|
হতাশাবিজয়ী দেলোয়ার
'মা হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্ট' এই রকম নামের খাবার হোটেল বাংলাদেশে অনেক থাকতে পারে
৷ কিন্তু ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের এই হোটেলটি সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী
৷ হোটেলের যাবতীয় রান্নার কাজটি করেন মা, বাবা সহযোগিতা করেন রান্নায়
৷ তাদের দুই সন্তান খাদ্য পরিবেশন এবং ক্যাশের দায়িত্ব পালন করেন
৷ সার্বিক পরিকল্পনা ও পরিচালনায় শক্ত হাতে হাল ধরে রাখেন মেজ ছেলে দেলোয়ার হোসেন
৷ পরিবারের নিজেদের খাদ্য যোগানোর কাজটিও চলে হোটেল থেকেই, তাদের জন্য আলাদাভাবে কোন রান্না হয় না
৷ অত্যন্ত পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশে স্বল্পমূল্যে তৃপ্তিদায়ক খাবার পরিবেশনই এই হোটেলের মূল লক্ষ্য
৷
একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষিত ছেলে দেলোয়ার যখন এই হোটেলের কাজ শুরু করেন তখন চারদিকে অনেক সমালোচনা শুরু হয়েছিল
৷ কারণ মফস্বলে এই ধরনের খাবার হোটেল পরিচালনা করে সাধারণত লেখাপড়া না জানা দরিদ্র শ্রেণীর মানুষ
৷ উল্লেখিত প্রচলিত সামাজিক ধিক্কারকে অভিহিত করা যায় সামাজিক বাধা বলে
৷ কিন্তু এই বাধা দেলোয়ারের আত্ম-উন্নয়নের পথচলাকে রুখে দিতে পারে নি
৷ ব্যর্থতা ও হতাশার কয়েকটি প্রান্তরকে পাড়ি দিয়ে ২০০৪ সালের জানুয়ারি মাসের ৭ তারিখ শুভ উদ্বোধন ঘোষিত হয় 'মা হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্ট'-এর
৷ ধিক্কার, লজ্জা কোন কিছুই যে বাধা হতে পারলো না হোটেল মালিক দেলোয়ারের জীবনে তার পিছনে একটি ছোট্ট ইতিহাস আছে
৷
দীর্ঘদিন ধরে নানান পদ্ধতিতে অস্তিত্বের সংকট থেকে উত্তরণের আকাঙ্ক্ষায়, আর্থিক সাফল্য অর্জনের লক্ষ্যে দেলোয়ার হোসেন বিভিন্নমুখী পথ অনুসন্ধান করছিলেন, তীব্র চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন
৷ কিন্তু মধ্যবিত্তের সাদা পোষাকী 'ভদ্রকর্মে'র ক্ষতিকর পোকাটিকে কিছুতেই মাথা থেকে তাড়াতে পারছিলেন না দেলোয়ার
৷ ফলে হতাশার সঙ্গে যুক্ত হয় হীনমন্যতা
৷ এই হতাশা ও হীনমন্যতার বিবর থেকে তাকে মুক্ত করে দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-বাংলাদেশ-এর 'উজ্জীবক প্রশিক্ষণ'
৷ ২০০৩ সালে নবীনগর উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত চার দিনের উজ্জীবক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দেলোয়ারের মাথা থেকে কর্মের ভেদাভেদ বা কর্মের আভিজাত্য সংক্রান্ত জটিলতার পোকাটি পালিয়ে যায়
৷ জেগে ওঠেন দেলোয়ার
৷ প্রচলিত চিন্তাপ্রক্রিয়ার বেড়াজাল ছিন্ন করে পরিবারের সবাইকে নিয়ে যৌথভাবে পথ চলার সিদ্ধান্ত নেন
৷ ব্যাংক থেকে ২৫ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে চালু করেন 'মা হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্ট'
৷
সবার 'খারাপ নজর' উপেক্ষা করে হোটেলটি আজ ভালই চলছে
৷ সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে
৷ কিন্তু এখানেই থেমে নেই দেলোয়ার
৷ কারণ বাবা-মা ছাড়াও রয়েছে তার নিজের স্ত্রী ও সন্তান
৷ রয়েছে তাদের ভবিষ্যত্
৷ তাই হোটেলের পাশেই 'মনিরা টেলিকম সেন্টারে' কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে কাজ শুরু করেন দেলোয়ার
৷
আত্ম-উন্নয়নে, আত্মনির্ভরশীল হওয়ার পথে পরিশ্রম, বিকল্প পথ এবং বহুপথমুখী হতে দেলোয়ারকে মূলত অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে চার দিনের উজ্জীবক প্রশিক্ষণ
৷ দেলোয়ার কৃতজ্ঞতার সঙ্গে সেই চার দিনের ট্রেনিং-এর কথা স্মরণ করেন
৷ তিনি মনে করেন, এই প্রশিক্ষণ তার মত যে কোন মানুষকে জাগিয়ে তুলতে সক্ষম
৷ বর্তমানে দেলোয়ার অন্যদেরকে উত্সাহিত করেন প্রশিক্ষণ গ্রহণে
৷ গ্রামে গ্রামে উঠান বৈঠক পরিচালনা করে মানুষকে একতাবদ্ধ হয়ে উন্নয়নের কাজে ঝাপিয়ে পড়ার প্রেরণা যোগান ৷ স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা ব্যবহার, যৌতুক প্রতিরোধ, বাল্যবিবাহ রোধ ইত্যাদিই তাদের উঠান বৈঠকের আলোচনায় প্রাধান্য পায় ৷ এলাকার উজ্জীবকদের সংগঠিত করে সামাজিক সমস্যার সমাধানে কাজ চলতে থাকে দেলোয়ারের নেতৃত্বে ৷ তাদের উদ্যোগে গ্রামে অন্তত ১০টি পরিবার বাড়িতে স্বাস্থসম্মত পায়খানা স্থাপন করেছে ৷ গ্রামের মানুষদের সাথে নিয়ে পরিচালনা করেছেন পরিচ্ছন্নতা অভিযান ৷ ব্যক্তিগত উদ্যোগে নিজের বাড়িতে এবং গ্রামের রাস্তায় গাছের চারা লাগিয়েছেন ৷ এখন আর শুধু ব্যক্তিগতভাবে নয়, বরং এলাকার মানুষদের সাথে নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে চান দেলোয়ার ৷
আজকের সচেতন, সাহসী ও পরিশ্রমী দেলোয়ার একসময় এরকম ছিলেন না ৷ বাবা খলিলুর রহমান মিল্লাত ফ্যান কোম্পানীতে ছোট খাট চাকুরি করতেন ৷ স্বল্প আয়ের সংসারে সাধারণভাবেই চলছিল তাদের জীবন যাপন ৷ গ্রামের আর দশটি ছেলের মতোই গতানুগতিক জীবন ছিল দেলোয়ারের
৷ ১৯৯৫ সালে পিতার চাকুরি চলে যাওয়ায় পরিবারটি সংকটে পড়ে ৷ মাত্র ১৭ বছর বয়সে ২০০০ সালে দেলোয়ার এসএসসি পরীক্ষার্থী অপরিণত বয়স্ক খালেদা নামের একটি মেয়েকে একক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই বিয়ে করেন ৷ কারণ প্রণয় ঘটিত ৷ অপ্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ায় মেয়ের বাবা অপহরণ মামলা করে ৷ মামলায় প্রচুর আর্থিক ক্ষতির পরও দু'মাসের জেল হয় দেলোয়ারের ৷ এত ঝড়ঝাপটার পরও ২০০২ সালে এইচএসসি পাশ করেন ৷ চালিয়ে যান জীবন সংগ্রাম ৷ দীর্ঘ সংগ্রামের পর উজ্জীবক দেলোয়ার আজ একজন হতাশাবিজয়ী আত্মনির্ভরশীল মানুষ ৷
- মোখলেসুর রহমান সাগর
|