|
ও যে মানুষের বাচ্চা স্যার! |
|
| কন্যাশিশু দিবস সংখ্যা |
উজ্জীবক বার্তা, বর্ষ-৩, সংখ্যা-১৭, সেপ্টেম্বর-২০০৪ |
|
রফিকুল ইসলাম সরকার
|
|
প্রায় দেড় বছর আগের কথা ৷ ঝালকাঠিতে উজ্জীবক প্রশিক্ষণ চলছিলো ৷ আলোচনা হচ্ছিল নারীর ক্ষমতায়ন বিষয়ে ৷ অংশগ্রহণকারীগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের মতামত দিচ্ছিলেন ৷ হঠাত্ করে লক্ষ্য করলাম অংশগ্রহণকারী একজন যুবকের চোখে পানি ৷ আলোচনার এক পযায়ে সে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো ৷ সবাই অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলো ৷ জিজ্ঞেস করলাম, সে কাঁদছে কেন? উত্তর না দিয়ে সে ঘর থেকে দ্রুত বেরিয়ে গেলো ৷
|
|
খোঁজ নিয়ে সন্ধ্যায় আমরা তার বাসায় গেলাম ৷ শহরের প্রান্তে বাসা ৷ টিনের ৩টি ঘর৷ একটু দূরে একটি মুরগির খামার ৷ জুবায়ের নিজেই খামারটি পরিচালনা করে ৷ তিন মাস পর পর বাচ্চা উঠায় ৷ জুবায়ের জানালো- সে পড়াশুনার ফাঁকে ফাঁকে এই খামারের দেখাশুনা করে ৷ তার পড়াশুনার খরচ চালিয়েও সে সংসারে কিছুটা সাহায্য করে ৷
|
|
জুবায়ের আমাদের অভ্যর্থনা জানিয়ে ভিতরের ঘরে নিয়ে গেলো ৷ আমরা এভাবে তার বাসায় যেতে পারি সে যেনো তা ভাবতেই পারেনি! আপ্যায়নের পর তার বাবা-মা, ভাই-বোনদের ব্যাপারে জানতে চাইলাম ৷ সে চুপ করে গেলো ৷ বিষন্নতার এক কালো ছায়া তার চোখে৷ তার ঠোঁট নড়ছে ৷ কিছু বলতে গিয়েও যেনো সে বলতে পারছে না ৷
|
|
-কি জুবায়ের, কি
হলো? তোমরা ক' ভাইবোন? তারা কি করে?
|
|
জুবায়ের এইচ এস সি পাশ করেছে ৷ ধারণা করলাম, ছোট দু' বোন নিশ্চয়ই স্কুলে পড়াশুনা করে ৷
|
|
সে বললো, "আমার দু' বোনের মধ্যে ছোটটি পড়াশুনা করে ৷ ওর বড়জনের বিয়ে দেয়া হয়েছে আগেই ৷ আমার সেই বোনটি স্কুলে খুব ভালো ছাত্রী ছিলো ৷ খুব চালাক চতুর ৷ সারাক্ষণ বাড়িটি মাতিয়ে রাখতো ৷ ছুটোছুটি, খেলাধুলা আর হাসি তামাশা ৷"
|
|
এতটুকু বলে সে আবার চুপ করে গেলো ৷ মনে হলো সে যেনো সেই মুহুর্তে আর ঘরে নেই ৷ দুঃখময় কোন অতীতের নিবিড় অন্ধকার থেকে কি খোঁজার চেষ্টা করছে! সে ধীরে ধীরে বললো, " একদিন বাবা এসে মাকে বললেন, একটি ভালো ছেলে পাওয়া গেছে ৷ রোকেয়াকে বিয়ে দিতে হবে ৷"
|
|
-"কি বলছেন আপনি!
মেয়ের তো বিয়ের বয়স হয়নি
৷ এখন মাত্র
তের
৷ আর তাছাড়া ওতো
পড়াশুনা
করছে!
|
|
এ কথা বলে বাবা ঘর হতে দ্রুত বেরিয়ে যান ৷ মা কি ভাবলেন, কি বলতে চাইলেন তার কোন মূল্য বাবার কাছে নেই ৷ সংসারের সব ভালোমন্দ দেখার দায়িত্ব শুধু তাঁর ৷ এ ব্যাপারে অন্য কারো কোন কথা থাকতে পারে না ৷ তাছাড়া মেয়ে মানুষ এ ব্যাপারে কি বোঝে ৷
|
|
আমি পাশের ঘর থেকে সব শুনলাম ৷ কোনো কিছু বলার সাহস হলো না ৷ আমার বুক ফেটে কান্না এলো ৷ চোখ ভরে এলো পানি ৷ আমার মায়ের অসহায়ত্ব আমার অস্তিত্বের মূলে প্রচন্ডভাবে ধাক্কা দিল ৷ আমি বিছানায় পড়ে শুধুই কাঁদলাম ৷ মনে হলো, আমার ছোট্ট ফুটফুটে হাসিখুশিতে ভরা বোনটিকে যেন অমানিশার অন্ধকার গ্রাস করতে আসছে ৷
|
|
দুই বছর পরের কথা ৷ রোকেয়া বাড়িতে ফিরে এসেছে ৷ সাথে একটি শিশু ৷ একটি শিশুর কোলে আর একটি শিশু ৷ অপুষ্ট, রোগা এবং খুবই ছোট ৷ রোকেয়ার মুখে সেই মন কেড়ে নেয়া হাসি নেই ৷ ছুটাছুটি, হাসি, তামাশা যেন সে ভুলেই গেছে? শ্বশুড় বাড়িতে ওর জায়গা হলো না ৷ শরীর খারাপ ৷ তাই ওর স্বামী আর একটি বিয়ে করেছে ৷ "বুঝলেন স্যার, আপনারা যখন নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টি বুঝাচ্ছিলেন, তখন আমার চোখের সামনে ছিলো আমার বোনের মুখ ৷ যন্ত্রণাকাতর, আঘাতে আঘাতে জর্জরিত, ক্ষতবিক্ষত, শারিরীক ও মানসিকভাবে পঙ্গু আমার ছোট বোন রোকেয়া ৷ ফুলে ফলে সুশোভিত হবার আগেই মারাত্মক ঝড় তাকে দুমড়ে মুচড়ে নিঃশেষ করে দিয়েছে ৷ তার চোখের আঝোর ধারার বৃষ্টির স্মৃতি আমাকে স্থির থাকতে দেয়নি স্যার"!
|
|
এক নিঃশ্বাসে সবগুলো কথা বলে গেল জুবায়ের৷ অশান্ত সমুদ্রের ঢেউ যেন কূল ছাপিয়ে আছড়ে পড়ছে ৷ অবাক হয়ে আমরা তার দিকে তাকিয়ে রইলাম ৷
|
|
কিছুক্ষণ পর এক অস্ফুট হতাশ কন্ঠে সে বললো, "আমার বোনটিকে নিয়ে আমি কি করব স্যার? রোকেয়া বাড়ি আসার পর থেকে আমার বাবা আর কথা বলেন না"৷ আমরা ওর বাবার সংগে কথা বলার আগ্রহ দেখালে সে বলে, "বাবা কথা বলবেন না স্যার ৷ তিনি কারো সংগে আর কথা বলেন না ৷ কেউ কথা বলতে গেলেই রেগে যান ৷ রোকেয়া এভাবে ফিরে আসার পর তিনি শুধু বলেছিলেন, 'আমিই আমার মেয়েটিকে মেরে ফেলেছি' ৷ এরপর থেকে ঐ ঘরটিতে তিনি থাকেন সম্পূর্ন একা ৷ মা কাছে গেলে তিনি কেঁদে উঠেন এবং বলেন 'তোমার কথা শুনলে এ অবস্থা হতো না'!
|
|
একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে জুবায়ের প্রশ্ন করে, "আমার ঐ মুরগীর খামারটি দেখেছেন স্যার? এর মধ্যে কিছু বাচ্চা থাকে, যেগুলো অপুষ্ট, রোগা ৷ হাজার পরিশ্রম করলেও লাভ হয় না ৷ খেতে দিলেও বড় হয় না ৷ চিকিত্সাতেও ফল হয় না ৷ আমি সেগুলোকে এক এক করে ধবংস করে ফেলি ৷ কিন্তু বলুন তো স্যার, আমার বোনের বাচ্চাটিকে নিয়ে আমি কি করবো? ও যে মানুষের বাচ্চা, স্যার" ৷ |
|
© 2005 The Hunger Project-Bangladesh. All rights reserved. |