কন্যাশিশু হবার বিড়ম্বনা

কন্যাশিশু দিবস সংখ্যা

উজ্জীবক বার্তা, বর্ষ-৩, সংখ্যা-১৭, সেপ্টেম্বর-২০০৪

অধ্যাপক (ডা.) হাসিনা বানু প্রফেসর,

কার্ডিওলজি, কার্ডিহোপ সেন্টার
 

লিঙ্গ পরিচয়' একটি শিশুর সামজিক অবস্থান নির্ণয়ে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ৷ আজকাল আলট্রা সাউন্ডের কল্যাণে ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগেই অনেকে সন্তানের লিঙ্গ পরিচয় জেনে যায় ৷ কোন পরিবারে যদি প্রথম সন্তানটি মেয়ে হয়, তবে বাবা-মা হতে শুরু করে কেউই খুশিতে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠতে পারে না, যদিও পরক্ষণে সবাই এটাকে আল্লাহর দান বা ইচ্ছা বলে মেনে নিতে বাধ্য হয় ৷ এরকম একটি ঘটনা আমার জীবনে ঘটেছিলো ৷ আমি যখন প্রথম মা হলাম, তখন বাচ্চাটি যে ডাক্তার প্রসব করালেন, তিনি শিশুটির জন্মের পর পরই চেঁচিয়ে উঠলেন... 'হাসিনা তোমার মেয়েটির নাক তোমার মতোই বোঁচা হয়েছে'! আমার নাক নিয়ে আমার আক্ষেপের শেষ ছিলোনা ৷ তাই যখন শুনলাম আমার মেয়ে হয়েছে এবং তার নাকটি বোঁচা, তখন মন খুব খারাপ হয়ে গেলো ৷ আমি দেখতে চাইলাম বাচ্চাটিকে ৷ দেখলাম সুন্দর ফুটফুটে গোলাপী রং এর, মাথা ভরা কালো চুলের একটি বাচ্চা ৷ অদ্ভুত সুন্দর লাগলো আমার কাছে.......... মনটা আনন্দে ভরে গেলো! আমার শাশুড়ির তিনটি সন্তান, তিনজনই ছেলে ৷ তাই তিনি চাচ্ছিলেন যেনো তার বড় নাতীনটি কন্যাশিশু হয় ৷ তার সঙ্গে দেখা হওয়ার পর বললাম 'আপনি মেয়ে চেয়েছিলেন, তাই আল্লাহ মেয়ে দিয়েছেন'৷ জবাবে তিনি বললেন 'মেয়ে তো চেয়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু যেমনটি ভেবেছিলাম, শোনার পর ঠিক তেমনটি খুশি হলাম না কেন কে জানে'? মেয়েদের জীবনে বিড়ম্বনা তাই জন্ম থেকেই শুরু হয়, 'ছেলে শিশু' না 'কন্যাশিশু' এ শব্দের পার্থক্য দিয়েই

এরপরে জীবনজুড়ে মেয়েদের কন্যা, জয়া ও জননী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যেতে হয়
৷ কিন্তু তারা হল পরগাছার মত ৷ নিজস্ব কোন অস্তিত্ব নেই ৷ কন্যা হিসেবে সবসময় মা-বাবা আশা করেন তাদের মেয়েটি শান্তশিষ্ট, নম্র-ভদ্র মানুষ হবে৷ কথা বলবে নীচু স্বরে ৷ আমাদের সমাজে মুখরা মেয়েকে কেউ পছন্দ করে না
 
তারপর তাদের বিয়ে হয় ৷ যেতে হয় শশুড়বাড়ি ৷ মনে অনেক আশা থাকে, থাকে রঙ্গিন স্বপ্ন ৷ কপাল যদি ভালো হয় তবে স্বামীসহ শ্বশুড়বাড়ির সবার সঙ্গে গড়ে উঠে একটি মধুর আত্মার সম্পর্ক ৷ কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই, বিশেষ করে নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্তদের জীবনে এ ধরণের সম্পর্ক আশা করা খুবই দুরূহ ব্যপার ৷ কারণ এক্ষেত্রে যৌতুক নামক যাতাকলটি চেপে বসে মাথার উপর ৷ অহরহ আমরা দেখতে পাই যৌতুকের জন্য নববধূর মৃত্যু অথবা তালাক ৷ আমাদের দেশে আইন থাকলেও আইনের প্রয়োগ না থাকায় নিম্নবিত্তদের মধ্যে তালাকের হার অনেক বেশী৷ শ্তধু তাই না, এই নিম্নবিত্ত আয়ের মানুষদের মধ্যে প্রায়ই দেখা যায় বিয়ে করে একজন পুরুষ বউকে ফেলে রেখে চলে যায়, আবার বিয়ে করে ৷ মাঝে মাঝে হয়তো আগের বউয়ের কাছ ফিরে আসে রাত্রি যাপনের জন্য ৷ এ ক্ষেত্রে খরপোষ এর কোন বালাই নাই ৷ উচ্চবিত্তদের সামজিক দিকটা কিছুটা পশ্চিমা রীতির অনুকরণের দিকে ঝুঁকে পড়েছে ৷ কন্যাশিশুরা হয়ে পড়েছে অসহায় ৷ কিছুদিন আগে আমাদের দেশে একজন স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব ২৮ বছর ঘর করার পর তার স্ত্রীকে তালাক দিলেন এবং দৈনিক খবরের কাগজগুলোতে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানালেন- তার স্ত্রীটি এতই খারাপ ছিলো যে তার সঙ্গে ঘর করা আর সম্ভব নয় ৷ বিবাহিত জীবনে বিচ্ছেদ ঘটাটা অসম্ভব নয় ৷ তবে নিজে সাধু সাজার জন্য, শুধু মহিলাটিকে দোষ দিয়ে সমাজে তাকে একটি লজ্জাজনক পরিস্থিতিতে পৌঁছে দিতে তার এতটুকু বিবেকে বাঁধলো না ৷ এটি একটি সাম্প্রতিক উদাহরণ মাত্র! এরকম প্রচুর দেখি আমরা
 
এরপর কন্যাশিশুটি যখন জননী হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠে, তখন তিনি প্রায় মধ্য বয়স পার হয়ে পৌঢ়ত্বে পৌঁছান ৷ আমাদের দেশের খুব কম মহিলা আছেন যারা এই বয়সে রোজগার করতে সমর্থ ৷ সারা জীবন স্বামী-সন্তানদের দেখাশুনা করতে গিয়ে হয়ত ভুলেই গেছেন- নিজেরও যত্ন নেয়া দরকার ছিলো ৷ অযত্নে, অবহেলায় শরীরটি ভেঙ্গে পড়েছে ৷ যত না বয়স হয়েছে, তার চেয়েও অনেক বেশী বয়স্ক লাগে ৷ নানা রোগ বাসা বাঁধে শরীরে ৷ কিন্তু রোগ হলে কি হবে, স্বামী অথবা সন্তানকে ভয়ে বলতে পারেন না ৷ যদি তারা কিছু মনে করেন! যদি স্বামী বিরক্ত হন যে কেন তার স্ত্রীটি সবসময় অসুস্থ থাকে!
ডাক্তার হিসেবে কাজ করতে গিয়ে সমাজের নানা স্তরের মহিলাদের সংগে আমার পরিচয় ঘটে এবং তাদের কাছ থেকে গল্পের মাধ্যমে অনেক কথাই জানতে পাই
৷ দুঃখ হয়- মহিলারা যতই শিক্ষিত হোক না কেন, তারা নির্যাতিত হয় বিচিত্র সব উপায়ে ৷ নিয়মটাই যেন এমন- নারীদেরকে হতে হবে সবার জন্য, কিন্তু তার জন্য হবে না কেউ ৷ সবার জন্য তাদের দায়িত্ববোধ থাকতে হবে ৷ কিন্তু তার দায়িত্ব নিতে পরিবার বা সমাজের কেউই আগ্রহী নয় ৷ আমি এমন কিছু মহিলাদের জানি, যারা উচ্চশিক্ষিত হয়েও বৃদ্ধ বয়সে অসহায়ত্বে ভোগেন ৷ অনেকেরই সন্তান ধনী অথবা স্বচ্ছল, কিন্তু এই মহিলাটি বাস করেন একা, নিভৃতে ৷ এর উল্টো দিকও কোথাও কোথাও আছে ৷ অনেক সন্তানকেই দেখি মা-বাবার জন্য কি অপরিসীম স্নেহ, মমতা, ভালোবাসা! দেখে ভালো লাগে ৷ এ সন্তানেরা বাবা-মাকে ভুলে নাই ৷ মনে পড়ে যায় - যে সন্তান তার বাবা মাকে ভালোবাসে, স্বয়ং আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন
 
মহিলাদের বিড়ম্বনার কথা বলতে গেলে শেষ করা যাবে না ৷ আমরা যদি এই বিড়ম্বনা কমানোর উপায় নিয়ে ভাবি, তবে তাদের শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হবে ৷ তাদের আর্থিক দিক দিয়ে স্বনির্ভর করে গড়ে তুলতে হবে ৷ তাদেরকে বোঝাতে হবে- অন্যের যত্ন নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজের যত্ন নেয়াও প্রয়োজন ৷ বর্তমান সরকার কন্যাশিশুদের জন্য অনেক কিছু করেছেন ৷ দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া অবৈতনিক করে দিয়েছেন ৷ এমনকি বই কেনা বাবদ তাদেরকে বৃত্তি দেয়ার ব্যবস্থা করেছেন ৷ এর ফলে গ্রামের মেয়েরাও শিক্ষা ক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে পারছে ৷ এ ব্যাপারে তাদের দিকে আরো সহযোগিতার হাত বাড়াতে হবে ৷ কারিগরি শিক্ষালয় থেকে শুরু করে সকল ধরণের শিক্ষালয়ে মেয়েদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে ৷ কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েদের আসন সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে ৷ যারা বিত্তবান অথবা অর্থনৈতিক দিক দিয়ে সমর্থ, তাদেরকে বিশেষভাবে মেয়েদের জন্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক সাহায্যের হাত প্রসারিত করতে হবে ৷ ছেলে সন্তান ও কন্যাসন্তানের মধ্যে পারিবারিক সম্পত্তির সুষ্ঠু বন্টন নিশ্চিত করতে হবে ৷ এর ফলে কন্যাসন্তানেরা সবসময় যে অনিশ্চয়তার পরিস্থিতির মধ্যে থাকে, তার অবসান ঘটবে ৷ সর্বোপরি, নির্যাতন-নিপীড়নকে কঠোর হাতে দমন করতে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে ৷ এসিড নিক্ষেপেকারী, ধর্ষণকারী ও বহুবিবাহকারী পুরুষদের উপযুক্ত বিচার করে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে ৷ কন্যাশিশু তথা নারীদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই আমরা একটি সমতার সমাজের দিকে এগিয়ে যেতে পারি

Previous Article<Index>Next Article


Home  / Feedback

© 2005 The Hunger Project-Bangladesh. All rights reserved.