|
কন্যাশিশু পাচার এবং এইচ আই ভি/এইডস: বাংলাদেশ প্রেক্ষিত |
|
| কন্যাশিশু দিবস সংখ্যা |
উজ্জীবক বার্তা, বর্ষ-৩, সংখ্যা-১৭, সেপ্টেম্বর-২০০৪ |
|
প্রফেসর ইশরাত শামীম
|
|
বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার জনবহুল একটি দেশ৷ এদেশের ১৪ কোটি মানুষের প্রায় ৩ কোটি কন্যাশিশু ৷ দারিদ্র, বেকারত্ব, জনসংখ্যার আধিক্য ইত্যাদির কারণে এদেশের কন্যাশিশুরা অধিকাংশ ক্ষত্রে অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার ৷ পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার এদেশে কন্যাশিশুরা খাদ্য, শিক্ষা, চিকিত্সা ইত্যাদি ক্ষেত্রে এখনও বৈষম্যের শিকার ৷ কন্যাশিশুদের মানবাধিকার এখানে অনেকটাই ভূলুন্ঠিত ও পদদলিত ৷ কন্যা শিশুরা এ সমাজে সবচেয়ে বেশী নিরাপত্তাহীন এবং নির্যাতনের শিকার ৷ কন্যাশিশুরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে শারীরিক, মানসিক, যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছে ৷ আর এরই ধারাবাহিকতায় এদেশের কন্যাশিশুরা দেশের অভ্যন্তরে ও দেশের বাইরে পাচার হয়ে যাচ্ছে ৷ আর এই পাচারের শিকার কন্যাশিশুরা কখনও কখনও মরনব্যাধি এইচ আই ভি /এইডস এ আক্রান্ত হচ্ছে, যা দেশের জন্য একটি মহাবির্পযয় ডেকে আনতে পারে ৷
|
|
কোন দেশের উন্নয়ন বলতে বুঝায় সে দেশের প্রতিটি মানুষের উন্নয়ন ৷ কাজেই দেশের সার্বিক উন্নয়ন করতে হলে কন্যাশিশুদেরকে তার মধ্যে অর্ন্তভুক্ত করতে হবে ৷ কারণ দেশের জনসংখ্যার বড় একটি অংশ হলো এই কন্যাশিশু ৷ কন্যাশিশুদের উন্নয়ন ছাড়া কোন ভাবেই দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়, এমন কি কারো মানবাধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব নয় ৷ কন্যাশিশু পাচার এখন জাতীয়, আঞ্চলিক এমনকি আর্ন্তজাতিক সমস্যা বলে বিবেচিত ও স্বীকৃত ৷ পাচার, মানবতার বিরুদ্ধে হুমকি এবং এ ক্ষেত্রে কন্যাশিশুরাই সবচেয়ে বেশী ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে ৷
|
|
কন্যাশিশুরা আমাদের সমাজে সবচেয়ে বেশী উপেক্ষিত ও অধিকার বঞ্চিত ৷ এর পিছনে বিদ্যমান কারণগুলো নিম্নরূপ:
|
|
উপরোক্ত কারণ সমূহের জন্য এ দেশের কন্যাশিশুরা বিভিন্ন প্রতারণার ফাঁদে পড়ে ভারত, পাকিস্তান, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে ৷ এদের অধিকাংশের আশ্রয়স্থল হচ্ছে বিভিন্ন পতিতালয়ে ৷ আবার অনেকে গৃহদাসী হিসাবে নিয়োগ পাচ্ছে, যাদের মধ্যে অনেকে আবার যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছে ৷ পতিতাবৃত্তিতে নিয়োজিত কন্যাশিশুরা অবাধে যৌনাচারে নিয়োজিত থাকার ফলে এইচ আই ভি/ এইডস এ আক্রান্ত হচ্ছে ৷ পালাক্রমে তারা দেশে ফিরে আসছে এবং এইচ আই ভি/ এইডস এর বিস্তার ঘটাচ্ছে ৷
|
|
বিশ্বে শিশু মৃত্যু হার বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশী ৷ এই শিশুদের মধ্যে আবার কন্যাশিশু মৃত্যুর হার ছেলে শিশু অপেক্ষা অনেক বেশী, গ্রাম এবং শহর উভয় এলাকাতেই ৷ প্রত্যাশিত গড় আয়ুও মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের বেশী ৷ এর কারণ শিশু জন্মের ২/৩ মাস পর থেকেই কন্যাশিশুকে কম পুষ্টিকর খাবার দেয়া হয়, ছেলে শিশুদের তুলনায় ৷ অধিকাংশ কন্যাশিশুই অন্তত: ২০ ভাগ কম খাদ্য গ্রহণ করে ছেলে শিশুর তুলনায় ৷ শুধু তাই নয়, চিকিত্সা সুবিধাও মেয়েরা ছেলে শিশুদের তুলনায় অনেক কম পায় ৷ এভাবেই জন্মের পর থেকেই কন্যা শিশুদেরকে আমাদের সমাজে পারিবারিকভাবে বৈষম্যের শিকার হতে হয় ৷
|
|
অন্য দিকে পিতা মাতারা কন্যাশিশুদেরকে পরিবারের বোঝা মনে করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবাহের আয়োজন করে থাকে ৷ বিবাহের সর্বনিম্ন বয়স ১৮ বছর হলেও খুব কম ক্ষেত্রে তা মেনে চলা হয় ৷ আইনের বিধি নিষেধ থাকলেও অধিকাংশ পরিবার তাদের মেয়ে শিশুকে ১৫ বছরের মধ্যে বিয়ে দিয়ে থাকেন, যা তার জীবনের প্রতি মারাত্মক হুমকি ৷ আর এই বাল্য বিবাহের ফলে অনেক সময় তারা বিবাহ বিচ্ছেদের শিকার হয় ৷ এবং এর ধারাবাহিকতায় তারা প্রতারণার শিকার হয়ে পাচার হয়ে যায় ৷ বাল্য বিবাহের ফলে অধিকাংশ কন্যাশিশু ১২ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে গর্ভবতী হয়ে পড়ে, যাদের অধিকাংশই অপুষ্টিতে ভোগে ৷ এর পরিণতিতে সন্তান প্রসবের সময় অনেক মাতা মৃত্যুবরণ করে ৷ এভাবেই বাংলাদেশে কন্যাশিশুরা পারিবারিক পর্যায় থেকেই বিভিন্ন ধরনের বৈষম্যের শিকার হয় ৷
|
|
দক্ষিণ
এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) দক্ষিণ
এশিয়ায় কন্যাশিশুদের
অবস্থান ব্যাখ্যা করেছে এভাবে- কন্যাশিশুরা
বৈষম্যে জন্মে, ম্যত্যুবরণ
করে অধিকহারে, কম যত্নে বেড়ে ওঠে, কম শিক্ষার
সুযোগ পায়, কম মজুরী পায় এবং কর্মস্থলে অবহেলার শিকার হয়, অসুস্থতায় ঝুঁকি
বেশী থাকে, গর্ভবতী হয়ে পড়ে, পরিত্যক্তা হয় এবং মৃত্যুবরণ
বেশী করে বিশ্বের অন্যান্য উন্নত দেশের তুলনায়
৷
|
|
বাংলাদেশ থেকে পাচারকৃত কন্যাশিশুদের চাহিদা ভারতের পতিতালয়গুলোতে সবচেয়ে বেশী ৷ পশ্চিম বাংলার পতিতালয়গুলোতে অধিকাংশই বাংলাদেশী নারী, যাদের প্রায় ৬০-৭০ ভাগই ১৫ বছরের কম বয়সী শিশু ৷ কারণ এইডস এর হাত থেকে রক্ষা পেতে খদ্দেররা বেশীর ভাগ সময়ই কম বয়সী মেয়েদের দিকে হাত বাড়ায় ৷ আর এরই ফলশ্রুতিতে আমাদের দেশের কন্যাশিশুরা সবচেয়ে বেশী পাচারের ঝুঁকির মধ্যে থাকে ৷
|
| বাংলাদেশের থেকে কন্যাশিশু পাচারের একটি চিত্র তুলে ধরা হলো- |
|
|
|
পাচারের মতো ঘৃণ্যতম অপরাধের শিকার হয়ে আমাদের দেশের অগুণতি কন্যাশিশু যে নির্মম পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তা থেকে তাদের রা করতে প্রয়োজন জরুরীভিত্তিতে সম্মিলিত প্রয়াস ৷ একদিকে কন্যাশিশুর মানবিক অধিকারের হরণ ও লাঞ্ছনা, অপরদিকে এইডস প্রসারের ভয়াবহ ঝুঁকি-এই দুই বাস্তবতা প্রতিরোধে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে৷ নইলে দেশের সার্বিক উন্নয়ন হবে সুদূরপরাহত, মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতিও ঠেকানো দূরূহ উঠবে ৷ |
|
© 2005 The Hunger Project-Bangladesh. All rights reserved. |