ক্ষুধা, মৃত্যু ও নারী

কন্যাশিশু দিবস সংখ্যা

উজ্জীবক বার্তা, বর্ষ-৩, সংখ্যা-১৭, সেপ্টেম্বর-২০০৪

ড. বদিউল আলম মজুমদার

গ্লোবাল ভাইস প্রেসিডেন্ট ও কান্ট্রি ডিরেক্টর

দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-বাংলাদেশ
 

গত বছর (২৪ জুলাই, ২০০৩) দি ডেইলী স্টার পত্রিকায় "When death looks greener than starvation" (যখন অনাহার থেকে মৃত্যু অধিক আকর্ষণীয়) শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয় ৷ ঘটনাটি ছিল এমন - রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার দুখিমন বেগমের সাথে তার স্বামী মানিক চাঁদের বচসা হয়, ভাস্তির বিয়েতে একটি শাড়ী দেয়াকে কেন্দ্র করে ৷ সে রাতে তাদের ঘরে কোন খাবার ছিল না ৷ পরিবারের সকলে অনাহারেই রাত কাটায় ৷ পরদিন সকালে অভুক্ত অবস্থায়ই মানিক চাঁদ রিকসা চালাতে বেরিয়ে যায় ৷ অনাহারী দুখিমন তার দুই শিশু কন্যার মুখে খাবার তুলে দিতে না পেরে তিনজন মিলেই বিষপান করে ৷ হাসপাতালে দুখিমন রক্ষা পেলেও রেহাই পায়নি তার দুই কন্যাশিশু ৷ ছয় বছরের মনি ও আট বছরের মিতু চিরদিনের মতো ক্ষুধার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেয়ে যায়

 

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০০৪ দৈনিক প্রথম আলো ৷ এদিনের একটি সংবাদ শিরোনাম - "মা বললেন: ভাত নাই, বিষ খা; অভিমানি মেয়ে তাই করল!" মাদারীপুরের পোনাই হাজীকান্দি গ্রামের দরিদ্র মোতালেব মাতুববর ছ' মাস আগে দিন মজুরীর কাজ নিয়ে গ্রামের বাইরে যায় ৷ তার স্ত্রী চন্দ্রভানু বিভিন্ন বাড়িতে ঝি-য়ের কাজ করে দুই মেয়ে ও এক ছেলে নিয়ে কোন মতে দিনাতিপাত করে আসছিল ৷ গত কয়েকদিনের প্রবল বর্ষণে চন্দ্রভানু তার সন্তানদের জন্য কোন খাবার জোগাড় করতে পারেনি ৷ শিবচর হাসপাতালে চন্দ্রভানু জানায়, দু' দিন হাড়িতে রান্না চড়েনি ৷ সন্ধ্যায় ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করতে না পেরে রোমানা তার কাছে ভাত চায় ৷ তিনি রাগ করে তাকে বলেন, বিষ খেয়ে মরে যেতে ৷ সে রাতেই রোমানা ঘরে রাখা কীটনাশক পান করে

 

উপরের ঘটনা দু'টি ক্ষুধার শিকার হওয়া মানুষের নির্মম এবং চূড়ান্ত পরিণতি ক্ষুধার জ্বালায় আত্মহত্যা, নিজের সন্তানকে খুন করা, বিক্রি করে দেয়া - এ ঘটনাগুলো আমাদের কাছে আজ আর অচেনা নয় ৷ তবে অনুধাবন করা প্রয়োজন যে, এই ঘটনাগুলোর মধ্যে একটি সাদৃশ্য রয়েছে ৷ সেটি হচ্ছে - এই করুণ পরিণতির শিকার বেশীরভাগ ক্ষেত্রে মেয়েরা ৷ 'ক্ষুধা মেটাতে না পেরে বিষ খেয়েছে' - পুরুষদের ক্ষেত্রে এরকম সংবাদ সাধারণত পাওয়া যায় না ৷ একেবারে বিষ তুলে নেয়ার আগে তাদের আরও অনেক বিকল্প থাকে গ্রহণ করার মতো

 

প্রকাশিত দু'টি ঘটনায় নারী এবং কন্যাশিশুই যে মৃত্যুর নির্মম শিকার হলো, এটি কোন কাকতালীয় বিষয় নয় ৷ বরং স্বাভাবিক ৷ নারী সম্পর্কিত প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গির কারণে আমাদের সমাজে নারীরা গরীবদের মধ্যে সবচেয়ে গরীব, ক্ষমতাহীনদের মধ্যে সবচেয়ে ক্ষমতাহীন এবং ক্ষুধার্তদের মধ্যে সবচেয়ে ক্ষুধার্ত ৷ যুগ যুগ ধরে বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার নারীরা যে কোন দুযোর্গেই  সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত হয় - সে দুযোর্গ প্রাকৃতিক বা মানবসৃষ্ট যাই হোক না ৷ আর আমরা এতে অভ্যস্তও ৷ কারণ চিন্তায় ও কর্মে, বিশ্বাসে ও আচরণে, জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতে আমরা অনেকটাই নারীর প্রতি অসহিষ্ণু - কোন কোন ক্ষেত্রে বিদ্বেষীও

 

নারীর প্রতি বঞ্চনার ইতিহাস সুপ্রাচীন ৷ আমাদের প্রবাদ-প্রবচন, উপকথাসমূহেও নারীর প্রতি এই বৈষম্য ও অবদমনের কাহিনী ছড়িয়ে আছে - যা নি:সন্দেহে বিরাজমান সমাজ ব্যবস্থারই প্রতিফলন ৷ হাজার বছরের পুরনো মহাস্থানগড়ের প্রাচীরচিত্রেও পুরুষ কতৃর্ক নারীকে নিপীড়নের চিত্র উত্‍কীর্ণ আছে ৷ চিত্রটি আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, নারীকে বঞ্চিত ও অবদমিত রাখতে আমরা আমাদের মেধা ও সৃজনশীলতার একটা বড় অংশ অন্যায়ভাবে অপব্যয় করেছি এবং করে চলেছি

 

শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের পাশাপাশি আমরা তৈরি করেছি 'আদর্শ নারী'র ধারনা, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নারী স্বার্থের অনুকূল নয় ৷ তারা 'লক্ষ্মী বধূ', 'লক্ষ্মী মেয়ে' হতে গিয়ে প্রতিনিয়ত চরম আত্মবঞ্চনার শিকার হচ্ছে ৷ 'সাত চড়ে রা করে না', খাবে সবার পরে, থাকলে খাবে, না থাকলে খাবে না - এ সবের মধ্য দিয়েই একজন নারী শৈশব থেকে তার জীবন শুরু করে ৷ দারিদ্র্য পীড়িত সমাজে এর পরিণতি ভয়াবহ হতে বাধ্য ৷ মনি, মিতু ও রোমানার মৃত্যুর করুণ কাহিনী চোখে আঙ্গুল দিয়ে আমাদেরকে তা স্মরণ করিয়ে দেয় ৷ তবুও আমাদের বোধোদয় হয় না!

 

মনি, মিতু ও রোমানার মত আত্মহননের কাহিনী প্রতিদিন না ঘটলেও ক্ষুধার কারণে মানুষের, বিশেষত শিশুদের মৃত্যু অহরহই ঘটছে ৷ মনিদের ক্ষুধা ছিল দৃশ্যমান, কিন্তু এর চেয়েও ভয়াবহ "অদৃশ্য বা নিরব ক্ষুধা"৷ বিশ্ব খাদ্য সংস্থার দেয়া তথ্য অনুযায়ী, সারা বিশ্বে প্রতিদিন ২৪,০০০ জনের এভাবে মৃত্যু ঘটে ৷ ইউনিসেফ, বিশ্বব্যাংক এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার মতে, বাংলাদেশে ক্ষুধাজনিত মৃত্যু সংখ্যা দৈনিক ৬০০-৭০০ ৷ এরা মূলত শিশু, অধিকাংশই কন্যাশিশু ৷ এ ধরনের মৃত্যু ঘটছে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর ৷ বঞ্চনা এবং পুষ্টিহীনতাই মূলত এর কারণ

 

ইউনিসেফের বিশ্ব শিশু পরিস্থিতি ২০০৪-এ দেয়া তথ্যানুযায়ী, ২০০২ সালে বাংলাদেশে ৫ বছরের নীচের ৩,২৩,০০০ শিশু অপুষ্টিতে ভোগে ৷ এরা নিরব ক্ষুধার (chronic persistent hunger‍) শিকার ৷ অপুষ্টি বা নিরব ক্ষুধা অদৃশ্য ঘাতক ৷ অপুষ্টির কারণে শিশুদের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা পুরোপুরি বিকাশ লাভ করে না ৷ ফলে ডায়রিয়ার মত সামান্য রোগেও শিশুরা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে ৷ আমাদের দেশেই প্রতি বছর প্রায় ২,৫০,০০০ শিশু ডায়রিয়ায় মৃত্যু বরণ করে ৷ তবে অপুষ্টি বা নীরব ক্ষুধায় মোট মৃত শিশুর মাত্র ১৯ ভাগ ডায়রিয়ার কারণে অকালে ঝরে পড়ে ৷ বাকিরা অন্যান্য রোগ-ব্যাধিতে মারা যায় ৷ যেমন, শ্বাস-প্রশ্বাস প্রণালীতে মারাত্মক ইনফেকশনে মারা যায় ১৯%, হামে ৭%, ম্যালেরিয়ায় ৫%, জন্মক্ষণে জটিলতার (perinatal) কারণে ১৮% এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক কারণে ৩২% ৷ আপাতদৃষ্টিতে এ সকল রোগ-শোক মৃতু্যর কারণ হলেও, এর নেপথ্যে রয়েছে পুষ্টিহীনতা বা নিরব ক্ষুধা

 

এ সকল মৃত্যু চরম অনাকাঙ্ক্ষিত ৷ এগুলোর পেছনে কোন দৈব কারণ নেই ৷ নেই কোন হানাহানি ৷ এসকল মৃত্যু নিরব 'গণহত্যার' সামিল ৷ অদৃশ্য ক্ষুধা যার ঘাতক ৷ ক্রমবর্ধমান ঐশ্বর্যশালী বিশ্বে এ নির্মম হত্যাযজ্ঞ মানবতার প্রতি এক চরম আঘাত

 

দৃশ্যমান ভয়াবহতা মানুষকে বেশী আলোড়িত করে ৷ পত্রিকার সংবাদ হওয়া একটি বা দু'টি মৃত্যু জনতাকে যতটা নাড়া দেয়, চোখের আড়ালে প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া অজস্র মৃত্যু ততটা যাতনা তৈরি করে না ৷ কিন্তু, বিষয়টি নিয়ে এখন গভীরভাবে চিন্তা করা প্রয়োজন ৷ নিরব ক্ষুধার ব্যাপকতা ও আগ্রাসী রূপটিকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করা প্রয়োজন

 

'অপুষ্টি' একটি নির্মম ও ভয়াবহ ঘাতক হলেও এর উত্‍স আমাদের অজানা নয় ৷ মূলত তিনটি কারণে পুষ্টিহীনতার সৃষ্টি হয়: প্রয়োজনীয় ক্যালরির অভাব, খাদ্যে প্রয়োজনীয় প্রোটিন ও মাইক্রো নিউট্রিয়েন্টের অভাব এবং পরজীবির আক্রমন ৷ পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে, সুস্থ জীবনের জন্য একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের প্রতিদিন ২২০০ ক্যালরির মতো প্রয়োজন ৷ তবে যারা বেশি শারীরিক পরিশ্রম করে তাদের ক্যালরির প্রয়োজন অপোকৃত বেশি ৷ খাদ্যের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ক্যালরি গ্রহণ না করলে পুষ্টিহীনতা সৃষ্টি হতে বাধ্য ৷ প্রয়োজনীয় ক্যালরির সাথে খাদ্যে যথাযথ পরিমাণ প্রোটিন ও অন্যান্য খনিজ পদার্থ (যেমন, আয়োডিন) থাকা আবশ্যক ৷ তা না হলে পেট পুরে খেয়েও মানুষ অপুষ্টিতে ভুগতে পারে ৷ এছাড়াও ক্রিমির মত পরজীবি গৃহীত খাদ্যে ভাগ বসানোর ফলে অপুষ্টির সৃষ্টি হয়

বিরাজমান ব্যাপক পুষ্টিহীনতার কারণে আমাদের দেশে অপুষ্টির একটি ভয়াবহ 'দুষ্টচক্র' সৃষ্টি হয়ে গিয়েছে ৷ নারীরাই মূলত এ দুষ্টচক্রের অনাগ্রহী বাহক ৷ জন্ম থেকেই বৈষম্যের শিকার হয় নারীরা ৷ শৈশবে তারা ছেলে শিশুদের থেকে কম খাবার পায়, কৈশোরে তাদের অধিকাংশ আবদ্ধ হয়ে পড়ে চার দেয়ালের মধ্যে ৷ তাদের বিকাশের সুযোগ রুদ্ধ করে দেয়া হয় ৷ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবা থেকে তারা হয় বঞ্চিত ৷ এরকম অপুষ্ট শরীর নিয়ে বয়:সন্ধিতে পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই অনেকের বিয়ে হয়ে যায় এবং বছর ফিরতে না ফিরতেই তারা জন্ম দেয় স্বল্প ওজনের অপুষ্ট শিশু ৷ নবজাতক কন্যাশিশুদের সংখ্যাগরিষ্ঠের জীবনক্রমও একইভাবে আবর্তিত হয় ৷ এইভাবে অপুষ্ট ও বঞ্চিত নারীরাই এ অদৃশ্য দুষ্টচক্রকে চলমান রাখে ৷ আর এর পরিণতি ভোগ করে সকল মানুষ - প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে, ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে

 

অপুষ্টির এই মাশুশুধতে গিয়ে পুরো জাতিই এগিয়ে যায় অনিবার্য পঙ্গুত্বের দিকে ৷ প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ১৯৩০-৮২ সাল নাগাদ ১২ বছর বয়স্ক বাংলাদেশী ছেলেদের গড় উচ্চতা ৭ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে ৷ স্বল্প ওজন নিয়ে জন্ম গ্রহণ করার ফলে ছেলে-মেয়েরা শারীরিকভাবে দুর্বল ও বুদ্ধিমত্তার দিক দিয়ে পিছিয়ে পড়ে ৷ ফলে জাতি তাদের উত্‍পাদনশীলতা থেকে বঞ্চিত হয় - সমাজের জন্য অনেকে বোঝা হয়েও দাঁড়ায় ৷ ১৯৯৮ সালে ইউনিসেফ দাবি করে, পুষ্টিহীনতার হার কমানো না গেলে পরবতীর্ দশ বছরে বাংলাদেশ ২,৩০০ কোটি ডলার উত্‍পাদনশীলতা থেকে বঞ্চিত হবে ৷ বিশ্বব্যাংকের এক সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, অপুষ্টির কারণে বাংলাদেশকে প্রতি বছর আনুমানিক ১ বিলিয়ন ডলার সমতুল্য ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়

 

ক্ষুধার বিরুদ্ধে মানুষের লড়াই নিরবচ্ছিন্ন ও সর্বকালের ৷ এর থেকে পরিত্রাণের কোন দ্রুত ও সহজ উপায় নেই ৷ নেই কোন ম্যাজিক ফর্মুলা ৷ এর জন্য প্রয়োজন প্রচলিত কাঠামো বদলানোর মত দুরূহ সমস্যার সমাধান ৷ তবে যে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটিতে আমরা চাইলেই বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারি, তা হচ্ছে নারীর প্রতি বঞ্চনা ও বৈষম্যের অবসান ৷ কন্যাশিশুদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি ও তাদের বিকাশের জন্য সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা ৷ আমাদের সনাতন পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিকতার পরিবর্তনের মাধ্যমেই এক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে

 

আমাদের প্রত্যাশা - সকলের সম্মিলিত প্রয়াসে নিশ্চয়ই সেই সমাজ আমরা গড়তে পারবো, যেখানে দুখিমন কিংবা চন্দ্রভানুর মতো মায়েরা তাদের প্রাণপ্রিয় সন্তানের হাতে বিষের পাত্র তুলে দিতে বাধ্য হবে না; যেখানে মনি ও মিতুরা ফুটে ওঠার আগেই জীবনের অসহায় নির্মমতায় ঝরে যাবে না, যেখানে কিশোরী রোমানার দুরন্ত অভিমান মৃত্যু অন্ধকারে মুক্তি খুঁজবে না ৷ সেই সমাজ গড়ে তোলার দায় আমাদের সকলের ৷ সেই দায়বদ্ধতাবোধ সৃষ্টিই কন্যাশিশু দিবস পালনের মূল আকাঙ্ক্ষা

Previous Article<Index>Next Article


Home  / Feedback

© 2005 The Hunger Project-Bangladesh. All rights reserved.