কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্য এবং ক্ষমতায়নের কৌশলগুলো

কন্যাশিশু দিবস সংখ্যা

উজ্জীবক বার্তা, বর্ষ-৩, সংখ্যা-১৭, সেপ্টেম্বর-২০০৪

সালমা খান
চেয়ারপার্সন, বেইজিং প্লাস ফাইভ


 

১. বাংলাদেশ একটি ঘনবসতিপূর্ণ ক্ষুদ্র দেশ (১৪৭,৫৭০ বর্গ কিলোমিটার) যেখানে ২০০১ সালের আদমশুমারী অনুযায়ি প্রায় ১২৬ মিলিয়ন লোক বাস করে ৷ এদেশের জনসংখ্যার ৪৮.৫৫% নারী সর্বশেষ আদমশুমারী অনুসারে, এদেশে প্রতি ১০৬.০৪ জন পুরুষের অনুপাতে ১০০ জন নারী বাস করেন ৷ বাংলাদেশ পৃথিবীর সাতটি দেশের অন্যতম, যেখানে পুরুষের সংখ্যা নারীর চেয়ে বেশি
 

২. পৃথিবীর নবম বৃহত্তর জনসংখ্যা অধ্যুষিত দেশ হলেও, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য সাফল্য দাবী করতে পারে ৷ জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারকারীর সংখ্যা (সিপিআর) ১৯৭৫ সালের ৮.৫% থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০০০ সালে ৫০% সিপিআর - এ উন্নীত হওয়ায়, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে
 

৩. এতদসত্ত্বেও দেশের নাগরিকদের উপর জনসংখ্যার চাপ মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং অধিক জনসংখ্যা এখনও দেশের প্রধান সমস্যা হিসেবে বিদ্যমান ৷ বাংলাদেশে ভবিষ্যতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সম্ভাবনা খুবই বেশী, কারণ দেশের মোট জনসংখ্যার ৪৩% এর বয়স ১৫ বছরের নীচে এবং প্রজননক্ষম নারীর (১৫-৪৯) হার মোট জনসংখ্যার ৪৬%
 

৪. বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রধানতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে 'দারিদ্র' এবং বিভিন্ন গবেষণালব্ধ ফলাফলে দেখা যায় জনসংখ্যার প্রায় ৭০% দারিদ্রসীমার নীচে বাস করে৷ জনসংখ্যার প্রায় ৮০% গ্রামে বাস করে এবং এদের অধিকাংশই নারী ৷ দারিদ্র সারা দেশেই বিস্তৃত, যদিও সরকারী ও বেসরকারী সংস্থাসমূহের (এনজিও) দারিদ্র দূরীকরণের উদ্যোগী ভূমিকার কারণে দারিদ্রর সূচকের নিম্নমুখী গতিধারা লক্ষ্য করা যাচ্ছে ৷ তবে বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই উন্নয়নের গতিধারায় যে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করা কষ্টকর তাদের হিসেবের বাইরেই রাখা হয়
 

৫. সরকার বিভিন্ন সহায়ক পদক্ষেপ গ্রহণ করা সত্ত্বেও বাংলাদেশের নারী ও শিশুরা, বিশেষ করে যারা দরিদ্র পরিবারের সদস্য, এখনও লিঙ্গ বৈষম্য, অধিকারহীনতা এবং বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন ৷ লিঙ্গ-ভিত্তিক সূচক অনুসারে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪০তম ৷ শিক্ষা, উপার্জন, সম্পত্তির মালিকানা, স্বাস্থ্য-সেবা ইত্যাদি ক্ষেত্রে লিঙ্গ-বৈষম্য প্রকট
 

৬. সামগ্রিকভাবে দারিদ্র্য এবং নারীর নিম্ন সামাজিক অবস্থানের কারণে শিশুদের বেঁচ থাকা এবং অগ্রগতি অর্জনও তাদের জীবনচক্রের পুরো সময় জুড়েই হুমকির মুখে রয়েছে ৷ দেশে মাতৃ-মৃত্যুর হা ও নবজাতক মৃত্যুর হার যথাক্রমে প্রতি হাজারে জন্ম নেয়া জীবন্ত শিশুর ৪.৫ ও ৭৮ ভাগ৷ দারিদ্রের নিষ্পেষণেও বিশেষভাবে নারীদেরই আরো বেশি করে আক্রান্ত হবার সম্বাবনা৷ লিঙ্গ-বৈষম্য, অবহেলা এবং অপর্যাপ্ত যত্ন তাঁদের বেঁচে থাকা এবং অগ্রগতিকে প্রভাবান্বিত করে ৷ অপুষ্টিতেও মেয়েরাই বেশী ভোগে ৷ একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, ছেলেদের ৭৫% এবং মেয়েদের ৮৩% রক্তশূন্যতায় ভোগে
 

কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্য

৭. 'বেইজিং প্লাটফরম ফর অ্যাকশন' অনুসারে প্রজনন স্বাস্থ্য হচ্ছে সম্পূর্ণ শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক সুস্থতা, আর এর অর্থ একজন নারীর পরিপূর্ণ ও নিরাপদ যৌন জীবন এবং সন্তান লাভের ক্ষেত্রে তাঁর একক সিদ্ধান্ত এবং পছন্দ করার মতা বা অধিকার৷ স্বাস্থ্য বিষয়ে সর্বোচ্চ মান অর্জনের আনন্দ লাভের অধিকার নারীদের ক্ষেত্রে তাঁদের পুরো জীবন চক্রে অবশ্যই পুরুষদের মতোই হতে হবে
 

৮. বাংলাদেশ-সহ বেশিরভাগ উন্নয়নশীল দেশে মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে ও সন্তান উত্‍পাদনে বাধ্য করা হয় তাঁদের প্রজনন অধিকারের কথা বিবেচনায় না রেখেই ৷ বাংলাদেশের জনসংখ্যার ২৩% এরও বেশির বয়স ১০ থেকে ১৯ বছরের মধ্যে এবং এদের অর্ধেকেরও বেশি মেয়ে ৷ এরা বিবাহিত এবং সন্তানের জন্মদাত্রী ৷ ইউনিসেফ কান্ট্রি রিপোর্ট অনুসারে (১৯৯৯), ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সীদের সন্তান উত্‍পাদন মতা প্রতি হাজারে ১৫৫ জন এবং হিসেবে দেখা গেছে প্রতি বছর ৮০০,০০০ জন অল্প বয়সী নারী বিয়ে এবং মাতৃত্বের বিপদ-ঝুঁকিতে প্রবেশ করছে ৷ পুত্র-সন্তানের অগ্রাধিকারের কারণে ও নারীদের প্রতি বৈষম্যের ফলে প্রায়ই তাঁরা খাদ্য, পুষ্টি, স্বাস্থ্য সেবার সুযোগ থেকে বঞ্চিত এবং এরই ফলশ্রুতিতে নারী শিশুরা সম্পূর্ণভাবে প্রজনন অধিকারহীনতা নিয়েই কিশোরী বয়সে উপনীত হয় ৷ এরাই বয়সের পূর্ণতাপ্রাপ্তির সাথে সাথে স্বাস্থ্য সেবা এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের অভাবের কারণে যৌন-জীবন ও সন্তান-উত্‍পাদন সম্পর্কিত স্বাস্থ্য-ঝুঁকির মুখোমুখি হন এবং বিশেষভাবে এর শিকার হন
 

৯. বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে নারীর প্রজনন স্বাস্থ্যের অবস্থাকে দুটি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যেতে পারে ৷ প্রথমতঃ তথ্যের অভাব এবং সামাজিক সাংস্কৃতিক পরিস্থিতির কারণে দেশে বিদ্যমান অপর্যাপ্ত স্বাস্থ্য সেবা থেকে নারীরা আরো বেশি পরিমাণে বঞ্চিত৷ দ্বিতীয়তঃ তারা এমন অনেক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগেন যেগুলো একান্তভাবে নারীদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য এবং যেগুলো তাঁদের বিরুদ্ধে সতত ক্রিয়াশীল বৈষম্য এবং সন্তান উত্‍পাদনে তাঁদের ভূমিকার সাথে সম্পর্কিত
 

কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্যের উপর লিঙ্গ পরিপ্রেক্ষিতের প্রভাব

১০.জীবনচক্রে ভিন্ন ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার কারণে দারিদ্র ও সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ায় কিশোরীরা কিশোরদের তুলনায় ভিন্ন অভিজ্ঞতা লাভ করেন ৷ এমনকি তাদের নিজস্ব পরিবার ও সমাজের মধ্যেও তারা অধিকতর অরতি থাকেন

 

ক) পুত্র সন্তানের অগ্রাধিকার

পুত্র সন্তানই অধিক পছন্দ - এই মানসিকতা বাংলাদেশসহ অনেক উন্নয়নশীল দেশেই ব্যাপ্ত ৷ মেয়ে-শিশুর প্রতি অবহেলার ফলে তাদের নানা রকম অসুখ ও মৃত্যুর সামাজিক প্রভাব এইসব দেশের পুরুষ ও নারীর ক্ষতিকর অনুপাতের মধ্যেই প্রকাশিত ৷ নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের মতে ভারতের 'হারিয়ে যাওয়া লক্ষক্ষ' (৭৪ মিলিয়ন) নারী যারা ভ্রূণ হত্যা, শিশু হত্যা, বিশেষভাবে নারীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য পুষ্টিহীনতা, স্বাস্থ্য সেবা থেকে বঞ্চিত এবং আরও বিভিন্ন রকম লিঙ্গ-ভিত্তিক বৈষম্যের ও উত্‍পীড়নের শিকার হয়েছিলেন

খ) মেয়েদের জন্য অপর্যাপ্ত খাদ্য ও দুর্বল পুষ্টি

বাংলাদেশে ১ থেকে ৪ বছর বয়সের শিশুদের ক্ষেত্রে প্রতি হাজারে ১৩ জন ছেলেশিশুর বিপরীতে ১৬ জন মেয়ে-শিশুর মৃত্যু ঘটে ৷ খাদ্য বিতরণ, গৃহকাজের চাপ, স্বাস্থ্য বিজ্ঞান, চিকিত্‍সা সেবা এবং শিক্ষা ও বিনোদন লাভের সুযোগ ইত্যাদি ক্ষেত্রে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের মূল এই সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যেই নিহিত ৷ ইউনিসেফের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে, গ্রামাঞ্চলের পরিবারে কিশোরীদের অবমূল্যায়নের কারণে এদের মধ্যে অপুষ্টি একটি সমস্যা হিসেবে থেকেই যাচ্ছে৷ জন্মাবধি লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের কারণে ১৭% মায়েরা খাটো শারীরিক গঠনের, ৫২% মায়েরা কম ওজনের এবং প্রায় ৭০% লৌহ ও আমিষ জাতীয় খাদ্যাভাবের শিকার হন

 

গ) সামাজিক রীতিনীতি ও সংস্কৃতির সাথে স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নের সম্পর্ক

কিশোরীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার অভাব, মেয়েদের বয়ঃসন্ধি এবং মাসিক রক্তক্ষরণের প্রতি সমাজ ও সংস্কৃতির প্রচলিত রীতি-নিয়ম ও দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই উদ্বূত ৷ বিভিন্ন গবেষণা থেকে জানা যায় যে, মাসিক রক্তক্ষরণ শুরু হওয়ার সময় থেকে মেয়েদের অপবিত্র এবং কলুষিত মনে করা হয় এবং সে কারণে তাদেরকে সমাজের বিভিন্ন স্বাভাবিক কাজে অংশগ্রহণ করতে দেয়া হয় না ৷ মাসিক রক্তক্ষরণকে ঘিরে গোপনীয়তার ফলে নারীকে সম্পূর্ণভাবে পৃথকীকরণ এবং ঐ নারীর প্রতি পারিবারিক সহায়তার অভাব অনেক ক্ষেত্রেই নারীর প্রজননতন্ত্রে জীবাণুর সংক্রমণ এবং অন্যান্য নারী -ঘটিত রোগের সৃষ্টি করে৷ জীবাণু সংক্রমনের ফলে পচনজনিত গর্ভপাতসহ নারীর প্রতি নানা ধরণের উত্‍পীড়ন এবং আত্মহত্যা এক তৃতীয়াংশ কিশোরীর মৃত্যুর কারণ ৷ (ইউনিসেফ রিপোর্ট, বাংলাদেশ ১৯৯৯)

 

ঘ) যৌন নির্যাতন এবং স্বাস্থ্য বিষয়ক তথ্যের অভাব

নারীর প্রতি ক্রমবর্ধমান সহিংসতা এবং অন্যান্য ধরণের যৌন নিপীড়ন হলো অসম লিঙ্গ সম্পর্কের পরিণামে নারীর উপর পুরুষের কর্তৃত্ব এবং নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণেরই বহিঃপ্রকাশ ৷ অপ্রাপ্তবয়স্ক নারীরাই, বিশেষত: পরিবারের ভিতরে ও বাইরে যৌন নির্যাতনের শিকার হয় ৷ একটি সাম্প্রতিক সমীক্ষায় (নারীপক্ষ) লক্ষণীয় যে, প্রকাশিত ঘটনাগুলোর ৬৫% ক্ষেত্রেই কিশোরীরা উত্‍পীড়নের বলি বা শিকার ৷ যৌন-নিপীড়ন এবং গার্হস্থ্য-উত্‍পীড়ন সন্বন্ধীয় সমস্যাগুলো আরো বেড়ে যায় এই বিকৃত বা কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধারণা থেকে যে, নারীদের সুনাম যে কোন কিছুর বিনিময়ে অবশ্যই রক্ষা করতে হবে এবং পরিবার হচ্ছে পবিত্র এবং সকল অনুশাসনের উধের্ব ৷ সামাজিক কুসংস্কারের কারণে যৌন-নিপীড়নের ঘটনাগুলো কদাচিত্‍ প্রকাশিত হয় বা তদন্ত করা হয়

 

ঙ) এইচআইভি/এইডস এবং বয়ঃসন্ধিকাল

একটি সাম্প্রতিক ইউনিসেফ রিপোর্ট (২০০১) থেকে জানা যায় যে, এশিয় শিশু এবং কিশোরীদের বেশিরভাগই এইচআইভি/ এইডস সম্পর্কে অজ্ঞ এবং সেই কারণে তারা এই অঞ্চলে এই অসুখে আক্রান্ত হওয়ার ক্রমবর্ধমান আশংকা সম্পর্কে দুঃখজনকভাবে অপ্রস্তুত ৷ বাংলাদেশ-সহ এশিয়ার ১৭টি দেশে পরিচালিত এক সমীক্ষায় জানা যায়, ৯ থেকে ১৩ বছর বয়সের ৬০% এবং ১৪ থেকে ১৭ বছর বয়সের ২৫% শিশু-কিশোর-কিশোরী এইচআইভি /এইডস সম্পর্কে "কিছুই" জানে না ৷ প্রচলিত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ, ঐতিহ্য এবং রীতি-রেওয়াজ, যৌন আচরণ সম্পর্কে বয়ঃসন্ধিকালের এই কিশোর-কিশোরীদের ব্যক্তিগত পছন্দে জ্ঞান লাভের অধিকার অসম্বব করে তুলেছে ৷ জনস্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাগণও অপ্রাপ্ত বয়স্কদের যৌন ঝুঁকি এবং এইচআইভি/ এইডস মহামারী ও অন্যান্য যৌন রোগের পারষ্পরিক জটিল সম্পর্ক সম্বন্ধে সম্যক ধারণা রাখেন না
 

চ) অধিকারবিহীন কিশোরীরা

বেশিরভাগ কিশোরীরই পরিবারে বা সমাজে তাদের অধিকার সম্পর্কে কোন ধারণা নেই, যদিও প্রায় সকল এশিয় দেশই শিশু অধিকার এবং নারীর বিরুদ্ধে সকল ধরণের বৈষম্য অবসান বিষয়ক কনভেনশনে সম্মতি দিয়েছে ৷ যা রাষ্ট্রগুলোকে শিশু এবং অপ্রাপ্ত বয়স্কদের যে কোন ধরণের শোষণ ও যৌন নিপীড়ন থেকে রক্ষা করা এবং শিশুদের পিতামাতা বা আইনতঃ অভিভাবককে শিশুদের প্রতি যে কোন ধরণের শোষণমূলক আচরণ বন্ধে সহায়তা দিতে দায়বদ্ধ করেছে

 

তথ্য সংগ্রহের সমস্যাবলী

১১. অবশ্য পরিবারের মধ্যে বা গৃহে যৌন নির্যাতনের তথ্য সংগ্রহ খুবই কঠিন, কারণ এই বিষয়ে কোন সচেতনতা বা নির্যাতিতের অবস্থা সম্পর্কে অবহিতকরণের কোন সুযোগ নেই ৷ একটি জরিপ (থিরেসি ব্লানচে, হারিয়ে যাওয়া সরলতা, চুরি হয়ে যাওয়া ছেলেবেলা, ইউপিএল) অনুসারে, জিজ্ঞাসাবাদ করা ৭১ জন গৃহস্থালীর কাজে নিয়োজিত শিশুর মধ্যে ২৩.৫% বলে যে, (কর্মজীবী শিশুদের দৈনন্দিন জীবন, ইউনিসেফ বাংলাদেশ, ১৯৯৭) ২০০,০০ থেকে এক মিলিয়ন শিশু গৃহস্থালীর কাজে নিয়োজিত এবং বেশিরভাগই দুর্ব্যবহার, শারীরিক নির্যাতন এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে যৌন-নির্যাতনের শিকার ৷ অধিকন্তু বাংলাদেশে সম্প্রতি নারী ও শিশু পাচার একটি ক্রমবর্ধমান ও গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ৷ একটি পরিসংখ্যান থেকে জানা যায় প্রতিবছর প্রায় ৪,৫০০ জন নারী ও শিশু পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে পাচার হয়ে যাচ্ছে  (ইউনিসেফ কান্ট্রি রিপোর্ট, ২০০০)
 

কিশোরীদের ক্ষমতায়ন কৌশল

১২. কিশোরীদের ক্ষমতায়নের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয় হল বালিকা ও অল্পবয়স্ক নারীদের প্রতি সব ধরণের বৈষম্যের অবসান এবং তারা যাতে নিজেদের সুপ্ত-ক্ষমতা সম্পর্কে সচেতন হয় সেই ব্যাপারে সাহায্যের লক্ষ্যে পরিবার, সমাজ, চাকুরি দাতা, নীতি নির্ধারক পর্যায়ে যারা ভূমিকা রাখেন তাঁদের সকলের মানসিকতা এবং আচরণের ইতিবাচক পরিবর্তন সাধন
 

১৩. শিশু অধিকার ও যত্নের জন্য নিবেদিতদের এই সত্য এড়িয়ে যাওয়া চলবে না যে, লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য ও নারীদের অধস্তন অবস্থাই কিশোরীদের অধিকারবঞ্চিত হবার মূল কারণ
 

১৪. মেয়েশিশুর বিরুদ্ধে সকল প্রকার বৈষম্য ও অবহেলা অবসানের লক্ষ্যে অঙ্গীকারাবদ্ধ হওয়ার এবং এ জন্য সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও দায়বদ্ধতার দ্বিধাহীন প্রকাশের প্রয়োজন
 

সন্ধিপত্রের বাধ্যবাধকতাসমূহের বাস্তবায়ন

১৫. সি.আর.সি এবং সিডা কনভেনশনের অন্যতম স্বাক্ষরদাতা হিসেবে রাষ্ট্রপক্ষ অবশ্যই তাদের বাধ্যবাধকতাসমূহের বাস্তবায়ন ঘটাবে যাতে দুটো কনভেনশনই বালিকা এবং অল্পবয়স্ক নারীদের অধিকারের যে নীতিমালা ঘোষিত হয়েছিলো তার প্রতি সম্মান দেখানো ও তা নিশ্চিত করা যায় ৷ সিডার আর্টিকেল-১২ সুনির্দিষ্টভাবে কামনা করে যে, রাষ্ট্রপক্ষ কিশোরীদের অসম এবং বিশেষ দুর্বল অবস্থান উপলব্ধি করবে ৷ সিআরসি-র ২৪ নং আর্টিকেল-এ রোগ প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা এবং পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ক শিক্ষা লাভে শিশুদের সত্যিকার অংশগ্রহণের অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে ৷ আর্টিকেল ৩৪ অনুসারে শিশুদের সকল ধরণের অবৈধ যৌন শোষণ এবং যৌন অনাচার থেকে রক্ষা করা এবং কোন যৌন কার্যকলাপে শিশুদের অবৈধভাবে অংশগ্রহণের জন্য প্ররোচিত করা অথবা বাধ্য করার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দায়িত্বও সরকারপক্ষকেই নিতে হবে ৷ রাষ্ট্রের সকল কুশীলবকে অবশ্যই উপলব্ধি করতে হবে যে, শুধুমাত্র আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাপত্রগুলোর অনুমোদনই যথেষ্ট নয়, বরং আন্তর্জাতিক দলিলগুলোর যথাযথ বাস্তবায়নের উপায়গুলোর প্রতিই গুরুত্ব দিতে হবে

 

১৬. বাংলাদেশ সরকারের উচিত সিডা ও সিআরসি-র প্রাসঙ্গিক ব্যবস্থাসমূহের প্রচারের ব্যবস্থা করা এবং এইসব শর্তগুলো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ও উপযুক্ত পদ্ধতি গ্রহণ করা

 

যথোপযুক্ত আইন প্রণয়ন

১৭. শিশুদের প্রতি যৌন নির্যাতন নিষিদ্ধ করে এবং অন্যান্য সামাজিক প্রথা, যা শিশু ও নারী স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর তা বাতিল করে যথোপযুক্ত আইনের খসড়া তৈরী করতে হবে ৷ বাল্যবিবাহ নিষিদ্ধ করার জন্য প্রচলিত বর্তমান আইনকানুনগুলো কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে ৷ 'মেয়েদের বিবাহের বয়স কমপক্ষে ১৮ বছর হওয়া উচিত' - ডব্লিওএইচও-র এই সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য আইনী ব্যবস্থাসমূহের জোরদার প্রয়োগের প্রয়োজনীয় কৌশলগুলো গ্রহণ করতে হবে
 

জাতীয় শিশু-নীতির বাস্তবায়ন

১৮. সরকার ১৯৯৪ সালে জাতীয় শিশু নীতিমালা গ্রহণ করেছে ৷ এর ফলে শিশুদের নিরাপত্তা, মঙ্গল এবং অগ্রগতি জাতীয় কর্মসূচিতে পরিণত হয়েছে ৷ এই নীতি কিশোরীদের প্রতি বিশেষ সহযোগিতা দেয়ার এবং জাতীয়, সামাজিক ও পারিবারিক প্রোপটে শিশুদের আইনগত অধিকার নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে

 

বিভিন্ন কার্যক্রম ও নীতি নির্ধারণে লিঙ্গ প্রেক্ষিতের প্রয়োগ

১৯. ছেলে ও মেয়েশিশুর তাদের জীবন-চক্রে ভিন্নধর্মী বাস্তব অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়ার কারণ বুঝতে হলে এবং এর গ্রহণযোগ্য সমাধান পেতে হলে শোষণের মূল কারণগুলোর মধ্যে লিঙ্গ-বৈষম্য যে খুব গুরুত্বপূর্ণ, তা জানতে হবে

 

২০. চিকিত্‍সক এবং চিকিত্‍সক সহযোগিদেরকে হাতে- কলমে, শিক্ষা-কার্যক্রমে, বিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে স্বাস্থ্য ও যৌন-শিক্ষা এবং কিশোরীদের লিঙ্গ-বৈষম্যের কু-প্রভাব সম্পর্কিত বিষয় অবশ্যই অন্তর্ভূক্ত করতে হবে
 

২১. যেহেতু পরিবার নামক প্রতিষ্ঠানটি হচ্ছে লিঙ্গ-সম্পর্কিত ধারণাগুলি সৃষ্টি হওয়ার ভিত্তিভূমি, তাই মাতা-পিতা এবং সমাজের সকলকে মেয়ে শিশুর যথাযথ মূল্যায়নের জন্য শিক্ষিত করে তুলতে হবে এবং এই উদ্দেশ্যে প্রণোদিত হয়ে প্রচারণার জন্য বিস্তৃত কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে
 

২২. সরকারের উচিত সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন ধরণের প্রচার মাধ্যমগুলোকে মেয়েদের প্রতি নেতিবাচক ধ্যান-ধারণার পরিবর্তন ঘটানোর লক্ষ্যে সংগঠিত করা এবং সাধারণভাবে সকল নারীর ও বিশেষভাবে কিশোরীদের ইতিবাচক ভাবমূর্তি উপস্থাপন করা

 

নারীর ক্ষমতায়ন

২৩. পরিবারে ও সমাজে নারীর অবস্থান উন্নীত করার প্রয়োজনীয়তার কথা ভেবে সরকারের এমন কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত যেন জমির মালিকানা, ঋণপ্রাপ্তি, চাকুরি, ট্রেনিং এবং অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধাসহ অর্থনৈতিক উপায় সমূহে নারীর অংশগ্রহণের সুযোগ এবং নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত করা সম্ভবপর হয়
 

বালিকা ও নারীদের স্বাস্থ্য-সেবামূলক প্রতিষ্ঠানসমূহে সেবা লাভের অগ্রাধিকারের ব্যবস্থা

২৪. কিশোরীদের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা সৃষ্টির ল্যে এবং তাদের নিজস্ব প্রাথমিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত চাহিদার বিশেষ গুরুত্ব দানের প্রয়োজনে তারা যেন বিনামূল্যে স্বাস্থ্য সেবা পেতে পারেন, সরকারী ও বেসরকারী সংগঠনসমূহের উচিত সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা
 

িক্ষালাভে মেয়েদের সমানাধিকার নিশ্চিতকরণ

২৫. নারী-শিক্ষাক্ষেত্রে বিরাট পদক্ষেপ গ্রহণ করা সত্ত্বেও প্রাথমিক স্তরে মেয়েদের বিদ্যালয়ে ভর্তির হার ৯৪% এবং এর বিপরীতে ছেলেদের ভর্তির হার ৯৭% (১৯৯৭, মোট ভর্তির অনুপাত) শিক্ষা ক্ষেত্রে মেয়েদেরও ছেলেদের সমান ও সর্বজনীন অংশগ্রহণের সুযোগ লাভ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নারী শিক্ষা দশম শ্রেণী পর্যন্ত বাধ্যতামূলক ও অবৈতনিক করা উচিত ৷ শিক্ষা বিষয়ক সকল কর্মসূচিতে সিডা ও সি.আর.সি বিষয়ক শিক্ষা অন্তর্ভূক্ত করা দরকার
 

২৬. মেয়েদের অল্প বয়সে বিবাহ নিরুত্‍সাহিত করার লক্ষ্যে তাদের বৃত্তিমূলক শিক্ষ, পূনরায় ট্রেনিং দেওয়া, হাতে কলমে শিক্ষ ইত্যাদি কার্যক্রম স্বল্প মূল্যে বা বিনামূল্যে দেওয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা সরকারকে করতে হবে, যাতে করে তারা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতাশীল হন
 

২৭. বিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে যৌন ও পারিবারিক শিক্ষা অন্তভূর্ক্ত হওয়া উচিত- যেন এর ফলে কিশোর-কিশোরীরা অল্প বয়সে বিয়ের অপকারিতা সম্বন্ধে সচেতন হয় এবং যৌন-ক্রিয়ার মাধ্যমে সংক্রমিত রোগগুলোর বিরুদ্ধে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে
 

গণসচেতনতা বৃদ্ধি

২৮. নারীর মাতৃত্বের অধিকার এবং সন্তান-সংখ্যা বা সন্তানদের মধ্যকার বয়সের ব্যবধান স্থির করার অধিকারকে স্বীকৃতি দান, উত্‍সাহ প্রদান এবং গণসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে তা প্রচারের ব্যবস্থা করা অবশ্যই সরকারের দায়িত্ব
 

২৯. বালিকাদের প্রতি বৈষম্য দূরীকরণের জন্য জনসাধারণকে অবশ্যই সচেতন করে তুলতে হবে ৷ মেয়ে শিশুদের ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে তোলার জন্য গ্রামীণ জনসাধারণের আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগের সীমাবদ্ধতার কথা মনে রেখে (৩০% পরিবারের টেলিভিশন এবং ৫০% পরিবারে রেডিও ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে) তথ্য বিনিময়ের সনাতন পদ্ধতিগুলোর উপর বেশি গুরুত্ব দিতে হবে
 

কুমারীদের অধিকার নিশ্চিতকরণ

৩০. সরকারের উচিত শিশুদের, বিশেষভাবে বালিকাদের সাথে বিকৃত যৌন-আচরণ ও নারী উত্‍পীড়নের বিরুদ্ধে খোলামেলা ভাবে নিন্দা জানানো এবং এইসব কাজ দমন করার উদ্দেশ্যে কার্যকর আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা ৷ এসব অপকর্ম নিরুত্‍সাহিত করার পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে বিশেষ আদালত গঠন করে এই ধরনের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন
 

৩১. উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে বিদ্যমান বর্তমান আইনগত বৈষম্য, মেয়েদের মতা থেকে বঞ্চিতকরণ এবং শিশুকালের প্রাথমিক অবস্থা থেকে পূর্ণবয়স্কা নারীতে রূপান্তরের পথে ধারাবাহিকভাবে বৈষম্যের শিকার হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ ৷ বেইজিং ঘোষণা এবং 'প্লাটফরম ফর এ্যাকশন' এর আলোকে সরকারের উচিত উত্তরাধিকার আইন সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা
 

৩২. যদিও বাংলাদেশে শিশুশ্রম অবৈধ, এক সমীক্ষায় দেখা যায়, ৭ থেকে ১৬ বছর বয়সের ৫ লক্ষ শিশু কম পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কলকারখানায় ও অন্যান্য সাধারণ কাজে শ্রমিক হিসেবে নিয়োজিত ৷ উন্নয়নশীল দেশে শিশুশ্রম একটি জটিল সমস্যা এবং এর সহজ সমাধান হয়তো সম্ভব নয় ৷ তবে এই সমস্যাটি অনিয়ন্ত্রিত রাখা বা এর তদারক না করলে চলবে না ৷ ক্রমান্বয়ে বিদ্যমান আইনগুলোর বাস্তবায়ন এবং সামাজিক শিক্ষাই এই পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাতে সক্ষ
 

৩৩. বাংলাদেশ সরকারের 'জাতীয় শিশু নীতি' অনুযায়ি যখনই বিদ্যমান আইনগুলোর প্রয়োগ বা সংশোধন করা হবে, তখন শিশুদের স্বার্থ সম্বন্ধীয় বিষয়গুলোকে অবশ্যই অগ্রাধিকার দিতে হবে

 

৩৪. মেয়েদের বিরুদ্ধে, বিশেষভাবে অল্পবয়স্ক মেয়েদের বিরুদ্ধে বৈষম্য রহিত করা সত্যিই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ ৷ এই সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য একটি সক্রিয় এবং বাস্তব নীতিমালা গ্রহণ করা প্রয়োজন, যার বহুমুখী প্রয়োগের সুযোগ রয়েছে

Previous Article<Index>Next Article


Home  / Feedback

© 2005 The Hunger Project-Bangladesh. All rights reserved.