কন্যাশিশু দিবস উদযাপনের চার বছর : যৌক্তিকতা প্রেক্ষাপট ও অর্জন

কন্যাশিশু দিবস সংখ্যা

উজ্জীবক বার্তা, বর্ষ-৩, সংখ্যা-১৭, সেপ্টেম্বর-২০০৪

নাছিমা আক্তার জলি
প্রোগ্রাম ম্যানেজার, দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-বাংলাদেশ
 

কন্যাশিশু দিবসের যৌক্তিকতা
বাংলাদেশের মোট জনগোষ্ঠীর অর্ধেকই নারী ৷ এই নারীরাই জনগোষ্ঠীর সর্বাধিক দরিদ্র অংশ ৷ এই বিরাট সংখ্যক নারীকে বঞ্চিত, অবহেলিত ও অবদমিত করে জাতীয় অগ্রগতি সম্ভবব নয় ৷ আগের চেয়ে পরিস্থিতির খানিকটা অগ্রগতি হলেও বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকান্ডে নারীর অংশগ্রহণের মাত্রা এখনও প্রান্তিক পর্যায়েই রয়েছে ৷ অভিজ্ঞতার বিশ্লেষণ থেকে আমরা দেখেছি, আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ সৃষ্টিতে নারীরাই হতে পারে মূল চাবিকাঠি ৷ নারীর গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছাড়া বাংলাদেশীদের জন্য আত্মমর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যত সৃষ্টি সম্ভব নয় ৷ এই গুরুত্বপূর্ন উপলব্ধি থেকেই মূলত: কন্যাশিশুর প্রতি অধিক মনোযোগী হওয়া একটি কৌশলগত পদক্ষেপ বলে আমরা মনে করি
 
জন্মের পূর্ব থেকেই বঞ্চনা, বৈষম্য ও নির্যাতনের শিকার হয় যে কন্যাশিশুরা, তার প্রভাব পড়ে তাদের পরবর্তী সমগ্র জীবনে ৷ বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে, পারিবারিক খাদ্যবন্টন, চিকিত্‍সা-শিক্ষার সুযোগ এবং সুস্বাস্থ্য বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় যত্নের ক্ষেত্রে ছেলেশিশুর তুলনায় কন্যাশিশুর প্রাধান্য অনেক কম ৷ ফলে কন্যাশিশুরা, বিশেষত তৃণমূল পর্যায়ে অধিকাংশ কন্যাশিশুই পুষ্টিহীনতায় ভোগে ৷ পরবর্তীতে এসকল কন্যাশিশুর শতকরা ৫০ভাগ বাল্য বিবাহের শিকার হয় ৷ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিয়ের পরপরই তারা গর্ভধারণ করে ৷ গর্ভকালীণ সময়েও তারা যথাযথ খাবার খায় না বা পায় না ৷ ফলে পুষ্টিহীন মা স্বল্প ওজনের শিশুর জন্ম দেয় এবং এভাবেই পুষ্টিহীনতার দুষ্ট চক্র তৈরী হতে থাকে
 
জন্মের পর পরই এসব স্বল্প ওজনের শিশু বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয় এবং এদের একটি বড় অংশ অকালে মৃত্যুবরণ করে ৷ যে সকল শিশু বেঁচে থাকে, পুষ্টিহীনতার কারণে তাদের অধিকাংশেরই পূর্ণ শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ঘটে না ৷ তারা শারীরিকভাবে দুর্বল ও বুদ্ধিমত্তার দিক থেকে পিছিয়ে পড়ে ৷ ফলে জাতি হিসেবে আমরা প্রতিনিয়ত কাঙ্খি উত্‍পাদনশীলতা থেকে বঞ্চিত হই ৷ ১৯৯৮ সালে ইউনিসেফের একটি হিসেব থেকে দেখা গেছে, পুষ্টিহীনতার হার কমানো না গেলে পরবর্তী দশ বছরে বাংলাদেশ ২,৩০০ কোটি ডলার মূল্যের উত্‍পাদনশীলতা থেকে বঞ্চিত হবে ৷ আমরা যদি অপুষ্টির এই ভয়াবহ দূষ্টচক্রকে ভাঙ্গতে চাই তবে শিশুকাল থেকেই নারীর স্বাস্থ্য পরিচর্যা ও পুষ্টির যোগান নিশ্চিত করতে হবে ৷ কারণ 'আজকের কন্যাশিশুই আগামী দিনের নারী' ৷ তাই কন্যাশিশুর প্রতি সমাজের ইতিবাচক মনোভাব তৈরী করাই আমাদের প্রাথমিক লক্ষ্য ৷ এর মাধ্যমে আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ সৃষ্টির ক্ষেত্রে নারীদের অবদানের গুরুত্ব জনগণের কাছে আরও সুস্পষ্ট হবে এবং উন্নয়নের কাঙ্খিতক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে
 
বাংলাদেশে কন্যাশিশু দিবস প্রবর্তনের প্রেক্ষাপট
বিশ্বের অনেক দেশের মতোই বাংলাদেশের সমাজও প্রধানত পুরুষ নিয়ন্ত্রিত ৷ পুরুষতান্ত্রিক সমাজে কন্যাশিশুর জন্ম অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অনাকাঙ্খিত ৷ বিশেষ করে গ্রামীণ সমাজ ব্যবস্থায় কন্যাশিশুর জন্মকে বাড়তি বোঝা হিসেবে বিরক্তির সাথে গ্রহণ করা হয় ৷ এর পেছনে যে সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গিটি কাজ করে তা হলো: কন্যাশিশুরা পরিবারের অর্থ উপার্জনকারী নয়, তাই তার শিক্ষা বা কর্মদক্ষতা বাড়ানো অপ্রয়োজনীয় ৷ এ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে অধিকাংশ সময়েই তাদের শিক্ষাকে ব্যাহত করে অল্প বয়সেই বিয়ে দেয়া হয় বা গৃহস্থালীর কাজে লাগিয়ে দেয়া হয় ৷ ফলে শিক্ষিত, সচেতন, কর্মদক্ষ একজন পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে বেড়ে ওঠার সুযোগ থেকে তারা অনেকাংশেই বঞ্চিত হয়
 
বৈষম্যমূলক সমাজে এবং পরিবারে জন্ম নেয়া কন্যাশিশুদের উপর পরিবার থেকেই শুরু হয় শারীরিক, মানসিক ও যৌন নিযার্তন ৷ ধর্ষণ, এসিড নিক্ষেপ, পাচার, যৌতুকের দায়ে নির্যাতন, হত্যা ইত্যাদি প্রতিনিয়ত ঘটেই চলেছে
 
গত সাড়ে ৩ বছরের একটি পরিসংখ্যান দেয়া হলো: ( ১৮ বছর বয়স পযর্ন্ত)
 

বছর

ধর্ষেণর শিকার

নিযার্তন

যৌন হয়রানির শিকার

এসিড নিক্ষেপ

যৌতুকের দায়ে নিযার্তন ও হত্যা

পাচার ও নিখোঁজ

হত্যা

অন্যান্য

মোট

২০০১

৪০২

১১০

২৩৫

১৯৭

৪২

৮৩২

৫১৫

১৪৪৩

৩৭৭৬

২০০২

৭৬৯

১০৭

৬৯

১৫১

৪৫

১৭৬৮

৫৮৪

৪৫৩৬

৭৪৪৫

২০০৩

৬৩৫

১১৮

৩৮

১০৩

৬১

১৪৮৫

৫৩১

৪২৯৭

৭২৬৮

২০০৪ (জুন পযর্ন্ত)

১২২

১২

০৫

৩২

-

১৯২

১১৩

২০০৪

২৪৮০

মোট

১৯২৮

৩৪৭

৩৪৭

৪৮৩

১৪৮

৪২৭৭

১৭৪৩

১১৬৯৬

২০৯৬৯

সুত্র: বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম

উল্লেখিত পরিসংখ্যান নি:সন্দেহে প্রমাণ করে যে, আমরা ভয়াবহ এক বাস্তবতার মধ্যে আছি
 
এছাড়া, আরও একটি বিষয় এ মূহুর্তে খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো এইডস এবং এর বিস্তার, যার সাথে পাচারের রয়েছে গভীর সম্পর্ক ৷ 'বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবি সমিতি'র এক গবেষণা অনুযায়ী, প্রতি বছর বাংলাদেশ হতে পাচার হয়ে থাকে ৯ হাজারেরও বেশী কন্যাশিশু ৷ পাচার হয়ে যাওয়া এইসব কন্যাশিশুর বেশীরভাগই যৌন-পেশায় নিয়োজিত হতে বাধ্য হয় এবং পরবর্তীতে অধিকাংশই এইচআইভি দ্বারা আক্রান্ত হয়ে নির্মম পরিণতি বরণ করে ৷ এ সকল পরিস্থিতি পরিবর্তনে ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস অত্যন্ত জরুরী
 
এই চেতনাবোধকে সামনে নিয়েই শুরু হয়েছিলো 'কন্যাশিশু দিবস' উদযাপন ৷ এর একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত রয়েছে, যা বোঝার জন্য আমরা নিম্নোক্ত ধারাবাহিক ঘটনাবলীর প্রতি দৃষ্টিপাত করতে পারি-
 
কন্যাশিশুদের প্রতি বৈষম্য দূরীকরণ এবং তাদের প্রতি যত্নবান হওয়ার গুরুত্ব দীর্ঘদিন ধরে উপলব্ধিতে এলেও মূলতঃ আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৮৬ সালে ভারতে অনুষ্ঠিত সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে প্রথম "কন্যাশিশু বর্ষ" পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়
১৯৮৭ সালে কাঠমুন্ডুতে অনুষ্ঠিত সার্কের 'নারী উন্নয়ন বৈঠকে'ও শিশুদের উপর গুরুত্ব আরোপ করে একটি বর্ষ পালনের জোরালো দাবী উত্থাপন করা হয়
১৯৮৮ সালে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে ১৯৯০ সালকে "সার্ক কন্যাশিশু বর্ষ" হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়
৯৯০- সালের নভেম্বরে মালদ্বীপে অনুষ্ঠিত সার্কের পঞ্চম শীর্ষ সম্মেলনে "১৯৯০ থেকে ১৯৯৯" পর্যন্ত দশকটিকে "সার্ক কন্যাশিশু দশক" হিসেবে উদযাপনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয় ৷ এ প্রেক্ষিতে বাংলাদেশও যথাযথভাবে 'কন্যাশিশু বর্ষ' এবং 'কন্যাশিশু দশক' পালনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়
১৯৯৫ সালে চতুর্থ বিশ্ব নারী সম্মেলনে নারী উন্নয়নের জন্য যে বারোটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র বিবেচনা করা হয়েছে তার মধ্যে কন্যাশিশু অন্যতম ৷ কন্যাশিশুর প্রতি বৈষম্য দূর করে সমতা প্রতিষ্ঠার জন্য চতুর্থ বিশ্ব নারী সম্মেলনে কৌশলগত নয়টি লক্ষ্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হয় ৷ প্রায় ১৯০টির বেশি দেশের সরকারি ও বেসরকারি প্রতিনিধিগণ এই সকল লক্ষ্য ও সিদ্ধান্তের সাথে একমত হয়ে গ্রহণ করেন "বেইজিং ঘোষণা" ও "কর্মপরিকল্পনা"৷ বাংলাদেশও এ ঘোষণায় স্বাক্ষর করে ৷ কতগুলো নির্দিষ্ট বিষয়ে বেইজিং ঘোষণায় স্পষ্ট সংকল্প জানানো হয় ৷ এ অঙ্গীকারনামায় বলা হয়, "২০০০ সালের মধ্যে নারী ও কন্যাশিশুর মানবাধিকার নিশ্চিত করা হবে৷ দূর করা হবে তাদের উপর চাপিয়ে দেয়া সকল বৈষম্য ৷ বিলোপ করা হবে তাদের বিকাশের সকল বাধা ৷ নারীর উপর থেকে সরানো হবে দারিদ্র্যের বোঝা ৷ তাদের জন্য খুলে দেয়া হবে অর্থনৈতিক মুক্তির পথ ৷ বিশেষ করে গ্রামের নারী ও কন্যাশিশুদের জন্য অর্থনৈতিক সুবিধাগুলো বাড়িয়ে দেয়া হবে ৷ নারী ও কন্যাশিশুদের যথাযথ স্বাস্থ্য ও শিক্ষা সুবিধা নিশ্চিত করা হবে"৷ কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো যে, এই ঘোষণায় স্বাক্ষর করার পরেও বাংলাদেশে কন্যাশিশুদের উন্নয়নের লক্ষ্যে কিছু বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা ছাড়া তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য কর্মসূচী প্রণয়ন বা পালন করা হয়নি
এই বাস্তবতায় দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-বাংলাদেশ কন্যাশিশুর অধিকার রক্ষা ও তাদের বিকাশের বিষয়টিকে বৃহত্তর সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেয়ার লক্ষ্যে ৪ জুন, ২০০০ কন্যাশিশু দিবস পালনের প্রস্তাব করে ৷ প্রায় ৫৪টি বেসরকারী সংস্থা, সামাজিক সংগঠন এবং কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি, যারা কন্যাশিশুর আধিকার রক্ষায় কাজ করেছিলেন তারাও এ প্রস্তাবকে সমর্থন করেন ৷ এরই ফলশ্রুতিতে কন্যাশিশু দিবস উদযাপন কমিটি নামে একটি কমিটি গঠিত হয়
কন্যাশিশুর প্রতি মনোযোগী হবার গুরুত্ব তুলে ধরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবরে ৯ অগাষ্ট, ২০০০ এবং মাননীয় সচিব, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় বরাবরে ১০ অগাষ্ট, ২০০০-এ কন্যাশিশু দিবস পালন করার জন্য সুস্পষ্ট প্রস্তাব করা হয়
২৮ আগষ্ট, ২০০০-এ এডাবের সহযোগিতায় প্রায় ২৫টি বেসরকারি সংগঠনের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে জাতীয় কন্যাশিশু দিবস পালনের নীতিগত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়
২৯ আগষ্ট, ২০০০ 'বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামে'র সাথে যৌথভাবে ইউনিয়ন, থানা ও জেলা পর্যায়ে 'কন্যাশিশু দিবস' উদযাপনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়
অবশেষে, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০০০ মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় কতৃর্ক মশিবিম/শা-৪/শিশু অধিকার-১২/৯৯(খন্ড-১ম)-৫৬৯ এর মাধ্যমে কন্যাশিশু দিবস পালনের আদেশ জারী হয়
গত চার বছর ধরে এ দিবসটি যথাযথ মর্যাদার সাথে দেশব্যাপী পালিত হয়ে আসছে ৷ কন্যাশিশু দিবস উদযাপন কমিটি এ উপলক্ষ্যে বছরব্যাপী কর্মসূচী হাতে নিয়ে থাকে
 
ফোরামের অর্জন:

নারী-পুরুষ বৈষম্যের সংস্কৃতি আমাদের সমাজে সুদীর্ঘকাল ধরে চলে আসছে ৷ কন্যাশিশুর প্রতি বঞ্চনা, এই বৈষম্যেরই আরেকটি বহিঃপ্রকাশ ৷ এই বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকড় সমাজের অত্যন্ত গভীরে প্রোথিত ৷ এর উত্‍পাটন এবং কন্যাশিশুর বিকাশে সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করার কাজটি একটি দীর্ঘ মেয়াদী প্রক্রিয়া ৷ খুব অল্প সময়ে এ প্রক্রিয়ার দৃশ্যমান ফলাফল অর্জন করা সম্ভব নয় ৷ প্রাথমিক পযার্য়ে সমাজে এ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করাই অধিক গুরুত্বপূর্ণ ৷ কন্যাশিশু এডভোকেসি ফোরাম মূলতঃ এ কাজটি করার চেষ্টা করছে ৷ এ কাজের কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব ইতিমধ্যেই আমাদের সামাজিক জীবনে পড়তে শুরু করেছে ৷ তার কিছু কিছু ইঙ্গিত আমরা প্রত্যক্ষ করছি
 

অব্যাহত প্রচারণা ও ধারাবাহিক কর্মকান্ড পরিচালনার ফলে ৩০ সেপ্টেম্বর এখন "জাতীয় কন্যাশিশু দিবস" হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি লাভ করেছে ৷ বিগত চার বছরে কর্মশালা, আলোচনা-সভা, র্যালি, প্রকাশনা ইত্যাদি কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে সরাসরি প্রায় লক্ষাধিক ব্যক্তিকে এ বিষয়ে তথ্যভিত্তিক ক্ষমতায়নের আওতায় আনা হয়েছে ৷ এর ফলে নিশ্চিতভাবেই সমাজে সচেতনতার মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে ৷ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও স্বেচ্ছাব্রতী পেশাজীবি সংগঠন কন্যাশিশু এডভোকেসি ফোরামের কার্ক্রমের সাথে যুক্ত হয়েছে ৷ ফলে ফোরামের নেটওয়ার্ক-এর বিস্তৃতি ঘটেছে এবং কাজের ক্ষেত্র প্রসারিত হয়েছে ৷ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রায় ৩৮টি সংগঠন এবং অনানুষ্ঠানিকভাবে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে ২০০টি সংগঠন ফোরামের সাথে যুক্ত হয়েছে এবং সুনির্দিষ্ট সাংগঠনিক কাযর্ক্রম গ্রহণ করেছে
 
দি হাঙ্গার প্রজেক্ট ও ফোরামের অন্যান্য সংগঠনসমূহের উদ্যোগে, গত ২০০০-২০০৩ পযর্ন্ত ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পযার্য়ে যে সকল কর্মশালা, উঠোন বৈঠক ও দিবস উদযাপিত হয়েছে এর একটি তালিকা নিচে দেয়া হলো
 

সাল

বড় কর্মমালা

উঠোন বৈঠক

কন্যাশিশু দিবস উদযাপন

২০০০

৫০

১৩৩ টি স্থানে

২০০১

১৬

১৮০

৩৬৭ টি স্থানে

২০০২

২০

৩১৭

৩৪৬ টি স্থানে

২০০৩

২২

৩৫৩

৫৫০ টি স্থানে

 

এসকল কর্মশালায় রাজনীতিবিদ, শিক্ষক, আইনজীবি, সাংবাদিক, ডাক্তার-সহ সমাজের প্রায় সকল স্তরের প্রতিনিধিগণ উপস্থিত ছিলেন ৷ কিশোরীদের উপস্থিতিও ছিলো উল্লেখযোগ্য
 
ক্ষ্য করা গেছে, যেসব অঞ্চলে ফোরাম অধিক সক্রিয়ভাবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছে, সেসব অঞ্চলে কন্যাশিশুর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে অধিক দ্রুততার সাথে ৷ কন্যাশিশুদের শিক্ষার হার বেড়েছে, ঝরে পড়ার হার কমেছে, অনেক অঞ্চলে বাল্য বিবাহের হার কমে এসেছে ৷ যৌতুক প্রতিরোধে অধিক সচেতনতা ও সক্রিয়তা সৃষ্টি হয়েছে ৷ এসব অঞ্চলে অধিকার সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ায় নিযার্তন প্রতিরোধে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখা সম্ভব হয়েছে ৷ নিযার্তন বিরোধী আইন সম্পর্কে সচেতনতা বেড়েছে এবং আইনের আশ্রয় নেবার হার বৃদ্ধি পেয়েছে ৷ গৃহপারিচারিকা হিসেবে নিয়োজিত কন্যাশিশুদের অধিকার সম্পর্কেও নাগরিক সমাজ যত্নবান হয়েছে ৷ গণমাধ্যমগুলো আংশিকভাবে হলেও কন্যাশিশুদের অধিকারকে প্রাধান্য দিয়ে নানারকম প্রচারণা জোরদার করেছে এবং কন্যাশিশু দিবস উদযাপনের সংবাদকে গুরুত্বের সাথে পরিবেশন করেছে
 
এক কথায় বলা যায়, কন্যাশিশুর বিকাশের সাবির্ক পরিবেশ এখনও পরিপূর্ণভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব না হলেও সমাজে এমন কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে যা কন্যাশিশুর জন্য উজ্জ্বল ভবিষ্যতের ইঙ্গিত বহন করে ৷ ফোরাম অন্ততঃ এ ব্যাপারে আশার সঞ্চার করতে সক্ষম হয়েছে ৷ এই সাফল্য অনেকের মিলিত প্রচেষ্টায় অর্জিত ৷ কন্যাশিশু এডভোকেসি ফোরাম ও এর সদস্যরা এ লক্ষ্যে নিরবচ্ছিন্ন কর্মকান্ড চালিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর
 
ভবিষ্যত করণীয় :
¤গৃহের অভ্যন্তরে কন্যাশিশুরা যাতে যৌন নিযার্তনের শিকার না হয় সে বিষয়ে যথাযথ সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে
¤যৌতুকের কারণে এখনও অনেক কন্যাশিশুর জীবননাশ পযর্ন্ত হচ্ছে ৷ এই বাস্তবতা প্রতিরোধে আপামর জনসাধারনের মধ্যে বাল্য বিবাহ রোধ ও যৌতুক প্রতিরোধের কার্যকর চেতনা গড়ে তুলতে হবে
¤সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির জন্য গণমাধ্যম ও প্রচার মাধ্যমকে এ বিষয়টির প্রতি যথাযথ গুরুত্ব আরোপ করতে হবে
¤সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পযার্য়ের নীতি নিধারর্কদের কন্যাশিশুদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গী পরিবর্তন এবং তাদের অবস্থা ও অবস্থানের পরিবর্তনের জন্য বড় ধরনের কৌশলগত পদক্ষ গ্রহণ করতে হবে
¤এ বিষয়টি যাতে একটি সামাজিক আন্দোলনে রূপ নেয় এবং এর প্রতি সকলের একটি মালিকানা সৃষ্টি হয়, এর ফলাফল হিসেবে মানুষ যাতে স্বত:স্ফূর্তভাবেই কাজটি করতে এগিয়ে আসে ও দায়িত্ব গ্রহণ করে, এ লক্ষ্যে কন্যাশিশু এডভোকেসি ফোরামের কাযর্ক্রমকে আরও শক্তিশালী করতে হব
¤বাংলাদেশের প্রত্যেকটি ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পযার্য়ে ফোরামের কার্ক্রমকে বিস্তৃত করতে হবে
¤প্রচারাভিযান কাযক্রমগুলি মালিকানার ভিত্তিতে ও সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে পরিচালনা করার জন্য ছাত্র/ছাত্রীদেরকে এর সাথে আরও জোরালোভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে
¤রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কন্যাশিশুর অধিকার ও সুরক্ষাজনিত সমস্যাগুলোকে অধিকতর গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় আনতে হবে ৷ তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টির নিশ্চয়তা বিধানের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন ও আইনের সংস্কার করতে হবে৷ নুতন আইন প্রণয়নের বিষয়ে জোরালো এডভোকেসি করতে হবে
¤স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের মাধ্যমে ইউনিয়নব্যাপী প্রচারাভিযান, কর্মশালা করতে হবে যাতে করে কন্যাশিশুদের প্রতি সকল প্রকার বঞ্চনা, বৈষম্য ও নির্যাতন বন্ধ করার বিষয়টি নিশ্চিত করা যায় ৷ ইউনিয়ন পর্যায়ে পরিচালিত নানামুখি কার্যক্রমের সাথে কন্যাশিশুদের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে সম্পৃক্ত করতে হবে

 

 

Previous Article<Index>Next Article


Home  / Feedback

© 2005 The Hunger Project-Bangladesh. All rights reserved.