বাংলাদেশের কন্যা শিশু - কিশোরীদের অবস্থান : কয়েকটি কেস স্টাডি

কন্যাশিশু দিবস সংখ্যা

উজ্জীবক বার্তা, বর্ষ-৩, সংখ্যা-১৭, সেপ্টেম্বর-২০০৪

শারমিন মুরশীদ
প্রধান নি
র্বাহী কর্মকর্তা, ব্রতী
 

বিশ্ব জুড়েই কন্যাশিশুরা বহুমুখী বঞ্চনা, বৈষম্য ও নির্যাতনের শিকার ৷ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে এই বাস্তবতা আরও রূঢ়, আরও করুণ ৷ বাংলাদেশের কন্যাশিশু ও কিশোরীরাও এই বাস্তবতার বাইরে নয় ৷ অশিক্ষা অসচেতনতা, ধর্মীয় গোঁড়ামি, সামাজিক পশ্চাদপদতা আর পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার প্রবল প্রতাপে এই সংকট আরও ঘনীভূত হয়ে উঠেছে ৷ বাংলাদেশের কিশোরীদের প্রকৃত বাস্তবতা বোঝার জন্য আমরা এখানে কয়েকটি কেস স্টাডি তুলে ধরছি

 

কেস ষ্টাডি - ১: শিউলী আফাজ

শিউলী আফাজ হাজী মোহাম্মদ আফাজউদ্দীনের একমাত্র কন্যা ৷ হাজী মোহাম্মদ আফাজউদ্দীন বাংলাদেশ ফাইট ক্যাটারিং সেন্টারে কাজ করেন৷ শিউলীর বড় তিন ভাই রয়েছে ৷ তাদের একজন কুয়েতে থাকে ৷ শিউলীদের নিজেদের বাড়ী রয়েছে

 

শিউলী সতের বছর বয়সী, লম্বা এবং অত্যন্ত সুন্দর একটি মেয়ে ৷ তার উজ্জ্বল দু'টি চোখই বলে দেয় যে সে অত্যন্ত মেধাবী ৷ সে ভালো পোষাক পরিহিত এবং অত্যন্ত নম্র স্বরে কথা বলে ৷ কিছুদিন আগে যখন পরিবার তার বিয়ের উদ্যোগ নেয়, তখন সে নিজে এটা থামাতে পেরেছিলো, কারন বাল্য বিবাহের কুফল সে ইতিমধ্যে জেনে নিয়েছিলো ৷ সে চেয়েছিলো তার লেখাপড়া শেষ করে একটি সুন্দর কর্মজীবন গড়ে তুলতে

 

প্রতিবেশী এক যুবক গত চার বছর ধরে ক্রমাগতভাবে শিউলীকে উত্যক্ত করে আসছিলো ৷ সে সারাদিন শিউলীদের বাসার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতো ৷ শিউলী এতে কোন সাড়া না দিলেও সে অনড় থাকে ৷ সে শিউলীকে 'রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে যাবে' অথবা 'এসিড ছুঁড়ে তার মুখ ঝলসে দেবে' বলে হুমকি দেয় ৷ শিউলী নিরূপায় হয়ে বোরখা পরে কলেজে আসা যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, যাতে ছেলেটি তাকে চিনতে না পারে ৷ কিন্তু এই ছেলের হুমকিতে শিউলী খুবই উদ্বিগ্ন এবং বিচলিত হয়ে পড়েছিলো ৷ ছেলেটি সব সময় তাদের বাসার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে আর সেজন্য শিউলী'র অভিভাবকরা উল্টো তাকেই দোষারোপ করে ৷ দুই মাস আগে একদিন সে তাদের ড্রয়িং রুমে বসেছিলো ৷ ঐ সময় বখাটে ছেলেটি প্রতিদিনকার মতো তাদের জানালা বরাবর রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকায় তার বাবা এটি দেখতে পেয়ে শিউলীকেই বকাবকি করে ৷ এই ঘটনায় শিউলী অত্যন্ত মুষড়ে পড়ে ৷ কারণ যে ঘটনার জন্য সে মোটেও দায়ী নয়, তার পরিবার সে জন্য তাকেই দোষারোপ করেছে৷ তার এতই মন খারাপ হয় যে, সে তার শোবার ঘর থেকে একটি কাঁচের গ্লাস নিয়ে এসে তা ভেঙ্গে টুকরো করে এবং ভাঙ্গা কাঁচের টুকরো টুকরো দিয়ে নিজের দুই বাহু পোঁচ দিয়ে দিয়ে কেটে ফেলে ৷ ডান হাতের একটি পোঁচ এতই গভীর ছিলো যে, আরেকটু হলেই তার একটি ধমনী কাটা পড়তো ৷ সে কেন এ কাজ করতে গেলো, তাকে এ প্রশ্ন করা হলে শিউলী বলে যে, সে নিজেকে আহত করার মাধ্যমে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করতে চেয়েছিলো ৷ সে আরো জানায় যে, এই ঘটনার পর সে মারাত্মক বিষন্নতায় আক্রান্ত হয়েছে এবং সে নিজে নিজে কাঁদে ৷ সে জানেনা, কার সাথে সে এই সমস্যা নিয়ে কথা বলতে পারে ৷ শিউলী স্থানীয় ক্রাইম ম্যাগাজিনে ভৌতিক গল্প পড়তে পছন্দ করতো এবং নিজেকে এসব অপরাধ বা ভৌতিক ঘটনাবলীর শিকার মনে করতো

 

ম্প্রতি শিউলী তার স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেছে ৷ এমনকি সে তার নিজের সহপাঠীদেরও চিনতে পারেনা ৷ সে চেহারাগুলো মনে রাখতে পারেনা ৷ এ অবস্থা থেকে উদ্ধারের জন্য সে সাহায্য চায়, কিন্তু জানেনা কেমন করে তা সম্ভব হবে

 

কেস ষ্টাডি - ২: তামান্না আক্তার অভি

তামান্না আকতার অভি চৌদ্দ বছরের একটি উচ্ছল মেয়ে ৷ তার পিতা বাবলা চৌধুরী ওরফে আবদুস সাত্তার বিক্রমপুর থেকে আগত ৷ বাবলা চৌধুরী ইসলামপুরের একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ৷ তিনি স্ত্রী, দুই মেয়ে এবং এক ছেলেকে নিয়ে গোড়ানে একটি দুই রুমের টিন শেড বাসায় ভাড়া থাকেন ৷ প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর থেকে সারা জীবন তিনি এই গোড়ান এলাকাতেই বাস করেছেন ৷ অভি তার ছোট মেয়ে এবং সে স্থানীয় আলিয়া মাদ্রাসা স্কুলে কাস সেভেনে পড়ে

 

অভি খুবই উজ্জ্বল এবং সম্ভবনাময় বালিকা ৷ তার নেতৃত্ব দানের মতা রয়েছে৷ বিগত জাতীয় টীকা দিবসে তার ওয়ার্ডের সমস্ত শিশুর টীকা গ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য সে সারাদিন স্বাস্থ্যকর্মীদের সাথে কাজ করেছে ৷ সে স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ করতে পছন্দ করে এবং গান গাইতে ও নাচতে ভালোবাসে৷ শুধু তাই নয়, অভি আকর্ষনীয় এবং উজ্জ্বল ব্যক্তিত্বের অধিকারী ৷ সে সুন্দরও বটে ৷ তার ফর্সা এবং দীপ্যমান চেহারার কারণে খুব অল্প বয়সেই স্থানীয় ছেলেদের নজর পড়ে তার প্রতি এবং তারা তার দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করতে শুরু করে ৷ কিন্তু আত্মবিশ্বাস এবং নিজের বর্তমান অবস্থায় সুখী ছিলো বলে, সে কখনো এসব অনাকাঙ্খি আকর্ষণের প্রতি গুরুত্ব দেয়নি

 

১৯৯৫ সালে থেকে রবিউল মনির নামের ২৫ বছর বয়সী এক যুবক অভিকে অনবরত উত্যক্ত করে আসছিলো ৷ মনির একজন ওয়ার্কশপ শ্রমিক এবং স্থানীয় অধিবাসী৷ সে ছিলো ড্রাগ এবং অ্যালকোহলে আসক্ত ৷ সে কয়েকবার অভিকে বিয়ের প্রস্তাব দেয় এবং অভি'র মা বাবার কাছেও প্রস্তাব পাঠায় ৷ অভি'র পরিবার তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেও সে হাল ছাড়েনা ৷ এরপর সে প্রতিদিন অভির স্কুলে যাওয়ার পথে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতো এবং কুত্‍সিত মন্তব্য করার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত উত্যক্ত করতো ৷ এটা এতই অসহনীয় পর্যায়ে পৌছায় যে, শেষ পর্যন্ত অভি'র মা বাধ্য হয়ে মেয়ের সাথে স্কুলে আসা যাওয়ার পথে সঙ্গ দেওয়া শুরু করেন ৷ এরপর মনির রাতের বেলা অভিদের বাড়ীর টিনের চালে ঢিল ছোঁড়া এবং দরজা ও জানালায় টোকা দেওয়া শুরু করে ৷ এরকম এক রাতে সে হাতেনাতে ধরা পড়ে এবং অভি'র বাবা থানায় অভিযোগ দায়ের করেন৷ পুলিশ মনিরকে ধরলেও পরে ছেড়ে দেয় ৷ এরপর সে তার ভাবিকে অভিদের বাসায় পাঠায় তার অভিভাবকদের রাজী করানোর জন্য ৷ অভি'র অভিভাবকরা এই প্রস্তাব পূনরায় প্রত্যাখ্যান করেন ৷ ১৯ শে জুলাই, ১৯৯৬ তারিখে মনিরের ভাবি অভিদের বাসায় আসে এবং বলে, মনির ক্যান্সারে আক্রান্ত ও খুব শীঘ্রই মারা যাবে ৷ এই কথা বলে অভি'র বাবাকে মনিরের বিরুদ্ধে দায়ের করা অভিযোগ তুলে নিতে বলে ৷ কিন্তু অভি'র অভিভাবকরা তাতে রাজী হননা

 

সেদিনই চলচ্চিত্র নায়িকা মৌসুমী এবং নায়ক ওমর সানীসহ একদল চলচ্চিত্র কর্মী অভিদের বাড়ির কাছে শ্যুটিং করতে আসে ৷ স্বাভাবিকভাবেই অভিদের মহল্লার প্রায় সকলেই এই শ্যুটিং দেখতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে ৷ দুপুর আনুমানিক ১টা ২৫ মিনিটের দিকে অভিও শ্যুটিং দেখার জন্য শ্যুটিং স্থলের নিকটবর্তী তার বোনের বাসার উদ্দেশ্যে বের হয় ৷ রাস্তায় মনির অভি'র পথ আগলে দাড়ায় ৷ অভি দ্রুত চলে যাবার চেষ্টা করে, কিন্তু মনির বারবার তার গতিরোধ করার চেষ্টা করতে থাকে ৷ হঠাত্‍ করে অভি তার বাম কাঁধে কিছুর আঘাত অনুভব করে ৷ সে তখন চিত্‍কার করে বলে, " তোমার কতবড় সাহস, তুমি আমাকে স্যান্ডেল দিয়ে আঘাত করলে!" অভি তখনো বুঝতেই পারেনি যে মনির তাকে স্যান্ডেল দিয়ে নয়, বটি দিয়ে আঘাত করেছে ৷ কয়েকটি আঘাতের পর অভি মাটিতে পড়ে যায় এবং মনির তার পেটের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ৷ অভি তাকে না মারার জন্য মনিরকে বার বার অনুনয় করতে থাকে৷ প্রত্যুত্তরে মনির বলে, "আজ তোকে আমি শেষ করে ফেলব, তোর রূপ ধবংস করে ফেলব, তুই খুব রূপের অহংকার করিস, আমি তোর সুন্দর মুখ ধবংস করে ফেলব ৷" এই বলে মনির অভি'র মুখে বটি দিয়ে আঘাত করতে থাকে ৷ অভি বটির কোপ থেকে তার মুখ রক্ষার জন্য দুহাত দিয়ে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে৷ ফলে তার বাম কব্জিতে বটির কোপ পড়ে এবং শরীর থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়৷ কমপক্ষে ৫ মিনিট ধরে মনির অভির ওপর এই আক্রমণ চালায় ৷ এসময় একজন মহিলা দেখে ফেললে মনির পালিয়ে যায় ৷ অভির শরীর থেকে তখন প্রচন্ড রক্তপাত হচ্ছিল; কিন্তু মহিলা আতংকিত হয়ে তাকে উদ্ধারে এগিয়ে না এসে অভিদের বাসায় গিয়ে জানায় যে, একটি মেয়ে আক্রান্ত হয়েছে ৷ অভি'র মা বাবা তখন ছুটে যান, তারা গিয়ে দেখেন যে, আক্রান্ত মেয়েটি তাদেরই মেয়ে ৷ এই বর্বর আক্রমণে অভি একবারও জ্ঞান হারায়নি ৷ যখন তার বাবা তাকে তোলার চেষ্টা করছিলো তখন সে তার বাবাকে বলেছিলো তার বাম হাতটি ধরার জন্য, কারণ তার ঐ হাত শরীর থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে বাহুর সাথে ঝুলছিলো

 

অভিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয় ৷ সেখানে অভি'র শরীরের বিভিন্ন অংশে সেলাই দেওয়া হয় ৷ এরপর হাড়ের অপারেশনের জন্য তাকে পঙ্গু হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয় ৷ পাঁচ ঘন্টার অপারেশন এবং ১৯ দিন হাসপাতালে থাকার পর অভি বাসায় ফেরে ৷ তার সমস্ত শরীরে এখন ক্ষতচিহ্ন এবং তার বাম হাত অবশ হয়ে গিয়েছে ৷ এই কাপুরুষোচিত বর্বর আক্রমণের শিকার হয়ে অভিকে এখন পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়েছে, কারন সে তার চেয়ে কমপক্ষে দশ বছরের বেশী বয়সী একজন মানুষের বিকৃত বাসনা প্রত্যাখ্যান করেছিলো

 

কেস ষ্টাডি - ৩: জুলেখা খাতুন

ইমাজউদ্দিন আগে ভ্যান চালাতেন ৷ কিন্তু বর্তমানে বার্ধক্য এবং অসুস্থতার কারণে তিনি আর ভ্যান চালাতে পারেন না ৷ মাঝে মধ্যে গ্রামে দিনমজুর হিসেবে কাজ করেন৷ ইমাজউদ্দিনের দুই ছেলে তিন মেয়ে ৷ খড়ের ছাউনী দেয়া একটি দুই ঘরের মাটির বাড়িতে ইমাজউদ্দিন পরিবার নিয়ে বাস করেন ৷ তার বড় ছেলে হাই স্কুল পর্যন্ত পড়েছে, কিন্তু কোন কাজ জোগাড় করতে পারেনি ৷ দ্বিতীয় ছেলেও ভ্যান চালায় এবং সেই এখন পরিবারের প্রধান রোজগারকারী ব্যক্তি ৷ জুলেখা পরিবারের দ্বিতীয় মেয়ে ৷ সে 'স্বেচ্ছাসেবী বহুমুখী মহিলা সমাজ কল্যাণ সমিতি'র বৃত্তি নিয়ে লেখাপড়া করছে এবং এবার এস এস সি পরীক্ষা দেবে ৷ জুলেখা অত্যন্ত মেধাবী এবং তার মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলী রয়েছে

 

১৮ মাস আগের কথা ৷ গ্রামের একজন ঘটক জুলেখার জন্য একটি বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে তার বাবা ইমাজউদ্দিনের কাছে আসে ৷ পাত্র পুলিশ বাহিনীতে চাকুরী করে এবং সে জুলেখাকে দেখে বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছে ৷ পাত্রের কোন দাবী নেই এবং কোন যৌতুক ছাড়াই সে জুলেখাকে বিয়ে করতে রাজী ৷ ইমাজউদ্দিনের কাছে এর চেয়ে ভালো প্রস্তাব আর হতে পারেনা, যেখানে তার বড় মেয়েকে শ্বশুর বাড়ি থেকে ফিরে আসতে হয়েছিলো জামাতার যৌতুকের দাবী মেটাতে পারেনি বলে৷ ইমাজউদ্দিনের পক্ষে এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা কঠিন ছিলো ৷ কিন্তু জুলেখা বিয়ের জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলোনা ৷ জীবনটাকে গড়ে তোলার জন্য তার অন্য পরিকল্পনা ছিলো ৷ সে শিক্ষিত হয়ে ভবিষ্যতে চাকুরী করবে বলে পরিকল্পনা করেছিলো ৷ কিন্তু তার বাবা এবং অন্যান্য বয়োজ্যেষ্ঠরা বিয়েতে রাজী হওয়ার জন্য বার বার অনুরোধ করতে লাগলো ৷ তখন জুলেখা ভাবলো যে, তার বাবা যদি যৌতুক না দিয়ে তার বিয়ে দিতে পারেন তাহলে কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা এবং পরিবারের বোঝা অনেক লাঘব হবে৷ জুলেখা ভেবেছিলো পরিবারের উপর চাপ কমানো তারও দায়িত্ব, কাজেই সে রাজী হলো ৷ বিয়ের তারিখ নির্ধারিত হলে যথাসময়ে গ্রামের মুরুবিব শ্রেনীর ব্যক্তিবর্গ এবং পাত্রের বড় ভাইয়ের উপস্থিতিতে জুলেখার বিয়ে হয়ে গেলো

 

জুলেখার স্বামী যেভাবে কথা দিয়েছিলো - তাকে আলাদা বাসা করে নিয়ে যাবে, সে অনুযায়ী কখনোই তাকে আলাদা বাসায় নিয়ে যায়নি ৷ সে বার বার সময় নিতে থাকলো ৷ কিন্তু সে নিয়মিত জুলেখার বাবার বাড়িতে আসতো এবং রাত কাটাতো ৷ এই ভাবে প্রায় সাত মাস কেটে গেলো ৷ যেহেতু জুলেখা স্থায়ীভাবে তার স্বামীর সাথে থাকতোনা, সেহেতু সে নিয়মিত কোন জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার করতোনা, যদিও সে এর সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে জানতো ৷ সাত মাস অনিয়মিত দাম্পত্য জীবন অতিবাহিত করার পর জুলেখা অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লো ৷ এত তাড়াতাড়ি অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার ব্যাপারে তার ব্যাখ্যা হলো, তার পিরিয়ডে সমস্যা ছিলো এবং পিরিয়ডের সময় তীব্র যন্ত্রণাদায়ক ব্যথা হতো ৷ ব্যথা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য তার মা স্থানীয় হোমিওপ্যাথের কাছ থেকে পাঁচ টাকা দামের ঔষধ এনে দিয়েছিলো এবং তা খাওয়াতেই সে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে! তাকে যখন প্রশ্ন করা হয় পিল খেয়ে কেউ অন্তঃসত্ত্বা হতে পারে কিনা, তখন সে শুধু চুপ করে থাকে

 

জুলেখা অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার একমাস পরে তার স্বামী পার্বত্য চট্টগ্রামে বদলী হয় ৷ সে জুলেখার পরিবারকে জানায় যে, সে জুলেখাকে তার সঙ্গে নিতে পারবেনা ৷ তবে সে প্রতিমাসে হাত খরচ হিসেবে পাঁচশত টাকা করে জুলেখা'র জন্য পাঠাবে বলে কথা দেয় ৷ এরপর সাত মাস পার হয়ে গেছে, জুলেখা তার স্বামীর কাছ থেকে কোন টাকা বা কোন খবরাখবর কিছুই পায়নি

 

এখন জুলেখা'র প্রসবকাল ঘনিয়ে এসেছে ৷ তার বিবর্ন এবং যন্ত্রণাকাতর হাসির মধ্যে স্পন্দমান এবং উচ্ছল, উজ্জ্বল মেয়েটিকে খুঁজে পাওয়া কঠিন ৷ দুই চোখে চকচক করতো যে আত্মবিশ্বাস, এখন পরাজয় তা গ্রাস করে নিয়েছে ৷ সে এটাও জানেনা যে, তার সন্তান ভূমিষ্ঠ হলেই তাকে একটা চাকরী খুঁজে নিতে হবে ৷ তাকে যখন জিজ্ঞেস করা হয় কেন সে বিয়েতে মত দিয়েছিলো, সে শুধু মাথা ঝুঁকিয়ে নীচের দিকে তাকিয়ে থাকে ৷ এমনকি তার বিয়ে কাজী অফিসে রেজিষ্ট্রি হয়েছিলো কিনা তাও সে বলতে পারেনা

 

কেস ষ্টাডি - ৪: রুমানা আক্তার

রুমানার বাবা একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ৷ তার দুই ছেলে এবং দুই মেয়ে ৷ রুমানা'র বয়স ১৬ বছর ৷ সে সকলের ছোট এবং দশম শ্রেনীতে পড়ে ৷ মাত্র তের বছর বয়সে তার বড় বোনের বিয়ে হয়ে যায় ৷ রুমানা'র বয়সও যখন তের বছর, তখন তার দাদা গ্রাম থেকে তার জন্য একটি বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসেন ৷ পাত্র তাদেরই গ্রামের বাসিন্দা, পুলিশ বাহিনীতে অফিসার পদে চাকরী করে এবং গ্রামে অনেক ভূ-সম্পত্তির মালিক ৷ অভিভাবকদের কাছে এটা ছিলো অত্যন্ত লোভনীয় প্রস্তাব ৷ রুমানাকে কিছু না জানিয়ে গোপনে তাকে গ্রামে নেয়া হয় বর পকে দেখানোর জন্য৷ রুমানা দেখতে খুব সুন্দর ৷ কাজেই পাত্র এবং তার পরিবার সাথে সাথেই রুমানাকে পছন্দ করে ফেলে ৷ বিয়ের দিন তারিখ ও অন্যান্য বিষয়ে দুই পরে মধ্যে সমঝোতার উদ্যোগ চলতে থাকে ৷ ঐ সময়ের মধ্যে পাত্র এবং তার পরিবার তিন তিনবার ঢাকায় রুমানাদের বাসায় আসে ৷ রুমানা এই সময়ে তার সম্ভাব্য বিয়ে সম্পর্কে জানতে পারে ৷ এর মধ্যে 'কৈশোর জীবন শিক্ষা কর্মসূচী'তে অংশগ্রহণ করে সে জানতে পারে যে, তার এই প্রস্তাবিত বিয়ে শুধু অবৈধই নয়, তার বয়স এত কম যে শারিরীক এবং মানসিক কোনভাবেই বিয়ের দায়িত্ব এবং চাপ বহন করা তার পক্ষেম্ভব নয় ৷ এই বিয়ে বন্ধ করতে রুমানা তার বড় ভাইয়ের সহযোগিতা চায় ৷ কিন্তু তার পরিবার এমন একটি ভালো প্রস্তাব এত সহজে ছেড়ে দিতে রাজী নয় ৷ উপায় না দেখে রুমানা 'নারী মৈত্রী'র সংগঠকদের সহযোগিতা কামনা করে তার অভিভাবকদের রাজী করানোর জন্য ৷ 'নারী মৈত্রী'র সংগঠকরা রুমানার অভিভাবকদের সাথে আলোচনা করেন এবং অল্প বয়সে বিয়ের এবং তার ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে তাদের বোঝাতে সম হন ৷ অবশেষে তার অভিভাবকরা বিয়ে বাতিল করতে রাজী হয় ৷ রুমানা এখন তার পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে

 

উপরের চারটি কেসস্টাডি আমাদের সামনে অসচেতনতা, আইন সম্পর্কে অজ্ঞতা, পারিবারিক চাপ ও ভুল সিদ্ধান্ত, নিরাপত্তাহীনতা ও নির্যাতনের যে করুণ ও ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে, তার কোন অলৌকিক ও দ্রুত কার্যকর সমাধান নেই ৷ কিন্তু হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকারও কোন অবকাশ নেই ৷ আমরা যার যার নিজস্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান থেকে এই বাস্তবতা থেকে বেড়িয়ে আসার একক ও যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারি ৷ একটি সমন্বিত সামাজিক আন্দোলনই কন্যাশিশুর অধিকার অর্জনে প্রকৃত ভূমিকা রাখতে সক্ষ

Previous Article<Index>Next Article


Home  / Feedback

© 2005 The Hunger Project-Bangladesh. All rights reserved.