কন্যাশিশুদের নিয়ে আলাদা করে ভাবতে হবে

কন্যাশিশু দিবস সংখ্যা

উজ্জীবক বার্তা, বর্ষ-৩, সংখ্যা-১৭, সেপ্টেম্বর-২০০৪

জিয়াউল হক
সহকারী সম্পাদক, দৈনিক ইত্তেফাক
 

কন্যাশিশুরা এখনো আমাদের মত সমাজে বোঝা বলে গণ্য ৷ কন্যাশিশুকে মনে করা হয় অর্থনৈতিক দায় ৷ অর্থাত্‍ তাকে লালন-পালন করার পর সে পরের সংসারে চলে যাবে ৷ বাবা-মার সংসারে তার কোন অবদান থাকবে না ৷ সে জন্য আমাদের মত দেশের পরিবারগুলোতে কন্যাশিশুর কদর কম ৷ বাবা-মা ও পরিবার পরিজনের আগ্রহ কেবল ছেলে শিশুর প্রতি ৷ ছেলে শিশুর পুষ্টি ও যত্ন-আত্তির দিকে বেশি খেয়াল রাখা হয় ৷ তারা এটাকে ভবিষ্যতের জন্য একটি বিনিয়োগ মনে করে ৷ তারা মনে করে, ছেলে বড় হয়ে বাবা-মাকে আর্থিক ও অন্যান্য উপায়ে সাহায্য করবে

 

বাংলাদেশের মত দরিদ্র দেশে, যেখানে মানুষের বেকারত্ব অনেক বেশী, খাদ্যের উত্‍পাদন কম, স্বাস্থ্য সেবা বলতে যা বোঝায় তা নেই এবং রোগ-ব্যাধি ও অপুষ্টিতে মানুষ প্রতিনিয়ত মারা যায়, সেখানে অশিক্ষিত সাধারণ মানুষেরা স্বার্থপরের মত চিন্তা করলে কিংবা সে ধরনের আচর করলে তাদের দোষ দেয়া যায় না ৷ এ জন্য প্রথমে কাউকে দায়ী করতে হলে, দায়ী করতে হয় বিশ্ব পারিবারিক ব্যবস্থাকে ৷ যে ব্যবস্থায় কন্যা বিয়ের পর স্বামীর ঘরে শ্বশুর বাড়ি চলে যায় এবং বাবা-মার সংসারের সঙ্গে তার লেনদেনের সম্পর্ক ছিন্ন করতে হয়
 

এ বিষয়টি আলোচনায় এনেছি এ জন্য যে, এটা বাংলাদেশের একক ঘটনা নয়, এটা ঘটছে সারা বিশ্বে ৷ পরিবার বা বিয়ে ব্যবস্থাও সারা বিশ্বে প্রায় এক ও অভিন্ন ৷ সে জন্য কোন নারী এ ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না ৷ উপার্জনক্ষম নারী বিবাহের পর বাবা-মাকে আর্থিকভাবে সাহায্য করতে চাইলে সে স্বামীর অনুমতি নিয়ে তা করে বা করতে হয় ৷ কেননা বর্তমান পারিবারিক ও সামাজিক ব্যবস্থায় স্বামী যোগ্য হোক বা অযোগ্য হোক, তাকে অভিভাবক বলে গণ্য করতে হয় নারীকে ৷ অবশ্য এখন অনেক শিক্ষিত ও উপার্জনক্ষম নারী এ ব্যাপারে কিছুটা স্বাধীনতা ভোগ করার চেষ্টা করছে ৷ এতে পারিবারিক কিছু সমস্যাও হচ্ছে ৷ তা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টাও হচ্ছে

 

তবে বিশ্বের বহু দেশে এ ব্যবস্থার ব্যতিক্রম যে নেই তা নয় তবে সর্ত্র নয়, কোথাও কোথাও ৷ যেমন, বাংলাদেশের খাসিয়াদের মধ্যে পরিবারের নারীই প্রধান ব্যক্তি ৷ নারী গৃহকর্তা ৷ ছেলেরা বিয়ে করে শ্বশুর বাড়ি এসে শাশুড়ির পরিবারের সঙ্গে বসবাস করে ৷ নারীরা সংসারে বেশি পরিশ্রম করে সংসার চালায় ৷ তারাই সংসারের যাবতীয় দায় বহন করে ৷ স্বামীরা তুলনামূলকভাবে অলস ও কর্মবিমুখ৷ এ সমাজে নারী শিশুর মর্যাদা ও আদর যত্ন অনেক বেশি৷ তবে এখন এসব পরিবারে পুরানো প্রথার গুরুত্ব কমে যাচ্ছে, পুরুষেরা দেশের মূল স্রোতের সঙ্গে মেশা শুরু করেছে ৷ মিয়ানমারে পরিবারে নারীরা প্রধান কিনা তা বলতে পারবো না ৷ তবে নারীরা সেখানে বেশি কর্মঠ ৷ আয়-রোজগার তুলনামূলকভাবে তারা বেশি করে ৷ পরিবারে সে কারণে কন্যাশিশুর কদরও সে দেশে বেশি

 

আবার কন্যাশিশুর যত্ম কম নয় ধনাঢ্য পাশ্চাত্য সমাজে ৷ ছেলে শিশু ও কন্যাশিশুর মধ্যে সেখানে কোন পার্থক্য করা হয় না ৷ এখানে ছেলে শিশুকে ভবিষ্যতের সহায় এবং কন্যাশিশুকে ভবিষ্যতের দায় মনে করা হয় না ৷ এ প্রশ্নটি সেখানে নেই ৷ কারণ, রাষ্ট্র ব্যক্তিমানুষের বর্তমান ও ভবিষ্যত্‍ উভয় দায়ই বহন করছে ৷ শিশু অবস্থা থেকে বৃদ্ধাবস্থা পর্যন্ত সরকার সব কিছুতে সহায়তা করছে এবং তদারকিও করছে ৷ বাবা-মাকে সন্তানের জন্য যে দায়িত্ব পালন করতে হয়, তার মূল অংশের ভার নিয়ে নিয়েছে রাষ্ট্র ৷ সেখানে তাই ভাবতে হয় না ৷ বৃদ্ধ হলে পুত্র কন্যাদের তার ভরন-পোষনের দায়িত্ব পালন করতে হয় না ৷ রাষ্ট্র আছে সে জন্যে৷ উন্নত ধনাঢ্য দেশে সে জন্যে বৃদ্ধ বয়সের কথা ভেবে বেশি সঞ্চয় করার দরকার হয় না ৷ হেলথ কেয়ারের ব্যাপক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা থাকায় শিশুরা রোগ-ব্যাধিতেও দরিদ্র দেশের মত ভোগে না ৷ তাছাড়া শিশুদের আঠারো বছর বয়স হওয়ার পর বাবা-মাদেরকে তাদের দায়িত্ব বহন করতে হয় না ৷ এতে পারিবারিক সম্পর্ক শিথিল হয়ে পড়ছে বটে, তবে সন্তানদের নিয়ে বাবা-মায়ের দু:শ্চিন্তাও কমেছে ৷ তাদের কন্যাসন্তান নিয়ে আলাদা করে ভাববারই প্রয়োজন হচ্ছে না

এ থেকে একটা বিষয় পরি
ষ্কার - আর তা হচ্ছে, কন্যাশিশু পরিবারের বোঝা হিসেবে গন্য হওয়ার প্রধান কারণ অর্থনৈতিক ৷ কন্যা বড় হয়ে পরিবারে অর্থনৈতিক অবদান রাখতে সমর্থ হলে পরিবারে কন্যাশিশুর অবস্থাটাই বদলে যেত ৷ এটা পরিবর্তিত হতে পারে পরিবারের প্রথা ও কাঠামো পরিবর্তিত হলে৷ তবে এখন পরিবারে কন্যাশিশুর অবস্থান অনেকটাই অমানবিক৷ বাবা-মা কন্যাকে পুত্র অপো কম ভালো বাসে না৷ এটা ঠিক৷ কিন্তু তাদের মনের মধ্যে একটি চিন্তা সারাক্ষণ ঘুরপাক খায়, মেয়ে বড় হলে সে জামাই এর বাড়ি চলে যাবে ৷ সেখানে যদি আদর যত্ন না পায়, সুখে না থাকে - এ দু:শ্চিন্তাও তারা করে ৷ অপরদিকে কন্যার ভবিষ্যতের চিন্তা করে তাদের তৈরি করে৷ লেখাপড়া, সংসার কর্ম শেখায়৷ কন্যাশিশ্তরা পরিবারে অপাক্তেয় এ কথা বলা যাবে না ৷ কিন্তু এ ক্ষেত্রে ছেলে শিশুরা যত্ম বেশি পায় ৷ কারণ সে বড় হয়ে পরিবারে তার প্রতিদান দেবে, এ জন্য ৷ এখানে পুত্র শিশুর যত্ম বেশি পাওয়ার অন্য কোন কারণ নেই ৷ এর পেছনে রয়েছে দারিদ্র্যের অভিশাপ
 

নারীরা শারীরিক শক্তির মানদন্ডে পুরুষের তুলনায় কিছুটা দুর্বল ৷  বিশ্ব সমাজে পুরুষদের থেকে নারীদের পিছিয়ে থাকার জন্য অনেকে এ কারণটির উল্লেখ করেন ৷ এটি যে একেবারে অযৌক্তিক তা বলবো না ৷ আদিতে জীবন ধারণের জন্য শারীরিক শক্তি সামর্থ্য ছিল প্রধান হাতিয়ার৷ হয়তো তখন থেকে পুরুষেরা পরিবারে ও সমাজে প্রাধান্য বিস্তার করে আছে এবং নারীরা পিছিয়ে পড়েছে৷ কন্যাশিশুর অবস্থান তখন থেকেই ছেলে শিশুর নীচে নেমে গেছে ৷ কিন্তু এটাও তো সত্য, নারীদের ছাড়া মনুষ্য সমাজের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না ৷ নারী ছাড়া নর সৃষ্টি হয় না৷ অপর দিকে নারীরা পরিবারে যে দায়িত্ব পালন করে তা পুরুষের তুলনায় কোন অংশে কম নয়৷ আর্থিক ও সামাজিক দিক দিয়ে সংসারে নারীরই অবদান বেশী, অর্থাত্‍ সন্তান পালন, পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের পরিচর্যা ও রান্না-বান্নাসহ বাড়ির যাবতীয় কর্মের মূল্য ও গুরুত্ব পুরুষের কাজের তুলনায় কোন অংশে কম নয় ৷ নারীর এই ভূমিকা ছাড়া পুরুষ এবং সংসার উভয়ই অচল হয়ে পড়ে৷ অর্থের বাটখারায় তা মাপা হলে নারীর গুরুত্ব পুরুষেরও উপরে উঠে আসতে পারে ৷ এ কাজটি এতদিন করা হয়নি বলে সমাজে নারী ও কন্যাশিশুরা অবহেলিত হয়ে আসছে

 

কন্যাশিশুরা দরিদ্র৷ সব দেশেই তারা অবহেলিত ৷ খাদ্যের বড় ভাগটা দেয়া হয় ছেলে শিশুকে ৷ স্কুলেও প্রথমে পাঠানো হয় ছেলে শিশুকে ৷ কন্যাশিশুকে রাখা হয় মায়ের কাছে, তাকে ঘরের কাজে সাহায্য করার জন্য ৷ এই অবহেলার কারণে কন্যাশিশুরা প্রথমে অপুষ্টি, পরে রোগ-ব্যাধির শিকার হয় ৷ এছাড়া লেখাপড়ায় পিছিয়ে পড়ায়, তার শারীরিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানসিক বিকাশও বাধাগ্রস্ত হয় ৷ এর সঙ্গে মিশেছে নারীদের বিভিন্ন সংস্কারে আবদ্ধ রাখার প্রথা ৷ ফলে নারীরা খাড়া হয়ে দাঁড়াতেই পারছে না ৷ এ উপমহাদেশ, আরব অঞ্চল ও আফ্রিকার দেশগুলোতে তাই নারী ও কন্যাশিশুদের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়৷ আফ্রিকায় তারা প্রথা ও সংস্কারগতভাবে যৌন নির্যাতনের শিকার ৷ এইডস রোগের বিস্তার সে জন্য আফ্রিকায় সবচেয়ে বেশি ৷ ফসলহীনতা ও খাদ্যাভাব তার সাথে মিলে সে দেশগুলোতে এক নরকীয় অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে ৷ আর তাতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কন্যাশিশুরা ৷ টেলিভিশনে খরা ও উদ্বাস্তু কবলিত এলাকার ছবি দেখলেই তা বোঝা যায়

 

দরিদ্র দেশগুলোতে অভাব-অনটন যেখানে পাহাড় সমান - সেখানে কন্যা-পুত্র নির্বিশেষে সব শিশুই অবহেলিত ৷ এ থেকে কন্যাশিশুদের আলাদা করে বের করে আনা খুবই কঠিন ৷ তা আনতে হলে রাষ্ট্রীয়ভাবে একটি অর্থনৈতিক স্তর অতিক্রম করতে হবে৷ অর্থাত্‍ শিশুদের প্রতি নজর দেয়ার মতা অর্জন করতে হবে সমাজকে ৷ তার পর বিভাজনের সুযোগ আসবে৷ তার পরও স্বীকার করতে হয়, এর মধ্যেও সমাজকে তার স্বার্থেই কন্যাশিশুকে নিয়ে আলাদাভাবে ভাবতে হবে৷ কেননা ছেলে শিশুদের সমকক্ষ করতে হলে তাকে এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করতে হবে ৷ আর তা হল - কন্যা বা নারীরা পুরুষদের তুলনায় কোন অংশে কম নয় ৷ এ বোধ সবার মধ্যে জাগিয়ে তুলতে হবে ৷ এ বোধ সর্বত্র জাগ্রত হলে কন্যা ও ছেলে শিশুর মধ্যেকার পার্থক্য মানুষেরা ভুলে যাবে ৷ আর নারীর আয়-উপার্জন বা অবদানের প্রশ্ন তোলা হলে এ কথা সামনে আনতে হবে যে, পুত্র যেমন আয় রোজগার করে সংসারে অবদান রাখে, তেমনি কন্যাটির অবদানের অর্থনৈতিক মূল্যও অনেক বেশী৷ বিষয়টি বুঝতে ও বোঝাতে হবে ৷ তবেই কন্যাশিশুর সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভ

Previous Article<Index>Next Article


Home  / Feedback

© 2005 The Hunger Project-Bangladesh. All rights reserved.