পূর্বাঞ্চল
জ্জীবক বার্তা, বর্ষ-, সংখ্যা-২৬, ফেব্রুয়ারী-মার্চ ২০০৬
 

কলমাকান্দার নারী : চিরদিন পুরুষের থাকা একুশ এই প্রথম তাদের হলো


একুশ আসে ৷ একুশ চলে যায় ৷ আমাদের নেতা-নেত্রী, বুদ্ধিজীবী এবং শহরের মানুষেরা মহাসমারোহে দিনটি উদ্যাপন করে নির্বিঘ্নে, কোন ধরনের বাধার মুখোমুখি না হয়েই ৷ রাষ্ট্র, প্রশাসন যন্ত্র ও পুলিশ বাহিনী সবসময় ব্যস্ত থাকে যেন কোন অনাকাঙ্ক্ষিত সমস্যার সৃষ্টি না হয় ৷ একুশে ফেব্রুয়ারি পালন করা সম্ভব হবে কি হবে না - এই দোলাচলে, চিন্তায়ও তাই থাকবার প্রয়োজন হয়না তাদের

কিন্তু এটা বাংলাদেশের সব জায়গার বাস্তবতা নয়
৷ কোথাও কোথাও, কারো কারো জন্য, বিশেষত নারীদের জন্য একুশ উদযাপন এখনো অনেক দূরের ব্যাপারই রয়ে গেছে ৷ জেলা পর্যায়ে হয়তো কিছুটা চোখে পড়ে, কিন্তু শতকরা আশিভাগ মানুষের বসবাসের জায়গা গ্রামাঞ্চলে একুশে ফেব্রুয়ারি সেভাবে উদ্যাপিত হয় না বললেই চলে ৷ অল্প কিছু জায়গায় যদিও উদযাপিত হয় তার সবই 'আবদ্ধ' থাকে পুরুষের হাতে; নারীদের নিজেদের সংগঠিত হয়ে উদযাপন চোখেই পড়ে না ৷ নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার চিত্রও ছিল এমনই ৷ এ প্রসঙ্গে একজন নারী বলছিলেন, "কবে কখন যে একবার আমি শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা ভরে ফুল দিয়েছিলাম, সেটা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম"৷ অন্য নারীদের অভিজ্ঞতাও এমনই ৷ তবে এবার সে চিত্র বদলে গেছে ৷ এ বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি কলমাকান্দার সাধারণ নারীরা তাদের অসাধারণ তত্‍পরতায় প্রমাণ করলেন নারীরা জোটবদ্ধ হলে পর্বত সমান বাধাও কত সহজেই বালির বাধের ন্যায় ধ্বসে পড়ে!

দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-বাংলাদেশ এর নারী নেতৃত্ব বিষয়ক প্রশিক্ষণের অনুপ্রেরণা ও অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের তত্‍পরতায় উজ্জীবিত কলমাকান্দার নারীদের মনে নতুন প্রত্যয় জন্ম নেয় ৷ তারা এ বছরই প্রথম সিদ্ধান্তে পৌঁছান - না এ রকম আর চলতে দেয়া যায় না, নারীরা নিজেরাই ২১ ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে কর্মসূচি হাতে নেবে ৷ কিন্তু কিভাবে? নিজেদের উদ্যোগেই দি হাঙ্গার প্রজেক্ট, বাংলাদেশ মহিলা সমিতি ও অন্যান্য বন্ধু সংগঠনগুলোর সাথে তারা কথা বলেন ৷ সবার সাথে আলোচনার ভিত্তিতে সকলে মিলে এমনভাবে একুশ পালনের সিদ্ধান্তে পৌঁছান, যা 'নারীরা কিছু পারেনা' এই ধ্যান-ধারণাকে বদলে দেবে ৷

শুরু হল প্রস্তুতি ৷ বাড়ি বাড়ি যেয়ে ও বিভিন্ন গ্রামীণ সম্পর্ক ব্যবহার করে একুশে ফেব্রুয়ারির তাৎপর্য এবারের একুশে ফেব্রুয়ারি উদ্যাপন নিয়ে তাদের পরিকল্পনা জানানো শুরু হয় ৷ নারীদের অংশগ্রহণের জন্য অনুপ্রাণিত করা হয় ৷ ব্যাপক সাড়া তৈরি হয় পুরো এলাকা জুড়ে, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার মাঝে ৷ তারা যেন এমন একটা কিছুরই অপেক্ষা করছিলেন ৷ সেই সাথে ছিল প্রবল প্রতিবন্ধকতা ৷ এই নারী জাগরণের কাজে নেতৃত্বের ভূমিকায় ছিলেন উজ্জীবক লিপি আক্তার ৷ তার সাথে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন রিণা সাহা, শিপ্রা পাল প্রমুখ৷ তবে লিপিকেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রশ্ন-সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছে ৷ "অমুক বাড়ির মেয়ে হইয়া তুমি এইসব কি কইরা বেড়াইতেছ"? কতবার যে এইসব কথা লিপিকে শুনতে হয়েছে! তবু লিপির মত নারীরা ভেঙ্গে পড়েন নি, তারা তাদের কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন ৷

নারীদের সংগঠিত হবার খবরে কোন কোন মহল আতংকিত হবে এটাই তো স্বাভাবিক ৷ কলমাকান্দার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হবে কেন! তাদের উদ্যোগকে ভেবেই যেন ২০ ফেব্রুয়ারি রাতেই আয়োজন করা হয় ওয়াজ মাহফিলের ৷ সেদিন সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে একদিকে শুরু হয়ে যায় ওয়াজ মাহফিলের বয়ান, অন্যদিকে নারীরা নিতে থাকেন পরের দিন সকালে যে প্রভাতফেরী অনুষ্ঠিত হবে তার জন্য প্রস্তুতি ৷

রাতে যখন পরের দিন ২১ ফেব্রুয়ারি উদযাপনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে ঘুমানোর জন্য গিয়েছেন লিপি ততক্ষণে ওয়াজ মাহফিলে শুরু হয়ে গিয়েছে চরম নারীবিদ্বেষী কথাবার্তা ৷ রাত যত গভীর হয় নারীবিদ্বেষী কথাবার্তাও তত বাড়তে থাকে ৷ আর নির্ঘুম লিপি ভেতরে ভেতরে ছটফট করতে থাকেন - চুপ করে বসে থাকবেন নাকি অন্যায় ভাষণের প্রতিবাদ করবেন - এই ভেবে ভেবে ৷ গত্‍বাঁধা 'নিশ্চুপ নারী'র প্রচলিত ইমেজ ভেঙ্গে 'সক্রিয় নারী' লিপি হঠাত্‍ করেই উঠে দাঁড়ান বিছানা ছেড়ে, জোর কদমে হেঁটে পৌঁছান ওয়াজের জমায়েতে ৷ প্রথমেই পরিচিত ঈমামকে বলেন, "চাচা আপনি এখনই নারীবিদ্বেষী আপত্তিকর বক্তব্য থামাতে বলেন, না হলে কিন্তু আমি মঞ্চে উঠে এগুলোর বিরুদ্ধে কথা বলা শুরু করবো"৷ লিপির এই আকস্মিক বিরোধীতা এবং তার সাহস ও দৃঢ়তার খবর মঞ্চ অবধি পৌঁছলে অবশেষে থেমে যায় নারীদের নিয়ে গত্‍বাঁধা প্রতিক্রিয়াশীল কথাবার্তা ৷

লিপি যেভাবে ঘটনার সাথে সাথে তাত্‍ক্ষণিক বিরোধীতার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সেটা নিঃসন্দেহে চিন্তার ক্ষেত্রে অগ্রসর অবস্থানের ইঙ্গিত বহন করে ৷ দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-বাংলাদেশ এর নারী নেতৃত্ব বিষয়ক প্রশিক্ষণ সারা দেশে এক দল নারী নেত্রী তৈরির যে বৃহত্‍ কর্মসূচি নিয়ে সামনে এগিয়ে চলেছে এই লিপি তাদেরই একজন ৷ নেত
ত্বের একটি বড় সূচক যদি হয় সময়, পরিস্থিতি ও প্রেক্ষিতের সাপেক্ষে নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, তবে সেটা যে নারীরা আজকে অর্জন করতে পারছেন তার বড় প্রমাণ লিপির এই সাহসী দৃষ্টান্ত ৷ শুধু নারীদেরই নয় সমাজের ও রাষ্ট্রের নানা অসংগতিতে চুপ করে থাকা 'বোবা' বুদ্ধিজীবীদেরও 'সময়ের দাবি ও সে অনুযায়ী কর্তব্য নির্ধারণ' বিষয়ে শেখবার আছে লিপির মত এই প্রান্তিক নারীদের কাছ থেকে ৷


এটা সহজেই প্রমাণিত হয় যে, কলমাকান্দার নারীদের, বিশেষত লিপির, একটা স্পষ্ট উপলদ্ধির জায়গা তৈরি হয়েছে ৷ যার ভিত্তিতে তারা সহজেই নিজের অন্তরের সাথে কথা বলে নারী হিসেবে, মানুষ হিসেবে কোন একটা সমস্যায় 'আমাকে কি করতে হবে' এই সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারছে ৷ একটি পিতৃতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত সমাজে ঘুম ভেঙ্গে দাপটশালী পুরুষেরা যদি দেখেন শতশত নারীর অভূতপূর্ব জমায়েত, তাহলে পুরুষদের মনে কী প্রতিক্রিয়া হবে বা হতে পারে মনস্তত্বের সে নিরীক্ষায় যাচ্ছিনা ৷ শুধু এই তথ্য দিয়ে উপসংহার টানতে চাই - ২১ ফেব্রুয়ারির প্রভাতফেরীতে লিপি আক্তার, রীনা সাহা, শিপ্রা পাল, নওরোজ, চায়না রায়, সাবিহা আক্তার, সুভাষিণী দেবীর নেতৃত্বে পাঁচ শতাধিক মানুষের, যার প্রায় সবাই নারী, জোটবদ্ধ পদচারণায় মুখর করে তুলেছিলেন কলমাকান্দার সব অলিগলি পেরিয়ে শহীদ মিনার পর্যন্ত৷ পর্দার বেড়াজাল বা মাঝরাত থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টির দূর্দমনীয় প্রবাহ কোনকিছুই ঠেকাতে পারে নি এতগুলো নারীর অন্তর থেকে আসা ঢেউয়ের সম্মিলিত শক্তিকে ৷

এ ঘটনা কলমাকান্দার নারীদের সম্মিলিত অর্জন৷ তারাও যে অনেক কিছু করতে পারেন দেখিয়ে দিয়েছেন এই সংগ্রামী নারীরা ৷ এটি তাই তাদের জন্য সুখস্মৃতি, সুখস্মৃতি কখনো কখনো মানুষকে সুখের কান্নায় ভাসায়, হয়তো সেকারণেই ময়মনসিংহে বসে ঘটনা বর্ণনার সময় ডুকরে কেঁদে উঠেছিলেন, প্রথমে রীনা সাহা, পরে লিপি আক্তার ৷


- নাদিমূল হক মণ্ডল

Previous Article<Index>Next Article


Home  / Feedback / Subscribe

© 2006 The Hunger Project-Bangladesh. All rights reserved.