উত্তর অঞ্চল

জ্জীবক বার্তা, বর্ষ-, সংখ্যা-২৭, এপ্রিল - মে ২০০৬

 

উজ্জীবক স্বপন আজ অনুকরণীয় ব্যক্তি


গ্রামটির নাম দূর্গাপুর ৷ নাটোর জেলার গুরুদাসপুর উপজেলার বিয়াঘাট ইউনিয়নের এই গ্রামের সামনে দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে আত্রাই নদী ৷ চলনবিলের পশ্চিম কোল ঘেঁষে দুর্গাপুরের অবস্থান ৷ এই গ্রামেরই এক আত্মপ্রত্যয়ী যুবক ইমদাদুল হক স্বপন ৷ বাবা মোঃ একরামুল হক ভূমি জরিপকারী ৷ মা মোছাঃ মাজেদা বেগম গৃহিনী ৷ তিন ভাই বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়

আত্রাই নদী আর চলনবিলের বৈচিত্রের মতোই বৈচিত্রে ভরা স্বপনের ২৭ বছরের জীবন
৷ ছোটবেলায় তাকে নিয়ে বাবা-মা ও এলাকার অন্যদের অনেক প্রত্যাশা ছিল ৷ একদার সেই শান্ত, ভদ্র, মেধাবী ছেলেটি ২০০১ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাশের পর হঠাত্‍ই যেন বদলে যেতে থাকে ৷ দিনরাত এলাকার বন্ধুদের সাথে আড্ডা আর নানা দুষ্টামীর পরিকল্পনা করে সময় কাটে ৷ একসময় তার 'দুষ্টামী' পরিবর্তিত হয়ে 'অপকর্মে' রূপ নেয় ৷ মাথা থেকে দূর হয়ে যায় লেখাপড়া, পরিবার-পরিজন আর বড় মানুষ হওয়ার স্বপ্নের কথা ৷ কি এক ঘোরে যেন দিনগুলো কেটে যেতে থাকে

অন্যদের চোখ দিয়ে নিজেকে দেখার মতো মনের অবস্থা তখন স্বপনের ছিল না
৷ বাবা-মা প্রথমে কষ্ট পেতেন এবং ভালবেসে, শাসন করে ফেরাতে চেয়েছেন ৷ ক্রমাগত বিফল হতে হতে তারা এক সময় হতাশায় নিমজ্জিত হন, হাল ছেড়ে দেন ৷ এলাকার সবাই ভিন্ন চেখে দেখতে শুরু করে স্বপনকে ৷ নিয়ন্ত্রণহীন জীবনে ক্রমাগত অন্ধকারের দিকে এগিয়ে যেতে থাকেন তিনি ৷ স্বপনের কাছে এসবই ছিল নিয়তির মতো



কিন্তু নিয়তির অমোঘ বাঁধনে বাঁধা পড়েন নি স্বপন
৷ সম্পূর্ণ উল্টো পথের যাত্রী হয়েছেন, ইতোমধ্যে এগিয়েছেন অনেক দূর, এগিয়ে চলেছেন এখনও ৷ তার এই বদলে যাবার ঘটনাটি শুরু হয়েছিল ২০০৩ সালে ৷ নাটোরের গুরুদাসপুর সমাজসেবা অধিদপ্তরের আয়োজনে উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত উজ্জীবক প্রশিক্ষণে অংশ নেন স্বপন ৷ এ প্রশিক্ষণ স্বপনের জীবনকে প্রবাহিত করে ভিন্ন খাতে ৷ শুরুতে প্রশিক্ষণে উপস্থিত থাকাটাই বিরক্তিকর লাগতে থাকে তার কাছে ৷ কিন্তু অল্প সময় পরেই অবাক হয়ে লক্ষ করেন অংশগ্রহণকারী ও প্রশিক্ষক কেউই তাকে আলাদা চোখে দেখছে না ৷ চারপাশের সবার কাছ থেকে ক্রমাগত উপেক্ষা আর ঘৃণা পেয়ে অভ্যস্ত স্বপন প্রথমে বেশ অবাক হন ৷ পরে অনুভব করেন এখানে কাউকেই আলাদা চোখে দেখা হয় না, বরং সকল মানুষই সমান সম্ভাবনা বহন করে - এটাই এ প্রশিক্ষণের মূল চেতনা ৷ প্রশিক্ষকগণ যখন অত্যন্ত আগ্রহের সাথে নানা বিষয়ে তার মতামত জানতে চান এবং সবাই তার ভাবনাকে স্বীকৃতি দেয়, তখন নিজেকেই যেন অচেনা মনে হয় স্বপনের ৷ তার অন্ধকার জীবনে বিষয়টি গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করে ৷ নিজের সম্পর্কে ধারণা বদলে যাওয়ার পাশাপাশি প্রশিক্ষণের বিভিন্ন আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেন সমাজের একজন মানুষ হিসেবে সমাজের জন্যও তার অনেক কিছু করার আছে ৷ প্রশিক্ষণের একটি কথা তার ভেতরে যেন প্রদীপ জ্বালিয়ে দেয় - "আত্মশক্তিতে বলীয়ান ব্যক্তি কখনও দরিদ্র থাকতে পারেনা"৷

প্রশিক্ষণ থেকে ফিরে বাড়ি এসেই অন্যরকম জীবন গড়ার সংগ্রামে নিয়োজিত হন স্বপন ৷ প্রথমেই সিদ্ধান নেন লেখাপড়া শুরু করার ৷ কলেজে যাওয়া আর পড়াশোনায় মগ্ন হয়ে পড়েন একবারে ৷ বদলে যায় তার এতোদিনের অভ্যস্ত জীবন যাপনের ধরন ৷ প্রথমে অবিশ্বাস আর বিস্ময় নিয়ে তাকে লক্ষ করে পরিবারে ও এলাকার মানুষেরা ৷ তারপর একসময় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় ৷ আন্তরিক পরিশ্রমের ফলে ২০০৪ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা পাশ করেন স্বপন ৷ পরীক্ষা পাশের পর পরিবারের আর্থিক দায়িত্ব নেয়ার সিদ্ধান নেন তিনি ৷ তার ইচ্ছা ছিল কোন ঔষধ কোম্পানীতে চাকুরি করার ৷ কিন্তু মা-বাবা নতুন করে ফিরে পাওয়া প্রিয় সন্তানকে দূরে যেতে দিতে চান নি ৷ তাদের অনুরোধে বাড়িতে থেকেই উপার্জনমুখী কাজে নিজেকে নিয়োজিত করার সিদ্ধান্ত নেন ৷

২০০৪ সালে স্বপন বাড়ির সাথে লাগোয়া একটি ঘরে দোকান দেন ৷ আস্তে আস্তে দোকানের প্রসার ঘটে এবং এতে বেকারী ও কনফেকশনারী দ্রব্য এবং ঔষধ সামগ্রী ওঠানো হয় ৷ প্রাথমিক অবস্থায় ৬,৫০০ টাকা বাবার কাছ থেকে ধার নিয়ে দোকান করেন ৷ বর্তমানে দোকানে প্রায় ৬০,০০০ টাকার মালামাল রয়েছে, যার মাত্র ১৫,০০০ টাকা বাবার কাছ থেকে নেয়া ৷ বাবার টাকাও আস্তে আস্তে শোধ করে দিচ্ছেন ৷ মাসে প্রায় ৩,০০০ টাকা লাভ থাকে তার ৷ এছাড়া বাড়ির সমস্ত প্রয়োজনীয় খরচও দোকানের আয় থেকে মেটানো হয় ৷

পরবর্তীতে ২০০৫ সালের জুলাই মাসে দোকানে একটি গ্রামীণ পল্লীফোন নিয়েছেন ৷ নিজেদের দেড় বিঘার পরিত্যক্ত পুকুরে মাছ ছেড়েছেন ২০০৫ সালে ৷ সেখানে খরচ হয়েছে ৮,১৫৫ টাকা ৷ স্বপন আশা করছেন তিনি ৫০,০০০ টাকার মাছ বিক্রি করতে সক্ষম হবেন ৷ মাছ চাষের সমস্ত খরচ তার নিজস্ব তহবিল থেকে মিটিয়েছেন ৷ স্বপনের প্রত্যাশা রয়েছে আগামী বছর দোকানে ডিজেল, সার, কীটনাশক ইত্যাদি জিনিসপত্র ওঠানোর ৷

স্বপন এখন একজন আত্মপ্রত্যয়ী ও আত্মনির্ভরশীল যুবক ৷ স্বপন তার নিজের কথা এভাবে বললেন, "শুরুতে চিন্তা করতাম পারবো কিনা ৷ এখন অনেক আত্মবিশ্বাসী আমি ৷ আমি জানি আমার দ্বারা অনেক কিছুই করা সম্ভব ৷ এমন চিন্তার কারণেই আমি সফল হতে পেরেছি ৷ বর্তমানে পরিবারের প্রায় সমস্ত দায়িত্ব আমি পালন করছি ৷ আগে পরিবারের সদস্যরা আমাকে নিয়ে হতাশ ছিল ৷ এখন সবাই খুব ভালোবাসে৷ সবাই ভালো চোখে দেখে ৷" বদলে যাওয়া স্বপন আজ আরও অনেক বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখে ৷


- মাজেদুল ইসলাম

 

Previous Article<Index>Next Article


Home  / Feedback / Subscribe

© 2006 The Hunger Project-Bangladesh. All rights reserved.