|
সত্তুর বছরের তরুণ মনমোহন বর্মণ
বাংলাদেশের অন্য দশ-পাঁচটি গ্রামের মতোই একটি গ্রাম পূর্ববেজ
৷ সীমান্ত জেলা লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার প্রাকৃতিক সম্পদপূর্ণ পূর্ববেজ গ্রামটি এখন স্থানীয় সম্পদ
ব্যবহারে আগের চেয়ে অনেক বেশি তত্পর ৷ বাদাম, ভুট্টা, ধান, আখ, পাট প্রচুর পরিমাণে জন্মে ৷ কিন্তু এতসব প্রাকৃতিক সম্পদ থাকা সত্ত্বেও গ্রামটির পরিচয় ছিল অভাব ও দরিদ্র্যপীড়িত গ্রাম হিসেবে ৷ সঠিক পরিকল্পনা, নিজেদের প্রচেষ্টা আর দৃঢ় সংকল্পবোধের ঘাটতিই ছিল তাদের এই অভাবের অন্যতম কারণ ৷
হাতীবান্ধার দইখাওয়া ইউনিয়নের হাতীবান্ধা এস এস হাই স্কুলের ইংরেজী বিষয়ের প্রাক্তন শিক্ষক মনমোহন বর্মন ৷ স্কুলে শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি আলীমুদ্দীন ডিগ্রী কলেজ, হাতীবান্ধা ডিগ্রী কলেজ, ভবানীপুর সেপাতিয়া সিনিয়র মাদ্রাসা, দই খাওয়া আদর্শ মহাবিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবেও নিয়োজিত ছিলেন ৷ ১৯৯০ সালে তিনি স্কুলের চাকুরি থেকে অবসর নেন ৷ অবসর গ্রহণের পর একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ইচ্ছা ছিলো তার ৷ এ ইচ্ছা পুরণে নওদাবাসের প্রাক্তন চেয়ারম্যান অশনিক বাবু সহযোগিতার হাত বাড়ান ১০ শতক জমি দান করে ৷ ১৯৯১-৯২ সালে সেখানে মনমোহন অশনিক বাবুর পিতা তরণীমোহন বসুনিয়ার নামে 'তরণীমোহন বসুনিয়া বিদ্যানিকেতন' গড়ে তোলেন ৷ স্কুলের পাশাপাশি শিশুদের পড়াশোনায় মনোযোগী করতে সকাল ৭-৯টা তিনি শিশুদের সামান্য টাকার বিনিময়ে পড়ান ৷ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে এ বিদ্যানিকেতনকে গড়ে তোলেন আন্তরিক পরিশ্রমে ৷ তিনি স্কুলের শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলার পাশাপাশি স্কুলের প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায়ও সমান মনোযোগী ৷
মনমোহন বর্মণের বয়স প্রায় ৭০ বছর ৷ এই বয়সের একজন মানুষ সাধারণত কর্মজীবন শেষে সম্পূর্ণ অবসর জীবন কাটায় ৷ কিন্তু তিনি শারীরিক ভাবে বয়ষ্ক হলেও মনের দিক থেকে চির তরুণ ৷ তারুণ্যের কারণেই তিনি ঝাপিয়ে পড়েছেন সমাজকর্মে ৷ তার অন্তরে সুপ্ত থাকা তরুণ মনটিকে জাগ্রত করেছে একটি প্রশিক্ষণ ৷ ২০০৪ সালে দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-বাংলাদেশ পরিচালিত চারদিনের উজ্জীবক প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয় হাতীবান্ধায় ৷ নিজ ছেলে কমলকৃষ্ণ বর্মণকে নিয়ে এই প্রশিক্ষণে অংশ নেন মনমোহন বর্মণ ৷ 'ক্ষুধা মুক্তির আন্দোলন'- এ কথাটি তাকে আকৃষ্ট করেছে এবং ভাবিয়েছে ৷ তার মতে, ক্ষুধা দু'ধরনের - একটি পেটের ক্ষুধা আর অপরটি মনের ক্ষুধা ৷ আমাদের অঞ্চলটি বিভিন্ন প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ ৷ কিন্তু অভাব মিটছে না
৷ এই অভাব বা ক্ষুধা নিবৃত্তির পথ পাওয়ার জন্যই প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করেছি ৷ মানুষের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি করে সকলে দলবদ্ধভাবে কাজ করা আর নিজের কাজটি নিজে করার মানসিকতা তৈরি করা - এই কথাগুলো প্রশিক্ষণ থেকে খুব ভালোভাবে আত্মস্থ করেছি ৷ এখন এ পথকে ক্ষুধা নিবারনের পথ হিসেবে অনুসরণ করব ৷
২০০৪ সালের ডিসেম্বর মাসে উজ্জীবক মোনমোহন বর্মণ, সেকেন্দার আলী, কমলকৃষ্ণ বর্মণ, হোসেন আলী, হাওয়া বেগম, পারভীন - এরা সবাই মিলে টংভাঙ্গা, গোতামারী, ভেলাগুড়ি ইউনিয়নের পাড়ায় পাড়ায় ২৫টি বৈঠক করে ৷ প্রতিটি বৈঠকে ৬০ জনের মতো মানুষ উপস্থিত ছিলো ৷ বৈঠকের বিষয়বস্তু ছিলো মূলত স্যানিটেশন ৷ এসব এলাকার মানুষের অনেকেই আর্থিক সঙ্গতি থাকা সত্ত্বেও স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা ব্যবহার করত না ৷ তাদের স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা ব্যবহার করার প্রয়োজনীয়তা এবং কত কম খরচে এটা তৈরি করা সম্ভব তা তিনি বৈঠকগুলোতে তুলে ধরেন ৷ যাদের স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা তৈরির সঙ্গতি নেই তাদেরকে সুধীর নামের একজন উজ্জীবক গ্রাম থেকে বাঁশ যোগাড় করে দিয়ে সহযোগিতা করেছেন ৷ যেসব গ্রামের অধিকাংশ মানুষ আগে বাইরে মলত্যাগ করতো উজ্জীবকদের সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণায় সেখানে বর্তমানে শতকরা ৭০/৮০ ভাগ মানুষ স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা ব্যবহার করে ৷ এভাবে মনমোহন বর্মনের নেতৃত্বে উজ্জীবক ও গ্রামবাসীরা মানুষকে জাগিয়ে তোলার মাধ্যমে স্থানীয় সমস্যাগুলো একে একে সমাধান করার লক্ষ্যে কাজ করছে ৷
নওদাবাস ও টংভাঙ্গা ইউনিয়নের বিভিন্ন পাড়ায় নিজে গিয়ে উজ্জীবকদের সাথে উঠান বৈঠক করে প্রত্যেক উজ্জীবককে বসত বাড়ি ও পরিত্যক্ত জায়গায় ৫টি করে গাছ লাগানোর আহ্বান জানান তিনি ৷ তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে অনেকেই গাছ লাগিয়েছে ৷ মনমোহন নিজের বাড়িতেও লাগিয়েছেন আম, কাঠাল, মেহগনি, নিম, শিশু, কড়াই-এর ১০০টি গাছ৷ তারই অনুপ্রেরণায় তরণীমোহন বসুনিয়া বিদ্যানিকেতনের ছাত্র-ছাত্রীরা সাধ্যানুযায়ী ৫ থেকে ১০ টাকা চাঁদা তুলে স্কুল প্রাঙ্গনে ৫০টি গাছ লাগিয়েছে ৷ এছাড়াও তিনি নারীদের নিয়ে বৈঠক করে মা-মেয়েদের উদ্বুদ্ধ করেছেন হাঁস-মুরগী পালন, বাড়িতে সবজি চাষ প্রভৃতির মাধ্যমে পুষ্টির অভাব পূরণের বিষয়ে ৷ ঘরে থেকেও কীভাবে সংসারের আয়বৃদ্ধিতে সহযোগিতা করা যায় সে কথাও বুঝিয়েছেন তাদের ৷
নিজ এলাকা নওদাবাসের টংভাঙ্গায় মনমোহন স্থানীয় শিল্পীদের নিয়ে একটি সংগঠন গড়ে তুলেছেন ২০০৫ সালের শুরুতে ৷ এই শিল্পী গোষ্ঠী বৃক্ষরোপণ, স্যানিটেশন, শিশুদের স্কুলে পাঠানোর মতো সামাজিক বিষয়গুলো নিয়ে গান ও নাটক করে গ্রামবাসীদের সমস্যাগুলো সমাধান করতে উদ্বুদ্ধ করে৷ মনমোহন নিজেও দু'টি নাটক লিখেছেন এসব বিষয়বস্তুর নিয়ে ৷
সত্তুর বছরের বৃদ্ধ মনমোহন বর্মণ হাতীবান্ধার যে ইউনিয়নেই উজ্জীবক প্রশিক্ষণ হোক না কেন এখনও সাইকেল চালিয়ে উপস্থিত হন ৷ প্রত্যেকটি সামাজিক কাজেই রয়েছে তার প্রাণবন্ত উপস্থিতি ৷ কোন ক্লান্তি তাকে স্পর্শ করতে পারে নি
৷ আজীবন মানুষের মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী এই প্রবীন শিক্ষক তার দীর্ঘ জীবনের প্রান্তে এসে উজ্জীবিত হয়েছেন আত্মশক্তি ও সামাজিক দায়বদ্ধতার চেতনায় ৷ তাই একক প্রচেষ্টায় সীমাবদ্ধ না থেকে এলাকার মানুষকে সংগঠিত করে, নেতৃত্ব দিয়ে এলাকার উন্নয়নে কাজ করে চলেছেন ৷ এই কর্মোদ্দীপনা তাকে দিয়েছে এক নতুন জীবনের সন্ধান ৷ একই সাথে মানুষের কল্যাণে তার এই নিবেদিত প্রচেষ্টা অন্যদের মাঝেও জন্ম দিচ্ছে দৃঢ় প্রত্যয় ৷ এই পথেই এগিয়ে যাবে হাতীবান্ধা, এই পথেই এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ ৷
- আসমা আইয়ুব বেবী
|