ছাত্রী বৃত্তি হচ্ছে মেয়েদের বিয়ে ঠেকানোর কর্মসূচি

কন্যাশিশু দিবস সংখ্যা

উজ্জীবক বার্তা, বর্ষ-৩, সংখ্যা-১৭, সেপ্টেম্বর-২০০৪

ফরিদা আখতার
নির্বাহী পরিচালক, উন্নয়ন বিকল্পে নীতি নির্ধারণী গবেষণা (উবিনীগ)
 

বন্যার সময় অনেক ছবি পত্রপত্রিকায় উঠেছে যা মনে দাগ কাটার মতো ৷ ছবি যারা তোলেন তারা এমন অনেক মূহুর্ত ধরে রাখতে পেরেছেন, যা আমাদের চিন্তার খোরাক যোগায় ৷ ফটো সংবাদিকদের ধন্যবাদ
 

গত ২৬ জুলাই ২০০৪ দৈনিক সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত তেমনি একটি ছবির কথা উল্লেখ করছি ৷ মা ও মেয়ের ছবি ৷ ছবির শিরোনাম 'ছাত্রীদের মাসিক বৃত্তির টাকা নিতে অভিভাবকরা ঢাকার কেরানীগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে পানি ভেঙ্গে ছুটে যান'

ছবিটি দেখে মনে পড়লো.......... তাইতো, আজকাল কন্যাশিশুদের কদর একটু বেড়েছে! তারা বৃত্তি পায় ৷ তাইতো এই বন্যার সময় মায়ের সম্বল 'মেয়ের বৃত্তি' ৷ কিন্তু এখন দেখা যাক, এই বৃত্তির আসল বিষয়টা কি?
 

বিশ্বব্যাংক ১৯৯৩ সালে মেয়েদের অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ার জন্যে বৃত্তির ব্যবস্থা চালু করে ৷ এই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্যে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশ সরকারকে ৬ কোটি ৮০ ল মার্কিন ডলার ঋণ হিসেবে দেয় ৷ ছাত্রীদের স্কুলে ভর্তির জন্যে এবং শিক্ষার জন্যে মাসিক বৃত্তি এবং বিদ্যালয়গুলোকে বিশেষ সহায়তা দেয়া হয় ৷ বলা বাহুল্য, ১৯৯৪ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত প্রকল্প এলাকার স্কুলগুলোতে ছাত্রীদের ভর্তি সংখ্যা বেড়ে যায় ৷ বিশ্ব ব্যাংকের হিসাব মতে এই সংখ্যা বেড়ে প্রায় ১০ ল হয়ে গেলো, অর্থাত্‍ প্রায় দ্বিগুণ ৷ অন্যদিকে এই সময়ে প্রকল্প এলাকায় ১৩-১৫ বছরের বয়সের মেয়েদের বিয়ের সংখ্যা কমে গেলো ২৯% থেকে ১৪% এ দাঁড়ায় ৷ অর্থাত্‍ প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি ৷ এই বয়সে বিয়ে মানে বাল্য বিবাহ ৷ কাজেই প্রকল্পটি বাল্য বিবাহের হার কমাতে পেরেছে প্রায় অর্ধেক৷ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সমাজকে বুঝিয়ে সমাজ সংস্কার করার বৃথা চেষ্টা করেছেন, সামান্য বৃত্তি দিলেই যে বাল্য বিবাহ ঠেকানো যায় এমন বুদ্ধি এমন তাঁর মতো একজনক মহাপন্ডিত ব্যক্তির হয় নি! বিশ্ব ব্যাংক কর্মসূচির পরিসংখ্যানগত সাফল্যে তাই মনে হয়
 

বিশ্ব ব্যাংক ছাত্রী বৃত্তি কর্মসূচি কয়েক ধরণের 'সফলতা' এনেছে ৷ অবশ্যই বিদ্যালয়গুলোতে মেয়েদের ভর্তির সংখ্যা বেড়ে গেছে ৷ গরিব মা-বাবারা অর্থের স্বল্পতার কারণে ছেলে এবং মেয়ের মধ্যে বৈষম্য করে বসেন ৷ মাত্র একজনকে শিক্ষা দেয়ার সুযোগ থাকলে ছেলেটিকেই স্কুলে পাঠান ৷ এমন একটি 'বাস্তবতার' মধ্য দিয়ে বিশ্ব ব্যাংকের বৃত্তি কর্মসূচি একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটিয়েছে বলেই তারা বিশ্বাস করে ৷ বিশ্ব ব্যাংকের একটি প্রতিবেদনে নরসিংদীর এক প্রধান শিক্ষক বলেছেন যে, তাঁর তিন দশকের শিক্ষকতার জীবনে নাকি এতো মেয়েকে স্কুলে যেতে দেখেন নি ৷ তাঁর ভাষায় বৃত্তি কর্মসূচি যেন একটি যাদু !

 

এই বৃত্তি কর্মসূচি এতোই সফলতা পেয়েছে যে বিশ্ব ব্যাংকের ২০০২ সালে পরবর্তী ধাপের কর্মসূচি হাতে নেয়ার শিরোনাম হচ্ছে Female secondary School Assistance Project II (FSSAP) ৷ এই কর্মসূচিতে বিশ্ব ব্যাংক প্রদত্ত সুদ মুক্ত ঋণের পরিমাণ হচ্ছে ১ কোটি ২০ লক্ষ ৯০ হাজার মার্কিন ডলার ৷ এতে আরো বেশী সংখ্যক মেয়েদের স্কুল কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে ৷ প্রকল্প এলাকাগুলোতে ৫০০০ স্কুলের ছাত্রীদের বৃত্তি দেয়া হবে এবং শিক্ষার মান উন্নত করা হবে ৷ খুব ভালো কথা

 

এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে যাঁরা সমাজের কথা ভাবেন তাঁরা নারীদের অবস্থার পরিবর্তন চান, তাঁরা নারীদের মধ্যে শিক্ষার হার কম দেখে উদ্বিগ্ন হন ৷ এদেশে সমাজ পরিবর্তনের আন্দোলনে যাঁরাই যোগ দিয়েছেন তাঁরাই নারী শিক্ষার কথা বলেছেন, নিজেরা উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন ৷ একটি স্কুল হলেও স্থাপন করেছেন, ছাত্রী খুঁজে বেড়িয়েছেন ৷ নারী শিক্ষার জন্যে নবাব ফয়জুন্নেসা ও বেগম রোকেয়ার সংগ্রামের কথা আমরা জানি ৷ রোকেয়া শিক্ষাকে দেখতেন একদিকে পুরুষতান্ত্রিক ধ্যানধারণা থেকে মুক্তির প্রক্রিয়া হিসেবে, আরেকদিকে এবং লিঙ্গ ভিত্তিক শ্রম বিভাগে রূপান্তর আনবার হাতিয়ার হিসেবে ৷ "প্রয়োজনে আমরা লেডি কেরানি, লেডি জজ হইবো - এই কথা তাঁকে বলতে হয়েছে পুরুষদের জন্য পূর্ব নির্দিষ্ট জায়গাগুলোতে নারীকেও বসাবার লক্ষ্যে

 

বহাল শিক্ষা ব্যবস্থায় "নারী শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি" একটা প্রধান সামাজিক প্রশ্ন হিসেবে প্রায়ই তোলা হয় ৷ নারীদের সুযোগের অভাব আছে, এ কথা সকলেরই জানা ৷ পরিবারে ছেলে এবং মেয়ের শিক্ষার ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেয়ার মধ্যে আমরা বৈষম্য লক্ষ্য করি ৷ পুরুষতন্ত্র এই ক্ষেত্রে অলক্ষ্যে কাজ করে যায় ৷ ছেলে বড় হয়ে সংসারের দায়িত্ব নেবে আর মেয়ে শশুড় বাড়ি যাবে, এ চিন্তা যখন কাজ করে তখন স্বাভাবিকভাবেই ছেলেকে সেই উপযুক্ত শিক্ষা দেয়া হয়, আর মেয়েকে স্বামীর কাছে চিঠি লেখা, বাজারের হিসাব রাখতে পারার মতো শিক্ষা দিলেই যথেষ্ট ভাবা হয় ৷ এই মনোভাবের আমরা সমালোচনা করি বটে, তবে যদি দেখা যায় শিক্ষা হচ্ছে ভবিষ্যতে সমাজের বিশেষ সদস্য হবার একটি মাধ্যম, তাহলে নারী হবে ঘরের বধূ আর পুরুষ হবে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-অফিসের বড় কর্মকর্তা, এই চিন্তা কার্যকরী করতে মানুষ এই সিদ্ধান্ত ছাড়া আর কীই বা নিতে পারে ৷ এর মধ্য দিয়েই নারী পুরুষের বিদ্যমান সম্পর্ক বহাল রাখবার প্রক্রিয়া হিসেবে শিক্ষাকে অনায়াসেই শনাক্ত করা যায় ৷ অবশ্য এই ব্যবস্থা এখন আর নেই ৷ মেয়েরা সব কাজই এখন করছে

 

নারী আন্দোলন দীর্ঘ দিন ধরে নারী শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে, সমাজ সংস্কারকরাও নারী মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় শিক্ষার জন্য তত্‍পর হয়েছেন, ধর্মেও শিক্ষার কথা বলা আছে ৷ কাজেই কেউ নারী শিক্ষার জন্যে সচেষ্ট হলে তাকে অবশ্যই ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করতে হবে ৷ বিশ্ব ব্যাংক যদি সেই কারণে নারী শিক্ষার জন্যে সাহায্য দেয় তাহলে আপত্তির কিছু থাকতে পারে না ৷ কিন্তু এমন একটি মৌলিক দাবির প্রশ্নটিও যদি ভিন্ন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয় তখন একটু ভাবতে হয় ৷ আমাদের লক্ষ্য করতে হবে যে, বাংলাদেশে নারী শিক্ষার গুরুত্ব যখন নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে এলো তখন তা এলো একেবারে ভিন্ন কারণে ৷ আপাত দৃষ্টিতে নারীর মর্যাদা বৃদ্ধির জন্যে এবং তাকে শক্তিশালী করার জন্যে মনে হলেও, আসলে এটা এসেছে দাতা সংস্থা, বিশেষ করে বিশ্ব ব্যাংকের সাহায্যপুষ্ট এবং সরকারের ঘোষিত জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি কার্যকরী করার জন্যে ৷ এটা সরকারের নিজস্ব পরিকল্পনা থেকে আসেনি

 

'জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ' দাতা সংস্থার শর্তগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রধান শর্ত ৷ ষাটের দশকে যখন প্রথম জনসংখ্যা নীতি ঘোষিত হয়েছিলো, তখন এটা ছিলো কেবল জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি বিতরণের ওপর নির্ভরশীল একটি কর্মসূচি ৷ এ জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি দেয়া হয় বেশির ভাগ মহিলাদের ৷ ফলে মহিলাদের এ ব্যাপারে যাতে সহজে পাওয়া যায় সেজন্য অন্যান্য সুবিধা দেয়ার পরিকল্পনা নেয়া হলো ৷ যেমন, অর্থনৈতিক কাজের সহায়তা দেয়া ৷ 'শিক্ষা প্রাপ্ত হলে মহিলারা নিজেরাই নিজেদের সন্তান সংখ্যা কত হবে সে সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন' - এ তত্ত্ব সম্পর্কে এক সময় দাতারা একমত ছিলেন না৷ তারা বলতেন, শিক্ষা দিয়ে ফল পেতে অনেক সময় লেগে যাবে ৷ আমাদের এত সময় নেই ৷ এভাবে শিক্ষার কথা ছাড়াই জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি বিতরণের মাধ্যমে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি পরিচালিত হলো দীর্ঘ ২৫ বছর, ১৯৬৫ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত ৷ তারপরও তাদের কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জিত না হওয়ায় এখন তারা 'নারী শিক্ষার কথা তুলছে জোরে সোরে ৷ তার জন্যে বিশেষভাবে সহায়তা প্রদান করছে ৷ লক্ষ্য কিন্তু নারীকে শিক্ষা দেয়া নয়, বিকাশ নিশ্চিত করা নয় ৷ নারীকে কেবল ততটুকু শিক্ষা দেয়া হচ্ছে, যাতে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রকদের কথা মতো সে চলে অর্থাত্‍ তার জরায়ু নিয়ন্ত্রণের জন্য যতটুকু শিক্ষা দেয়া দরকার সেটুকুই এখন দাতারা দিতে উদগ্রীব ৷ বিশ্ব ব্যাংক ও অন্যান্য দাতাদের ইচ্ছা: শিক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে মেয়েদের বিদ্যালয়গুলোতে ব্যস্ত রাখা যাবে

 

বিশ্ব ব্যাংকের মুখ্য উদ্দেশ্য সম্পর্কে ধারণা দেবার জন্যে তাদের নিজেদের প্রতিবেদন থেকে কিছু কথা তুলে ধরছি ৷ বিশ্ব ব্যাংকের প্রাক্তন প্রধান অর্থনীতিবিদ লরেন্স সামার্স নারী শিক্ষার জন্যে বিশ্ব ব্যাংকের অর্থ ব্যয় করা উচিত বলে বিশেষ তত্ত্ব দিয়েছেন ৷ তিনি বলেছেন, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে বিদ্যুতের জন্যে পাওয়ার প্লান্ট বসানের চেয়ে নারী শিক্ষার জন্যে অর্থ বিনিয়োগ করলে বেশী লাভ পাওয়া যাবে ৷ লরেন্স সামার্স হিসাব করে দেখিয়েছেন যে মেয়েরা স্কুলে গেলে প্রতি বছর প্রজনন হার শতকরা অন্তত ৫ থেকে ১০ ভাগ কমে আসে ৷ যদি ১ হাজার মহিলাকে শিক্ষা দান করতে ৩০ হাজার মার্কিন ডলার খরচ হয়, তাহলে ৫০০ সন্তান জন্মকে রোধ করা যাবে ৷ অথচ এ ৫০০ সন্তানের জন্ম রোধ করতে গিয়ে সরাসরি জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি দিতে হলে ৩৩ হাজার মার্কিন ডলার খরচ হতো ৷ তাহলে ৫০০ শিশুর জন্ম রোধ করতে হলে শিক্ষার মাধ্যমে সস্তায় সেটা সম্ভব এবং তাতে ৩ হাজার মার্কিন ডলার কম লাগে ৷ এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হচ্ছে, লরেন্স সামার্সের হিসেবে কত নারী আত্মমর্যাদাশীল হলো সেটা দেখার বিষয় ছিলো না ৷ শিক্ষা পাওয়ার বিনিময়ে সে সন্তান জন্ম দান কমালো কিনা সেটাই তার হিসেবেব মূল লক্ষ্য ৷ লরেন্স সামার্স বলেছেন, উন্নয়নশীল দেশ আগামী ১০ বছরে ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যবহার করবে বিদ্যুত্‍ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য ৷ তারা এই ধরণের কেন্দ্র ভালোভাবে রাখতেও জানে না ৷ ফলে তাদের বিদ্যুতের জন্যে ঋণ না দিয়ে নারী শিক্ষার জন্যে ঋণ দেয়াই বেশি লাভজনক হবে

 

লরেন্স সামার্স হচ্ছেন সেই ব্যক্তি, যিনি তৃতীয় বিশ্বে বিষাক্ত বর্জ্য ফেলা অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক বলে তত্ত্ব দিয়ে কুখ্যাত হয়েছেন ৷ তিনি এ তত্ত্ব একটি মেমোতে লিখে নিজের সহকর্মীদের মধ্যে বিতরণ করতে গিয়ে ধরা পড়ে গিয়েছিলেন ৷ সাংবাদিকদের কাছে সেটা ফাঁস হয়ে যায় এবং এক মহা কেলেংকারিরর সৃষ্টি হয় ৷ তাঁর নতুন নারী শিক্ষার তত্ত্ব হচ্ছে: বিদ্যুত্‍ উত্‍পাদনের মতো মৌলিক অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তৃতীয় বিশ্বকে বঞ্চিত করে তাদের অর্থনীতিকে একদিকে পঙ্গু করে রাখা হোক আর নারীদের জরায়ু নিয়ন্ত্রণের জন্য সেই টাকা খরচ করা হোক ৷ দাতাদের নারী উন্নয়ন ও নারী শিক্ষার মর্ম কথা হচ্ছে এটাই

 

বিশ্ব ব্যাংকের আরেকটি হিসাব আছে, মেয়েদের মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষা দিলে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে একটা ভালো ফল পাওয়া যায়৷ তারা একটি গবেষণায় দেখিয়েছে, যে সমাজে মেয়েরা মাধ্যমিক শিক্ষা পর্যন্ত পৌঁছায় না সেখানে গড়ে প্রতিটি মহিলার ৭ টি সন্তান হয়, আর যদি মেয়েরা মাধ্যমিক শিক্ষা পর্যন্ত থাকে তাহলে গড়ে তিনটি সন্তান হয়৷ অর্থাত্‍ গড়ে ৪ টি সন্তান কমানো সম্বব হয় যদি শিক্ষায় তাদের ব্যস্ত রাখা যায়

 

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য সংস্থা ইউএসএইডও মেয়েদের শিক্ষার কথা বলছে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য অর্জনের জন্যে ৷ তারা অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত মেয়েদের অবৈতনিক শিক্ষা দেয়ার নীতি গ্রহণ করতে বলেছে, সরকার তা গ্রহণও করেছে ৷ তাদের ধারণা এতে মেয়েদের বিয়ে দেবার সময় কিছুদিন পিছিয়ে দেয়া যাবে ৷ আমরা এতোকাল ধরে বাল্য বিবাহ ঠেকানোর জন্য যে উত্‍কন্ঠা প্রকাশ করেছি, এ উত্‍কন্ঠা আর সে উত্‍কন্ঠা এক নয় ৷ তাদের চিন্তা হচ্ছে তাড়াতাড়ি বিয়ে হলে তাড়াতাড়ি বাচ্চা হবে ৷ ফলে দেরিতে বিয়ে দেওয়াই বাঞ্ছনীয় ৷ বিয়ের বয়স বাড়ানোর পেছনেও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ নীতি বিশেষ কারণ ছিলো৷ যে সব কারণে তাড়াতাড়ি বিয়ে হয়, সেটা দূর না করে শুধু বিয়ের বয়স বাড়ালেই এবং স্কুলে ব্যস্ত রাখলেই সমাধান হয়ে যাবে না ৷ ইতোমধ্যেই অবৈতনিক অষ্টম শ্রণী পর্যন্ত শিক্ষার যে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে তার একটা কুফল দেখা যাচ্ছে ৷ বেসরকারি স্কুলগুলো মেয়েদের নিতে চাচ্ছে না, কারণ তাদের নিলে বেতন নেয়া যাবে না ৷ এভাবে বহু জায়গায় মেয়েরা ভর্তি হতে পারছে না

 

বিশেষ ধরণের কাজের সুযোগ সৃষ্টি করার জন্যেও নারীকে এ শিক্ষার সুযোগ দেয়া হয়েছে ৷ বিশ্ব পুঁজিতান্ত্রিক অর্থনীতির দরকারে এবং বিশ্ব ব্যাংকের ঋণের শর্ত হিসেবে আমাদের দেশে রপ্তানিমুখী শিল্পায়ন শুরু হয়েছে সত্তর দশকের মাঝামাঝি থেকে ৷ গার্মেন্টস শিল্প ও চিংড়ি রপ্তানীজাত শিল্প এর মধ্যে অন্যতম ৷ গার্মেন্টস শিল্পের প্রধান আকর্ষণ সস্তা শ্রম, যা অল্প বয়সী মেয়েরাই দিচ্ছে ৷ বর্তমানে প্রায় ১৮ লক্ষ মেয়ে গার্মেন্টস শিল্পে কাজ করছে ৷ দেখা গেছে, গার্মেন্টসে কাজের জন্য মেয়েরা এগিয়ে আসছে, কারণ তাদের বিকল্প কোন কাজ নেই ৷ কিংবা যে সুযোগগুলো আছে তা এর চেয়েও খারাপ, যেমন বাসা বাড়িতে কাজ করা ইত্যাদি ৷ ফ্যাক্টরীতে কাজ করতে গেলে মেয়েদের কিছু লেখাপড়া জানার প্রয়োজন পড়ে ৷ মেয়েকে কিছু লেখাপড়া করালে গার্মেন্টসে চাকরি পাবে বলে নিম্নবিত্ত পরিবারের মা বাবাও সেটুকু লেখাপড়ার জন্য পাঠাচ্ছে, কারণ তাদের সংসারে আয়ের প্রয়োজন৷ পুঁজিতান্ত্রিক অর্থনীতি টিকিয়ে রাখতে যে সস্তা শ্রম দরকার, সে প্রয়োজনেও বিশ্বব্যাংকের মতো সংস্থাগুলো নারী শিক্ষাকে একটি বিশেষ পর্যায় পর্যন্ত সহায়তা করবে ৷ এখানে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও রপ্তানিমুখী শিল্পে সস্তা শ্রমের যোগান-এর বিষয়টির মধ্যে পারষ্পরিক সম্পর্ক আছে ৷ যে সব মেয়েরা লেখাপড়া করবে, তারাই পরবর্তিতে গার্মেন্টস শিল্পে চাকরি করবে ৷ এ ভাবে তাদের বিয়ে ও সন্তান হওয়া ঠেকিয়ে রেখে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের কাজও হবে

 

ছাত্রীদের বৃত্তি দেয়াকে দেরীতে বিয়ে হওয়ার একটি ইনসেন্টিভ হিসেবেই ভাবা হচ্ছে ৷ স্কুলে ব্যস্ত রাখতে পারলেই দেরীতে বিয়ে হবে ৷ গ্রামে গঞ্জে পাওয়া তথ্য থেকে দেরীতে বিয়ে হওয়ার পরিসংখ্যান পাওয়া গেলেও, ছাত্রী বৃত্তি মেয়েদের পড়াশ্তনা এবং তাদের সামাজিক অবস্থান কতখানি দৃঢ় করেছে বলা মুশকিল ৷ ইতিমধ্যে অনেক সমস্যা ধরা পড়েছে এবং ছেলেরা পড়াশুনায় কম ঢুকতে পারছে বলে ছাত্রীদের স্কুলে আসা যাওয়ার পথে বখাটে ছেলের উত্‍পাতও বেড়ে গেছে ৷ গাইবান্ধার তৃষার মর্মান্তিক মৃতু্য তেমনিই একটি অবস্থার প্রতিফলন ৷ কাজেই সমাজে ভারসাম্য নষ্ট করে নারী পুরুষ কারোরই উপকার হবে না ৷ নারীর অধিকার রার জন্যে পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন দরকার ৷ সাময়িক ব্যবস্থাপনায় বৃত্তি ব্যবস্থা কতদিন এই অগ্রগতি রক্ষা করতে পারবে? ছাত্রী বৃত্তি কর্মসূচি উঠে গেলে মেয়েদের স্কুলে পাঠানো অব্যাহত রাখার মতো সমাজ কি আমরা তৈরী রেখেছি? বিশ্ব ব্যাংক সেসব দিকে আগ্রহী নয়, তারা চায় এই মূহুর্তে জন্ম হার কমানোর জন্য বিয়ের সময়টি পিছিয়ে দিতে - এইটুকুই !

 

আর বন্যার সময় মেয়েটির মায়ের যদি বৃত্তির টাকাটুকু পেয়ে কিছু উপকার হয়ই তাতেই আমাদের খুশি থাকতে হবে ৷ এর বেশী কিছু আশা করা যাবে না
শেষ কথা
শুধু এটাই বলতে চাই, বিশ্ব ব্যাংকের এই কর্মসূচি বাল্য বিবাহ বন্ধ করা বা মেয়েদের সামাজিক অবস্থা পরিবর্তন করার লক্ষ্যে নয়, বরং সাময়িক ভাবে হলেও অর্থাত্‍ অষ্টম শেণী পর্যন্ত মেয়েদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ব্যস্ত রেখে, বিয়েতে বিলম্ব ঘটিয়ে কিছু জন্ম হার কমানোর লক্ষ্যে করা হচ্ছে ৷ এই উদ্দেশ্যগুলো আমাদের কাছে পরিষ্কার থাকা দরকার

Previous Article<Index>Next Article


Home  / Feedback

© 2005 The Hunger Project-Bangladesh. All rights reserved.