিত্ব হালে বেড়েছে ৷ কিন্তু তাদের হাতে সেভাবে সম্পদ দেয়া হচ্ছেনা ৷ আগামীতে তাদের মাধ্যমে বাজেটের একটি অংশ খরচ করা গেলে গ্রাম বাংলায় নারীর ক্ষমতায়নের বলয়ে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে ৷ তবে এবিষয়টি এমনি এমনি বাস্তবায়িত হবে না ৷ নাগরিক সংগঠনগুলোকে আরও সোচ্চার হতে হবে ৷ মনে রাখা চাই, যে সমাজে মানুষ সংগঠিত, সে সমাজে দুযোর্গ এলেও সংগঠিত মানুষের পক্ষে দুর্গতি কাটিয়ে ওঠা সহজ হয় ৷ সংগঠিত নারীর ক্ষেত্রে এটি আরও বেশি প্রাসঙ্গিক ৷ |
|
© 2005 The Hunger Project-Bangladesh. All rights reserved. |