|
নারীর নেতৃত্বে সূচিত জাগরণ
"নারীরাই ক্ষুধামুক্তির মূল চাবিকাঠি" - এ চেতনাবোধের ভিত্তিতে একটি গণজাগরণ গড়ে তোলার প্রত্যাশায় দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে কাজ করে যাচ্ছে
৷ নারীর জন্য ইতিবাচক পরিবেশ নিশ্চিত করতে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি, বিভিন্ন স্তরের নারীদের সংগঠিত করা, অধিকার সচেতন করা, আয়বৃদ্ধিমূলক কাজের সাথে সম্পৃক্ততা সৃষ্টি, নারী নির্যাতনরোধে সক্রিয় ভূমিকা রাখা অর্থাত্ ব্যাপকার্থে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে
৷ এসব কাজের ধারাবাহিকতায় গত ২৪ - ২৬ জানুয়ারি ঢাকায় "নারী নেতৃত্ব বিকাশ" শীর্ষক প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয়
৷ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ৫৪ জন নারী এ প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করেন
৷ নারী-পুরুষের মধ্যকার বিরাজমান বৈষম্য, নারী নির্যাতন রোধকরণসহ দেশের ক্ষুধা-দারিদ্র্য দূরীকরণের লক্ষ্যে স্থানীয় পর্যায়ে নারীকে অগ্রাধীকার নিয়ে গণজাগরণ গড়ে তোলার কাজ করবে এই প্রশিক্ষিত নারীরা
৷
প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারীদের চেতনাগত পরিবর্তনের সাথে সাথে তাদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়
৷ তিন দিনের প্রশিক্ষণ শেষে ৫৪ জন নারী এলাকাগত ও ব্যক্তিগতভাবে নারী উন্নয়নের জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করেন
৷ প্রশিক্ষণের চেতনা ও উদ্দীপনাকে কাজে লাগিয়ে গত ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে নারী নেতৃগণ স্থানীয় পর্যায়ে অনেকগুলি কাজে সফলতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন
৷ নিচে কয়েকজন নারী নেত্রীর সফলতা ও সংগ্রামের কথা সংক্ষিপ্তাকারে উপস্থাপন করা হল:
ফেরদৌসি বেগম
চাঁদপুরের হাইমচর এলাকার আলগী দূর্গাপুরের অধিবাসী ফেরদৌসি বেগম
৷ ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য এই নারী বর্তমানে সমাজসেবা অধিদপ্তরে কাজ করেন
৷ পাশাপাশি নিজের বাড়িতে স্কুলগামী ছোট ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া করান
৷ তিনি এলাকায় নিয়মিত বাল্যবিবাহ ও যৌতুক বিষয়ে কর্মশালা পরিচালনা করেন ৷ গত ফেব্রুয়ারিতে তিনি জানতে পারেন তার কাছে পড়তে আসা কমলাপুর গ্রামের ১০ বছর বয়সের একটি মেয়ের বিয়ে ঠিক করা হয়েছে ৷ এলাকার প্রাইমারী স্কুলে পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্রী শিল্পীর বিয়ের কথা শুনে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ তিনি ৷ সংবাদ শোনার সাথে সাথেই নিজের করণীয় নির্ধারণ করেন ফেরদৌসি ৷ তিনি প্রথমে মেয়েটির বাবা-মা'র সাথে আলোচনা করেন ৷ বাল্য বিবাহের কুফল সম্পর্কে তাদেরকে বোঝাতে চেষ্টা করেন ৷ অনুরোধ করেন ছোট্ট মেয়েটির
বিয়ে না দেওয়ার ৷ কিন্তু মেয়ের বাবা মোঃ হারুন এ বিষয়ে ফেরদৌসির কথা বলার অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং অনধিকার চর্চার অভিযোগ করেন ৷
অগত্যা ফেরদৌসিকে ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করতে হয় ৷ বিয়ে বন্ধ না করলে তিনি আইনী ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানান ৷ এলাকার আরও কিছু মানুষকে তিনি এ কাজে সম্পৃক্ত করেন ৷ তার দৃঢ় প্রতিরোধের কারণে এক পর্যায়ে বাবা-মা বিয়ে বন্ধ করতে বাধ্য হন ৷ এ ঘটনার পরে মেয়েটির অভিভাবকরা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে ফেরদৌসির কাছে ক্ষমা চান এবং ভবিষ্যতে বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে কাজ করবেন বলে অঙ্গীকার করেন ৷ ফেরদৌসির বাল্যবিবাহ রোধের এই সাহসী উদ্যোগ এলাকায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে ৷
সুফিয়া বেগম
সুফিয়া বেগম কুমিল্লা জেলার চান্দিনা থানার গল্লাই ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত আসনের মেম্বার ৷ আগেও তিনি এ আসনের মেম্বার ছিলেন ৷ পরিষদের নির্বাচিত মেম্বার হিসেবে দুইবারের কাজের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি দেখেছেন চেয়ারম্যান ও পুরুষ মেম্বারগণ নানাভাবে নারী মেম্বারদের কাজের ক্ষেত্রে বাধার সৃষ্টি করেন, এমনকি অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইউপি'র স্বাভাবিক কাজেও তাদের অংশগ্রহণ করতে দেন না ৷ ফলে নারী মেম্বারগণ এলাকার সমস্যা সমাধানে এবং উন্নয়নে কোন ভূমিকা রাখার সুযোগ পান না ৷ অনেক ক্ষেত্রে নারী মেম্বারগণ নিজেরাও জানেন না পরিষদের কাজে কোন কোন ক্ষেত্রে তাদের আইনগত অধিকার রয়েছে ৷ ফলে তারাও প্রতিবাদ করা থেকে নিজেদের বিরত রাখেন ৷
জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর চেয়ারম্যান ও পুরুষ সহকর্মীদের দ্বারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে বঞ্চনার শিকার হয়েছেন সুফিয়া বেগম ৷ কিন্তু তিনি প্রতিবাদ করেছেন এবং পরিবর্তন করেছেন গতানুগতিক চর্চার ৷ গত ফেব্রুয়ারিতে তার ৩ নং ওয়ার্ডে এলজিইডি'র প্রকল্পে এক কিলোমিটার দীর্ঘ একটি রাস্তা পূনঃনির্মাণের জন্য দেড় লক্ষ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয় ৷ তিনি ইউপি চেয়ারম্যানের কাছে প্রজেক্ট-এর চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ করার সুযোগ দাবি করেন ৷ তার জোড়ালো দাবির ফলে চেয়ারম্যান তাকে কমিটি তৈরি করে জমা দিতে বলেন ৷ তিনি ৩ নং ওয়ার্ডের শিক্ষক ইফাজ উদ্দীন এবং একজন সাবেক মেম্বারকে নিয়ে কমিটি গঠন করে কুমিল্লায় এলজিইডি অফিসে পাঠিয়ে দেন ৷ কিন্তু পরে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে স্বাক্ষর নেয়ার জন্য গেলে সেই শিক্ষক ও সাবেক মেম্বার দু'জনই স্বাক্ষর দিতে অস্বীকৃতি জানান ৷ একজন নারী সদস্য হিসেবে প্রজেক্ট-এর চেয়ারম্যান হওয়ার এখতিয়ার নেই বলে তারা সুফিয়াকে জানান ৷ একই সাথে তারা এই প্রজেক্ট-এর বিরুদ্ধে এলজিইডি মামলা করতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন ৷ এদের সাথে যুক্ত হয়ে ওয়ার্ডের পুরুষ মেম্বারও নানাভাবে বাধার সৃষ্টি করেন ৷ এলাকার উন্নয়ন কাজে ভূমিকা রাখার অদম্য আকাঙ্ক্ষায় সুফিয়া তাদেরকে আইনগত দিক বোঝানোর চেষ্টা করেন এবং তাকে সহযোগিতা করার অনুরোধ করেন ৷ অবশেষে ব্যর্থ হয়ে তিনি উপজেলা প্রকৌশলী অফিসে গিয়ে কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলেন, যোগাযোগ করেন জেলা এলজিইডি অফিসে ৷ সেখানে তিনি কর্মকর্তাদের বলেন যে, যেকোনো মূল্যে আমি প্রজেক্ট-এর কাজে সফল হতে চাই ৷ আমি এর মাধ্যমে এলাকাবাসীর কাছে নারী মেম্বারদের সাংবিধানিক অধিকার এবং নির্বাচিত নেতা হিসেবে তাদের যোগ্যতার প্রমাণ দিতে চাই ৷ তার দৃঢ় মনোবলের কাছে যাবতীয় প্রতিবন্ধকতা পরাজিত হয় ৷ তাকে সহযোগিতা করেন এলজিইডি'র
কর্মকর্তাগণ ৷ অবশেষে সফলভাবে কাজ শেষ করেন তৃণমূলের এই লড়াকু নারী নেত্রী ৷
মরিয়ম মান্নান
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার চুপুরিয়া মহিলা উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি মরিয়ম মান্নান
৷ গত ফেব্রুয়ারিতে তিনি সাতক্ষীরা আবাদের হাট মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে এসিড সন্ত্রাসের উপর বির্তক প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন
৷ বির্তকের বিষয় ছিল "জনসচেতনতার মাধ্যমেই এসিড সন্ত্রাস প্রতিরোধ সম্ভব"৷ অনুষ্ঠানে শিক্ষক, অভিভাবক, স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সদস্য, শিক্ষার্থীসহ মোট পাঁচ শতাধিক ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন
৷
মরিয়ম মান্নানের নেতৃত্বে ফেব্রুয়ারিতে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার লক্ষ্যে আবাদের হাট মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের সামনে র্যালি ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়
৷ আয়োজন দু'টিতে উপস্থিত ছিলেন ৩৯২ জন নারী ও ৩৫ জন পুরুষ
৷ র্যালি ও মানববন্ধনের পরে অনুষ্ঠিত সমাবেশে
পার্শ্ববর্তী বলাডাঙ্গা গ্রামের অধিবাসীরা সমবেত হয় ৷ সন্ত্রাস উপদ্রুত এই এলাকার ভীত-সন্ত্রস্ত মানুষদের এভাবে একত্রিত হওয়ার ঘটনা এবারই প্রথম ঘটল ৷ এই সফল আয়োজন এলাকায় সন্ত্রাস বিরোধী একটি সামাজিক আন্দোলনের সূচনা ঘটিয়েছে ৷
নারী ও শিশু পাচার রোধে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন মরিয়ম মান্নান ৷ এবছর ১৪ ফেব্রুয়ারি সাতক্ষীরার দিঘিরভাঙ্গা গ্রামে ১৩ বছর বয়সের এক কিশোরীকে ভারতে পাচারের জন্য নিয়ে আসা হয় ৷ পাচারকারী ডিপজলের বাড়িতে মেয়েটিকে আটকে রেখে মেয়েটিকে ধর্ষণ করা হয় ৷ এক পর্যায়ে তার কান্নার শব্দে এলাকাবাসীর মনে সন্দেহ হয় ৷ তারা মরিয়মকে সংবাদ দেন এবং ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ করেন ৷ গ্রামের মানুষদের সাথে নিয়ে তিনি দুই পাচারকারীকে ধরে ফেলেন ৷ 'জাতীয় মহিলা সংস্থা'র সহযোগিতায় তাদেরকে পুলিশের হাতে তুলে দেন এবং মামলা করেন ৷ ঘটনাটা এলাকায় ব্যাপক প্রভাব পড়ে ৷ বিভিন্ন পত্র পত্রিকায়ও ছাপানো হয় ৷
যুবায়দা গুলশান আরা স্মৃতি
গাইবান্ধা জেলার সাদুল্ল্যাপুর থানার ফরিদপুর ইউনিয়নে যুবায়দা গুলশান আরা স্মৃতি নারীদের উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করছেন ৷ জনগণকে সংগঠিত করার মাধ্যমে এলাকার উন্নয়নের জন্য তিনি ৫টি কর্মশালার আয়োজন করেন ৷ কর্মশালায় ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম থেকে ১৫০ জন অংশগ্রহণ করে ৷ নারীদের সংগঠিত করে সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখা এবং আয়বৃদ্ধির মাধ্যমে সাবলম্বিতা অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে ২১ জন নারীকে নিয়ে একটি নারী সংগঠন গড়ে তুলেছেন তিনি ৷ প্রতি সপ্তাহে সংগঠনের সভা অনুষ্ঠিত হয় ৷ সভায় সদস্যরা ১০ টাকা করে সঞ্চয় জমা দেন এবং নিজেদের ও এলাকার বিভিন্ন সমস্যা ও সেগুলো সমাধানের উপায় নিয়ে আলোচনা করেন ৷ এসব উদ্যোগের অংশ হিসেবে স্থানীয় জনগণের সচেতনতার জন্য সংগঠনের সদস্য ও উজ্জীবকদের অংশগ্রহণে ২৬ মার্চ স্যানিটেশনের উপর একটি নাটিকা প্রদর্শন করা হয় ৷ এছাড়াও স্মৃতি ও তার দুইবন্ধু বাল্যবিবাহ ও স্যানিটেশন বিষয়ে দু'টি নাটক লিখেছেন, যা বৈশাখী মেলায় প্রদর্শিত হয় ৷
সাজেদা পারভীন রুনু গাইবান্ধা পৌরসভার মহিলা কমিশনার ৷ নারীদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় তিনি অব্যাহত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন ৷ এর মাঝে গত ৫ মার্চ গাইবান্ধায় একটি প্রতিবন্ধী মেয়ে ধর্ষণের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেন ৷ গাইবান্ধার সকল সচেতন মানুষ এই ঘটনার প্রতিবাদে সোচ্চার ভূমিকা পালন করে ৷ সেই দিনই বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের অংশগ্রহণে মানববন্ধনের আয়োজন করা হয় ৷ রুনু এ আন্দোলনের পুরোভাগে থেকে নেতৃত্ব প্রদান করেন
৷ গাইবান্ধার সক্রিয় নারী সংগঠনগুলোকে একত্রিত করে আন্দোলন গড়ে তোলার মাধ্যমে প্রশাসনের উপর চাপ তৈরি করেন ৷ এলাকার বিভিন্ন স্তরের মানুষের সাথে আলোচনা করে জেলায় 'লোক মোর্চা কমিটি' গঠন করেন ৷
সাজেদা পারভীন রুনু ৫৭ জন নারী-পুরুষের অংশগ্রহণে 'সামাজিক উদ্যোক্তা দল' নামের একটি স্থানীয় সংগঠন গড়ে তোলেন ৷ এই সংগঠন গড়ে তোলার উদ্দেশ্য হচ্ছে জন্মনিবন্ধন, বাল্যবিবাহ, যৌতুকসহ বিভিন্ন সামাজিক সমস্যার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা ৷ এই সংগঠনে শিশুদেরকে যুক্ত করা হয় ৷ সংগঠনের প্রচেষ্টায় সচেতন এসব শিশু এলাকার বিভিন্ন জায়গায় বিচরণ করে ৷ কোথাও বাল্যবিবাহ বা যৌতুকের ঘটনা ঘটলে তারা সংগঠনের সদস্যদের জানিয়ে দেয় ৷ রুনুর নেতৃত্বে গাইবান্ধায় শুধুমাত্র নারীদের নিয়ে ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস
উদযাপন করা হয় ৷ ওই দিন গাইবান্ধা শহীদ মিনার চত্ত্বরে মহিলা অধিদপ্তরের সহযোগিতায় 'মুক্তিযুদ্ধে নারীর ভূমিকা' বিষয়ক একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয় ৷
- আসমা আইয়ুব বেবী, নাদীয়া হিরা ও কাজী ফাতেমা বর্ণালী
|