|
বন্যায় ভাসি কন্যাশিশু |
|
| কন্যাশিশু দিবস সংখ্যা |
উজ্জীবক বার্তা, বর্ষ-৩, সংখ্যা-১৭, সেপ্টেম্বর-২০০৪ |
|
লতিফা
আকন্দ |
|
আসন্ন ৩০ সেপ্টেম্বর-এ কন্যাশিশু দিবস উদযাপন উপলক্ষ্যে প্রতিবছরের মত এবারও 'দি হাঙ্গার প্রজেক্ট' যে বিশেষ সংখ্যাটি প্রকাশ করতে যাচ্ছে তাতে একটা কিছু লিখব বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম ৷ আমার অভ্যাস সবই ফেলে রাখা শেষ মূহুর্তের অপেক্ষায় - তারপর নাকে মুখে চোখে কোন রকমে কথা রক্ষা করি ৷ আজ আমার সেই অন্তিম সময় ৷ অনেকদিন মনে মনে কন্যাশিশু নিয়ে যে শিরোনামটা ভেবে রেখেছিলাম সে কোথায় হারিয়ে গেলো আরো এক প্রলয়ঙ্কারী ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ৷ ক'দিন আগে বন্যার বিষাক্ত ছোবলে ঘা খাওয়া এই কন্যাসন্তানের উপরই লিখবো ভাবছি ৷ বন্যার ইতিবাচক দিকটার মূল্যায়ন করা যায়, কিন্তু কন্যাশিশু, বিশেষ করে গ্রাম বাংলার হতদরিদ্র্য আপামর জনতার সন্তান এর ভাগ্যে পলিমাটির উর্বরতা নয়, কর্দমাক্ত জীবনটা অনেক সময় ভাসমান হয়ে ভাসতে ভাসতে শেষ হয়৷ কোথাও নোঙ্গর ফেলা আর হয় না ৷ আজ তারই স্বল্প আলেখ্য ৷ লিখতে গিয়ে ঘুরে ফিরে সেই আবহকালীন প্রবাদটা মনে পড়ে যায় ৷ নাম পরিচয়হীন কাউকে পরিচয় করিয়ে দিতে হলে আমরা কথায় কথায় প্রবাদটা ব্যবহার করে বলি 'ও বন্যার পানিতে ভেসে এসেছে' ৷ কথাটার সত্যতা বিচার্য নয় ৷ কথাটা বন্যায় ভাসা কন্যাশিশুর বেলায় প্রযোজ্য ৷
|
|
কন্যাশিশু শিশু কিনা সেটাই প্রথমে ভাবা দরকার ৷ শৈশববিহীন শিশু বয়স হলেও, প্রকৃতি প্রদত্ত স্বভাবিক, স্বভাব সুলভ জীবনধারা তার ব্যাহত হয় পরিবেশের অনানুকূল্যে ৷ বর্তমান পৃথিবীর বাণিজ্যিক, অবাণিজ্যিক সব সংজ্ঞাগুলো ধার করা, পশ্চিমা দেশের তথা বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ায় বেঁধে দেওয়া, দেশ-কাল-পাত্র ভৌগলিক ভেদাভেদ না করেই ৷ এমন শিশুর সাংবিধানিক সংজ্ঞা ১৮ বছর ৷ অথচ এই বয়সে আমাদের দেশের মেয়েরা দু'একটি শিশুর মা-ও হয়ে যায় হয়তো! হায়রে দেশ! শিশুর কোলে শিশু!
|
|
এই ১৮ বছরে বাংলাদেশের শিশুকন্যারা পরিস্থিতির শিকার হয়ে, নানা রকম অভিজ্ঞতার কারণে অকালপক্ক হয়ে ওঠে ৷ অর্থাত্, কোন মতে একটু হাঁটতে চলতে শিখলেই মায়ের হাতের লাঠি, ফুট-ফরমায়েসের যোগ্য ছোট্ট ব্যক্তিত্ব, সংসারের গৃহস্থালীর টুকিটাকি কাজকর্মের সহায়ক ৷ বাল্য কাটে হেলাফেলায়-তারপর দশে পা দিতে না দিতেই রীতিমতো কাজের উপযোগি ৷ হত দরিদ্র পরিবারের এরাই শহরে আসে মা খালা বা দূরাত্মীয় কারও সাথে ৷ খাওয়া পরার তাগিদে, কারও কাজের মেয়ে হতে ৷ বাড়িতে থাকলে মায়ের যাবতীয় কাজের অংশীদারিত্ব নিয়েই এগুতে থাকে তার কৈশোরে৷ এরপর যৌবনে পা রাখতে না রাখতে হয় বিয়ে হয়, নয়ত অপেমান পাত্রী হিসেবে প্রায়শঃ ধিকৃত, বঞ্চিত হয়৷ আজকে রাষ্ট্রীয় শিক্ষানীতির উদারতায় দরিদ্র প্রায় সব পরিবারই তার কন্যাসন্তানদের কাছাকাছি প্রাইমারী স্কুলে পাঠান ৷ কিন্তু ওরা ঝরে পড়ে নানা কারণে এবং পরিবারের দায়ে ৷ গ্রাম বাংলায় অলক্ষ্যে দেখা যায়, মহিলাদের উর্বর সময়ের সদ্বব্যবহার হয়৷ বছরে বছরে সন্তান জন্মে ৷ তারা ধরে নেয়, সবতো বাঁচবে না! মরে বেঁচে অবশিষ্ট দু'চারটা তাও পুত্র সন্তান টিকে থাকলেই সার্থক তার মা হওয়া এবং বিবাহিত জীবনের মূল চাহিদা মেটানো ৷ তাই পরিবারে আর এক শিশশুর জন্ম হলেই, কন্যাশিশুটি ছোট্ট মা হয়ে ওঠে বা নবজাতকের দেখাশুনার অভিভাবক হয়ে দাঁড়ায় অবস্থার কারণে৷ মায়ের তো আরো কাজ আছে! তাদের দু'বেলা আহার পরিবেশন করা বা অনেক সময় যোগানোর দায়িত্ব ৷ মূল কথা, বাংলার আপামর দরিদ্র্য জনগোষ্ঠির কন্যাশিশু অধিকাংশ ক্ষেত্রে শৈশব বঞ্চিত ৷ তারা শৈশবে মুক্ত বিহঙ্গের মতো আনন্দমুখর জীবন পায়না, শৈশবেই সূচিত হয় তার ভারাক্রান্ত দায়িত্বের জীবন, যা ধীরে অবয়বে শতগুণ বৃদ্ধি পায় বয়সের সঙ্গে সঙ্গে জীবন সংগ্রামের ভয়াবহতায় ৷ তারই পাশে তার ভাইয়ের জীবনে দারিদ্র্য আছে, কিন্তু আছে স্বাধীনতা, কিছু সস্তা বিনোদনের অবস্থান ৷ হয়ত পঁচা পুকুরে সাঁতার, ছোট্ট খালি পায় খালি গায় কাবাডি বা এটা ওটা দিয়ে ফুটবল খেলা ইত্যাদি৷ যে সুযোগ কন্যাশিশুর হয়ই না বলতে গেলে ৷
|
|
এবার প্রসঙ্গ: কন্যাশিশু বাংলাদেশের জনসংখ্যার কত অংশ?
|
|
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৩ থেকে ২৪ শতাংশ ১৫ বছরের কম বয়সী কিশোর কিশোরী ৷ যার প্রায় অর্ধেক অর্থাত্ ৪৮ ভাগ কন্যাশিশু ৷ কন্যাশিশু যে পর্যায়ে যুব অনুভূতি প্রবণ, সেই বয়স তথা ১০-১৪ বছরের কন্যাশিশু ৭৭ লক্ষ (১২.৬%) আর ১৫-১৭ বছর বয়সীরা মোট জনসংখ্যার শতকরা ২.২৯ ভাগ ৷ কন্যাশিশুর শ্রম বিভাজন লক্ষণীয় ৷ ১০-১৪ বছর বয়সী কন্যাশিশুদের মধ্যে ২৩ লক্ষ (শতকরা ২৮ ভাগ) শিশু এবং ১৫-১৯ বছর বয়সী কন্যাশিশুদের মধ্যে ২৪ লক্ষ (শতকরা ৪৮ ভাগ) অর্থনৈতিক কর্মকান্ড সক্রিয় ৷ ১৪-১৬ বছর বয়সী ৪ লক্ষ নারী শ্রমিক পোষাক শিল্পে নিয়োজিত রয়েছে ৷ উল্লেখ্য এই পোষাক শিল্প বাংলাদেশের সর্ববৃহত্ অর্থকরী রপ্তানী শিল্প ৷ এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে যে বিপুল সংখ্যক কন্যাশিশু তাদের অমূল্য শৈশব-কৈশোরের তাবত্ প্রাণশক্তি ঢেলে দিচ্ছে, তাদের যাপিত জীবনের স্বরূপটি খুবই ভয়াবহ ৷ সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত শ্রম দিয়েও তারা শিকার হয় মজুরি বৈষম্যের, থাকে অস্বাস্থ্যকর বস্তির ঘিঞ্জি ঘরে, যাওয়া-আসার পথে সম্মুখীন হয় কটুক্তি-এসিড সন্ত্রাস-ধর্ষণ সহ নানামাত্রিক নির্যাতনের ৷ কখনও বা মুনাফালোভী মালিকের অব্যবস্থাপনার মূল্য দিতে আগুনে পুড়ে ছাই হয় তারা ৷ সেই নারী শিশু তথা কন্যাশিশু, ছেলে শিশুর তুলনায় চরম ঔদাসীন্যের শিকার-যা নির্যাতন হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে ৷ তার স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নিরাপত্তার উপর পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কোন গুরুত্ব আরোপ করা হয় না ৷ বাস্তবে এই কন্যাশিশুই পরিবার, সমাজ তথা জাতির সার্বিক উন্নয়নের চাবিকাঠি৷ সে কথা বিস্মৃতই থাকে ৷
|
|
উপরোক্ত পটভূমির প্রেক্ষিতে বন্যায় তথা যে কোন নৈসর্গিক বা অনৈসর্গিক বিপর্যয়ের সময়ে কন্যাশিশুর অবস্থান অকল্পনীয় ৷ সর্বস্থলে সে 'বলীর পাঁঠা' ৷ তার উত্পাদন মতা, সৃজনশীলতা উপেতি তাকে সমাজ অর্জন করার চেষ্টাতো করেই না, অতি সহজে বর্জন করে যে কোন বিপদের সম্মুখীন হলেই ৷ এইতো দিন কিছু আগে বন্যায় প্লাবিত হলো বাংলাদেশের নিম্নাঞ্চল ৷ জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে শুরু করে এর প্রকোপ চলছে প্রায় অগাস্টের শেষ অবধি ৷ দৈনিক সংবাদপত্র নানা অঞ্চল, যেমন: সিলেট, সিরাজগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, ঢাকার কিছু অংশ ইত্যাদির দুর্দশার ছবিসহ সংবাদ পরিবেশন করেছে ৷ মানুষ অথৈ পানির কাছে বন্দি হয়ে জিম্মি ৷ এক একটা অঞ্চলে ত্রাণ পৌঁছানো দূরূহ ছিলো ৷ লোকে বাঁশের মাথায় টং করে, চালের উপরে, সাপ-হেন জীবের সংগে সহঅবস্থান করেছে৷ ঘুমন্ত শিশু মায়ের অজান্তে বানের পানিতে ভেসে গেছে ৷ কন্যাশিশুর অবস্থান সবার পরে ৷ ছেলেদের মতো সে সাঁতরে গিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে, ত্রাণের সন্ধানে সহজে যেতে পারে না ৷ ভাসমান সামান্য আশ্রয়ের অভ্যন্তরে তার অবস্থান ৷ সে হয়ত মাকে সাহায্য করছে-ধুমায়িত চুলার সম্ভাব্য খাদ্যের যোগান দিচ্ছে বা ছোট ভাইবোন বা অচল বৃদ্ধাদের দেখাশুনায় কর্তব্যরত ৷ হয়ত অভিভাবক পরিবারকে বাঁচানোর জন্য নানা উদ্যোগে ত্রাণ শিবিরে বা আশ্রয় কেন্দ্রে সারাদিন ধর্না দিচ্ছে ৷ কন্যাশিশু তার নির্ধারিত স্থানে নিরাপত্তাবিহীন নানা সংকটে ঘন্টা, দিন পাড়ি দিচ্ছে অনিশ্চয়তার ৷ তার জীবন তখন নিরাপত্তাবিহীন বিভীষিকাময় ৷ জীবন ও জীবিকা সন্ধানী বড়দের কিছু বলার সাহস তার নেই ৷ তার স্বাভাবিক শালীনতা, লজ্জা সব হিসেবের বাইরে ৷ মানুষের শুধু বাঁচার তাগিদ ৷ কন্যাশিশি ভিজা বস্ত্র, হয়ত প্রায় বস্ত্রহীন অবস্থায় অবস্থান করছে ৷ তার স্বভাবসুলভ জড়তা, আব্রু সব তখন অবহেলিত ৷ এহেন অবস্থায় সে পুরুষের লালসার শিকার হয় খুব সহজে ৷ অবস্থা বুঝে সে পরিবারের নিলামে উঠে তাদের সুখ সুবিধা রক্ষা করে ৷ সুযোগ বুঝে কেউ কুমতলবের আশ্রয় নেয় ৷ পরে সে একেবারে পরিবার বিচ্ছিন্ন হয় ৷ তাকে পাচার করার সহজ সুলভ পণ্য হিসেবে পেয়ে যায় এ দুঃসময়ে বন্যার অবস্থায়৷ কখনোবা সামাজিক আয়োজনের বিয়ের মধ্য দিয়েও তাকে ঘিরে এক ধরণের ব্যবসা হয় ৷
|
|
দেশের
দুই-তৃতীয়াংশ জুলাইয়ের ১০ তারিখে একেবারে পানির তলায়
৷ রাস্তা, সেতু, রেল লাইন, বাঁধ,
ক্ষেতি
জমি, বসতবাড়ি, গৃহপালিত পশু
সবই ভাসছে
৷ পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়ে একটু আশ্রয়ের জন্য ছুটছে
৷ এর মাঝে কত সন্তান কে কোথায় ছিটকে হারিয়ে গেছে চিরতরে এবং
পরবর্তী
জীবনে সে গৃহহারা, পরিবার হারা, স্বজন হারা এক একক ব্যক্তিত্ব
৷ ছেলেরা দুযোগ
শেষে খুঁজে পেতে যদিবা ঘরের, পরিবারের খোঁজ নিয়ে ফিরে আসতে
পারে, কন্যাশিশুর
শিকড়হানি হলে সে আর নোঙ্গর খুঁজে
পায় না
৷ তার পরবর্তী
জীবন নানা খাদে বৈধ বা অবৈধ পথে প্রবাহিত হয়
৷ জীবন প্রবাহে সে চিরদিনের মতো তলিয়ে যায়
৷ অপরপক্ষে
একটি ছেলে শিশু
ভাসতে ভাসতেও জেগে উঠতে পারে
৷ প্রচুর ইচ্ছাশক্তির বিনিময়ে৷ কন্যাশিশুর
মতো সে গৃহবিচুত্য,
সমাজবিচুত্য
হয়না
৷ কন্যাশিশু
সবসময় একটি ঠিকানায় বাঁধা
৷ ঠিকানা বিচ্ছিন্ন হলে চিরকাল অহেতুক অপবাদ নির্যাতনের
শিকার হতে হয়
৷ বন্যা বাংলাদেশে নিয়মিত অতিথি, কন্যার ভাগ্য বিড়ম্বিত হয়
প্রতিটি
দুযোগ,
বন্যা একটি প্রধান উপাদান বিড়ম্বনার
৷ |
|
প্রতিবার বন্যা বিগতকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে ৷ এবার ১৯৮৮, ১৯৯৮ কে ছাড়িয়েছে৷ জনসংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাই সমস্যার মোকাবেলা ক্রমবর্ধমান ৷ আর কন্যাশিশুর অবস্থানের অবনতি সেই সঙ্গে বেড়ে চলছে ৷ আগে যে সমস্যা খানিকটা নিম্নস্তরে ছিলো তা হয়ে উঠছে বিরাট ৷ যেমন সন্ত্রাস, যৌতুক, এসিড ছোড়া, ধর্ষণ, অপহরণ, পাচার, মাদকাসক্তির শিকার এবং এইডস, এইচআইভির মরণ ছোবল ৷ আর এ সবের প্রধান শিকার কে? সেই অবুঝ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গৃহহীন 'কন্যাশিশুটি ৷ সে ছিন্নমূল নক্ষত্রের মতো ৷ বন্যায় যে আশ্রয় আকড়ে ধরে পরিবার, তা এক একটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপ-আর সেই দ্বীপে প্রায়শঃ একা পড়ে থাকে নানা দায়িত্বের বোঝা নিয়ে কন্যাশিশু ৷ সুযোগ সন্ধানী দালাল বা অনুরূপ চরিত্রের অভাব তখন ঘটেনা ৷ সে নির্বিকারে হচ্ছে ধর্ষিতা, অসময়ে নির্মম যৌন অভিজ্ঞতার শিকার হয়তো পরিবারেরই কারো দ্বারা ৷ সে প্রকাশ করতে অপরাগ ৷ নীলকন্ঠ হয়ে গরল পান করতে হয় তাকে ৷ এক পর্যায়ে হয়ত সে গর্ভবতীও হয় ৷ তারপর গঞ্জনা, গৃহত্যাগ এবং কখনও কখনও আত্মহননের পথ বেছে নেওয়া ৷ বন্যার পানিতে প্রাচীর ভাঙবে সে কেমন করে? সব অসহায়ত্ব নিয়ে সে প্রবল বন্যার দেড় থেকে দুই মাস অতিক্রম করে ৷
|
|
বন্যা শেষে কি হয়? তার লেখাপড়ার সামান্য সরঞ্জাম যা হয়তো ভেসে গিয়েছিলো তা আর যোগাড় হয় না ৷ পোষাক শিল্পের সাথে জড়িত থাকলেও নূন্যতম পোষাকের যোগাড় হওয়া কঠিন ৷ শিশু শ্রম দানে সে সচল এবং পারিবারিক অবস্থান আরও অচল, আবর্জনার মত৷ ইচ্ছায়, অনিচ্ছায় সে চোরা গলির শিকার হয়- অন্ন, বস্ত্র, খাদ্য, গৃহ, শিক্ষার কথা বলাই বাহুল্য ৷ সরকারি-বেসরকারি খাতে বা পূনর্বাসন প্রকল্পে দেশবাসী এগিয়ে এলেও, বিশাল জনগোষ্ঠীর তুলনায় সবই অপ্রতুল ৷ গৃহপালিত পশুর বিনিময় মতা থাকলেও সে যা ইজ্জত পায়, কন্যাশিশু সে মর্যাদাটুকুও পায় না ৷ বন্যার আনুষঙ্গিক যে অসুখ তার চিকিত্সা কন্যাশিশু তথা কন্যাসন্তানের জন্য প্রায়শঃ ব্যয় করা হয় না ৷
|
|
এবারে কন্যাশিশু দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে," আমাদের অঙ্গীকার: কন্যাশিশুর অধিকার" ৷ আমাদের অভিভাবকদের এ শ্লোগানকে বাস্তবায়িত করার দায়িত্ব ঘর থেকে করতে হবে শুরু ৷ প্রতিটি ঘরে কন্যাশিশুর নিঘ্কলুষ শৈশব রক্ষার দায়িত্ব সবার ৷ তাই আমাদের অঙ্গীকার- আমাদের সবচাইতে যে বড় সম্পদ 'কন্যাশিশু', তার একফোঁটা চোখের পানি অর্থহীন হয়ে বন্যার পানিতে যেন না ভেসে যায় ৷ এটা তার প্রত্যাশা নয়, তার নিজস্ব দাবী, তার জন্মগত অধিকার৷ এ অধিকার আমরা দেব পরিবার থেকে, সমাজ তার দৃষ্টিভঙ্গি বদলাবে, ফলে রাষ্ট্র দিতে বাধ্য হবে ৷ আর এই সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে তার সুস্থ শৈশব নিশ্চিত হবে ৷
|
|
পিতৃতান্ত্রিক, দরিদ্র, বৈষম্যমূলক সামাজিক কাঠামোতে কন্যাশিশু জন্মাবধি অবহেলা আর বৈষম্যের শিকার ৷ বন্যা আনে আরও আনুষঙ্গিক ভয়াবহ পরিবেশ তার সব সম্ভাবনা ঐ যমুনা, পদ্মা, ধলেশ্বরী, বুড়িগঙ্গার প্লাবন প্রবাহে ধুয়ে চলে যায় ৷ স্বপ্ন আর আশা তার জীবনে দুঃস্বপ্ন হয়েই থেকে যায়৷ ঠাঁইবিচ্ছিন্ন, নিরাপত্তাবিহীন অনিশ্চিত বর্তমান থেকে সে নিষ্কৃতি পেতে পারে, যদি আমরা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন করি ৷ অর্থাত্ তার সঠিক মূল্যায়ন করে, তাকে জাতির মেরুদন্ড হিসেবে তার নারী সত্ত্বা বিকাশে পরিপূর্ণ সহযাগিতা করি ৷ মনে রাখতে হবে যে কন্যাশিশু আজ শিশু, আগামী দিনে সে ছেলে এবং মেয়ে উভয়ের মায়ের দায়িত্ব নেবে৷ সেই গড়ে তুলতে পারে সুযোগ্য নাগরিক, গড়তে পারে সৃজনশীল, আত্মনির্ভরতাপুষ্ট একটি জাতি তাই তাকে চেনার দায়িত্ব আমার, আপনার এবং সবার ৷ |
|
© 2005 The Hunger Project-Bangladesh. All rights reserved. |