কন্যাশিশু অধিকার - শিশু অধিকার

কন্যাশিশু দিবস সংখ্যা

উজ্জীবক বার্তা, বর্ষ-৩, সংখ্যা-১৭, সেপ্টেম্বর-২০০৪

তালেয়া রেহমান
নি
র্বাহী পরিচালক, ডেমোক্রেসিওয়াচ
 

কন্যাশিশু এবং শিশু এ দুই এর কোন পার্থক্য স্বীকার করতে আমি নারাজ ৷ কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে আমাদের এই গরীব দেশে এবং ''দক্ষিণ এশিয়ার" দেশসমূহে এই দুই সংজ্ঞাকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখা হয়

 

জাতিসংঘ ''শিশু অধিকার সনদ"- এ বিশেষভাবে কন্যাশিশুর কথা বলা হয়নি ৷ কিন্তু শিশু ভূমিষ্ঠ হবার পর থেকেই আমাদের সমাজ এই বিভেদ সৃষ্টি করে থাকে ৷ কন্যাশিশুর আগমনে অসংখ্য স্বামী মুখ ফিরিয়ে গৃহত্যাগ করে চলে যায় ৷ শশুর-শাশুড়ির গঞ্জনা আর ধিক্কার শুনতে শুনতে নিরূপায় হয়ে কত বউ ঘর ছাড়া হয় তার হিসাব আমরা কেউ রাখিনা ৷ কিন্তু এ-ই আমাদের সামাজিক কাঠামো ৷ প্রজনন পদ্ধতিতে শিশুর যৌন পরিচিতি যে স্বামী দ্বারা নির্ধারিত হয় তাও আমাদের সমাজ তেমন নিশ্চিতভাবে জানে না ৷ সোজা কথায় এর জন্য দায়ী থাকে স্বামী, অথচ সামাজিকভাবে নিগৃহীত হয় স্ত্রী ৷ আমি মনে করি, এই তথ্যের প্রচার ব্যাপকভাবে চালানো উচিত ৷ অন্ততঃ মেয়ে সন্তান প্রসবের জন্য নারীরা ধিকৃত হওয়া থেকে নিষ্কৃতি পেতে পারে

 

এটি কেবল প্রথম ধাপ ৷ তারপর থেকে শুরু হয় কন্যাশিশুর করুণ জীবন কাহিনী ৷ যদি কয়েকটি সন্তান সেই পরিবারে থাকে, তবে কন্যাশিশুটিই অধিক বঞ্চনার শিকার হয় ৷ তার পুষ্টি, নিরাপত্তা, শিক্ষা ও যত্নের প্রতি সবাই থাকে উদাসীন ৷ সীমিত আয়ের সংসারে প্রথম বলি হয় কন্যাশিশু ৷ চার-পাঁচ বছর বয়স থেকেই নিজ গৃহের গৃহস্থালি কাজ দিয়ে শুরু, তারপর মফস্বল শহরগুলোতে এবং ঢাকা শহরের বিভিন্ন বাড়িতে কাজ করে খেতে হয় তাদের ৷ এই ঢাকায় স্বচ্ছল, শিক্ষিত এমনকি সম্ভ্রান্ত বাড়িতেও বহু সংখ্যক কন্যাশিশু রাত-দিন কাজ করছে ৷ কেননা সামান্য খরচে অথবা পেটে-ভাতে এদেরকে দিয়ে কাজ করিয়ে নেয়া যায় ৷ অনেক ক্ষেত্রেই এদের বয়স দশ বছরের নীচে ৷ তারা বাড়ির সব ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ সমাধা করে ৷ যেমন, মাছ-মাংস, তরিতরকারি ধারাল যন্ত্রের সাহায্যে কাটা, রান্না করা, বড় বড় পাত্রে পানি ভরে তিন চারতলা উপরে লনে উঠানো ইত্যাদি ৷ এসব ভারী কাজের ফলে অনেক সময়ই তাদের শরীরে অনেক বড় ধরণের আভ্যন্তরীণ ক্ষতি ঘটে, যা হয়তো তাত্‍ক্ষণিকভাবে টের পাওয়া যায় না ৷ আবার, ভালোভাবে কাজ সমাধা না করতে পারলে গাল-মন্দ তো বটেই, শারীরিক নির্যাতনের শিকারও হতে হয় ৷ পত্র-পত্রিকায় অহরহ এ সব রিপোর্ট দেখতে পাই আমরা ৷ কিন্তু এর তেমন প্রতিক্রিয়া ঘটে বলে মনে হয় না ৷ শিক্ষিত পরিবারগুলোতে এমন অনেক কন্যাশিশু দিবা-রাত্রি দৈহিক পরিশ্রম করে চলেছে ৷ ব্যাপক অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন ছাড়া এই প্রথাকে মুছে ফেলা সম্ভব নয় ৷ যেটা সম্ভব, তা হচ্ছে শিশুর অধিকার সম্পর্কে সকলকে সচেতন করা এবং এই অধিকারকে যারা উপেক্ষা করে, তাদের শাস্তির বিধান করা

 

গরীব পরিবারগুলোই মূলত কন্যাশিশুদের ভরন-পোষণ করতে না পেরে তাদেরকে শহরে কাজ করতে পাঠিয়ে দেয় ৷ এই কাজ জাতিসংঘ শিশু সনদের পরিপন্থী ৷ কিন্তু তা সত্ত্বেও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে, হত দরিদ্র পরিবারের একটি মেয়েকে বাড়ির কাজে কিছু সাহায্যের বিনিময়ে মানুষ করার দায়িত্ব নেয়াটা আমাদের সমাজে এখনো গ্রহণযোগ্য ৷ কিন্তু যে বিষয়ে আমাদের সচেতন হতে হবে তা হচ্ছে শিশুর সকল অধিকার পূরণে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়া ৷ বাসায় কাজ করে যে শিশুটি তাকে স্কুলে পাঠাতে হবে অথবা বাড়িতে লেখাপড়া শেখাতে হবে ৷ মানসিক বিকাশে সাহায্য করার জন্য যথেষ্ট বিশ্রাম এবং খেলাধূলার সময় দিতে হবে ৷ তাছাড়া তার নিজের পরিবারের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে দিতে হবে ৷ নিজের সন্তানের মত তাদেরও পুরোপুরি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে ৷ বাড়ন্ত বয়সের গৃহপরিচারিকাদেরকে বাড়ির তরুণ ছেলে ও পুরুষ মনিবের লোলুপ দৃষ্টি থেকে বাঁচানোর দায়িত্ব নিতে হবে ৷ এটা সহজ কাজ নয়, তবুও শিশুটির শারীরিক ও মানসিক নিরাপত্তা রক্ষার দিকে পরিবারের অন্য সন্তানের মতোই সুতীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন ৷ এসব ব্যবস্থা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য গৃহকর্তাদের যত্নবান হতে হবে ৷ যদিও অনেক ক্ষেত্রেই এর ব্যতিক্রম দেখা যায় ৷ এইসব শিশুদের উপর শারীরিক নির্যাতনের ফলে অনেক সময় মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে ৷ অসহায় এইসব শিশুদের রক্ষা করার প্রাথমিক ধাপ হিসেবে গৃহকর্তাদের সচেতনতা বৃদ্ধির কাজটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ৷ শিশু অধিকার শুধু মধ্যবিত্ত পরিবারের শিশুর জন্যই নয়, সব শিশুর জন্যই প্রযোজ্য-বাড়ির কাজের মেয়েটির জন্যও ৷ এই বার্তাটি তাদের বোঝানোর দায়িত্ব সমাজ কর্মী এবং কল্যাণকর্মী সংস্থাগুলোর নেয়া উচিত

 

শিশু অধিকার সুরার জন্য পুলিশ বাহিনীর একটি শাখা নিয়োজিত রাখা উচিত৷ যেসব বাড়িতে শিশু পরিচারিকা আছে, তাদের অবস্থা জানার একটি ব্যবস্থা করা গেলে জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ এর কার্যকারিতার দিকে আমরা কিছুটা এগিয়ে যেতে পারি

 

আমাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো এমনই যে, জোর দিয়ে এটিও বলতে পারিনা, "তাদের পারিবারিক কাজে নিয়োজিত করবেন না"! কেননা হয়তো এই মেয়েটির উপর্জিত সামান্য অর্থই তার গরীব বাবা মা'র একমাত্র সম্বল!

 

ধ্যবিত্ত শ্রেণীর প্রচেষ্টায় বেশীর ভাগ সামাজিক, এমনকি রাজনৈতিক পরিবর্তন সাধিত হয়ে থাকে ৷ আজ জাতীয় কন্যাশিশু দিবসটিতে আমি আমাদের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে কন্যাশিশুর অধিকার রক্ষার এই অঙ্গীকারটুকু করার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে চাই ৷ আসুন আমরা সবাই নিজের বাসায় কর্মরত কন্যাশিশুটির দিকে সস্নেহ দায়িত্বের হাত বাড়িয়ে দেই ৷ তার সুরক্ষা নিশ্চিত করি ৷ তার মানবিক অধিকারের প্রতি যত্নশীল হই

Previous Article<Index>Next Article


Home  / Feedback

© 2005 The Hunger Project-Bangladesh. All rights reserved.