ঢাকা অঞ্চল

জ্জীবক বার্তা, বর্ষ-, সংখ্যা-২৭, এপ্রিল - মে ২০০৬

 

নারী উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে
মিলি যাকারিয়া কমিশনার হতে চান


ঢাকার মিরপুর পল্লবী এলাকার একজন নেতৃস্থানীয় নারী মিলি যাকারিয়া ৷ বয়স প্রায় ৪০ ৷ ঢাকাতেই জন্ম এবং বেড়ে ওঠা ৷ ১৯৯৮ সালে গড়ে তোলেন 'এসো মিলে করি' নামক সংগঠন ৷ এখানে মূলত বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ দেওয়া হত ৷ সেলাই-কাটিং, ব্লক-বাটিক, সুয়েটারে ফুল তোলা, আচার তৈরি ইত্যাদি প্রশিক্ষণ নিয়ে ইতোমধ্যেই অনেক নারী স্বাবলম্বী হয়েছে ৷ ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন পথশিশুদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ৷ ২০০৩ সালে গড়ে তোলেন 'চয়নিকা যুব মহিলা সংস্থা' ৷ ২০০৪ সালে গড়ে তোলেন 'মিলি'স বিউটি পার্লার এন্ড বাটিক হাউজ', ২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেন 'মায়ের ছোঁয়া খাবার ঘর' নামক রেস্টুরেন্ট ৷ এছাড়া 'মেনস্ জোন' নামের একটি সেলুনেরও মালিক তিনি ৷ ১৯৯০ সালের শুরু থেকে মিলির যে কর্মতত্‍পরতা শুরু হয় তা আজও অবিরাম গতিতে চলছে ৷ শত শত নারী মিলির পরামর্শ নেয়, বিপদে আপদে সহযোগিতা চায় ৷ মিলিও মন উজাড় করে সেবা করে যান ৷ এরই মধ্যে বছর দুয়েক আগে 'কলকাতা একাত্ম'র আমন্ত্রণে পশ্চিমবঙ্গ সফর করেন ১৫ জনের একটি দলের সাথে ৷ ২০০৫ সালে দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ব্যাঙ্গালোর যান দেশের ১০ জন বলিষ্ঠ নারীর একজন হিসেবে ৷ সেখানে পঞ্চায়েতের কাজ পরিদর্শন করে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন ৷ পশ্চিমবঙ্গ যেবার যান সেবার পশ্চিমবঙ্গ সরকারের যুবমন্ত্রী সেলিম, প্রবীণ রাজনীতিতিদ ফুলরেণু গুহ প্রমুখের একান্ত সংস্পর্শ মিলির মধ্যে সঞ্চারিত করে অনুপ্রেরণা ৷ বিশেষ করে মেদিনীপুরের বৈকুন্ঠপুরে মিলিকে দিয়ে যখন একটি চক্ষু হাসপাতাল উদ্বোধন করানো হয় তখন তিনি অভিভূত না হয়ে পারেন না ৷



দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-বাংলাদেশের সঙ্গে মিলির যোগসূত্র স্থাপিত হয় ১৯৯৭ সালে রমনা পার্কের শতায়ূ অঙ্গনে অনুষ্ঠিত 'আত্মউন্নয়নে সুপ্ত শক্তির বিকাশ' শীর্ষক কর্মশালার মাধ্যমে ৷ ২০০১ সালে মিরপুরের কারিতাসে মিলি অংশ নেন ১২৫তম উজ্জীবক প্রশিক্ষণে ৷ যৌবনের প্রারম্ভ থেকে মিলি চেষ্টা চালাচ্ছিলেন নিজ পায়ে দাঁড়ানোর ৷ নিজেকে নিংড়ে নিংড়ে অমানবিক শারীরিক পরিশ্রম করে যাচ্ছিলেন
৷ কিন্তু বিকাশের গতি ছিল মন্থর ৷ রমনার কর্মশালা ও উজ্জীবক প্রশিক্ষণ মিলিকে দিক-নির্দেশনা দেয় ৷ কৌশল অবলম্বী হলে, সংগঠিত হলে, উদ্যমী হলে এমন কোন বাধা নেই, যা অতিক্রম করা অসম্ভব - দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-এর এই বক্তব্য তার মধ্যে প্রেরণা যোগায়, যোগায় শক্তি ৷ মিলি বুঝতে পারেন তাকে সুদূর প্রসারী হতে হবে, লক্ষ্যের ব্যাপকতা বাড়াতে হবে ৷ এসব অভিজ্ঞতা মিলির মধ্যে শক্তি সঞ্চারিত করে ৷ এ শক্তির নাম আত্মশক্তি ৷ মিরপুরের যে কোন অবহেলিত, নির্যাতিত নারীর আশ্রয়স্থল মিলি; যে কোন উদ্যোগী নারীর আদর্শ মিলি

এতটা স্বেচ্ছাব্রতী, আত্মনিবেদিত, বলিষ্ঠ নারীর নিজের বেদনা ও সংগ্রামের কথা যখন বললেন তখন পৃথিবীর সব যন্ত্রণা ছাপিয়ে মিলির জীবনের বেদনাময় ইতিহাসটিই যেন প্রধান হয়ে ওঠে
৷ যে কোন সংবেদনশীল মানুষের পক্ষেই চোখের জল ধরে রাখা কষ্টকর হবে সেই বেদনার ইতিহাস শুনলে ৷ বিস্তারিত জানলে যে কারো মধ্যেই তৈরি হবে পুরুষ, পরিবার ও সমাজবিরোধী ক্ষোভ ৷ মিলি আজ সফল ৷ এই সফল মানুষটি হয়ে ওঠার, বেড়ে ওঠার কাহিনী অত্যন্ত হৃদয় বিদারক

মিলি যাকারিয়ার জন্ম ১৯৬৭ সালে ঢাকার মিরপুরে
৷ বাবা ছিলেন সরকারি চাকুরে ৷ শৈশবে ঘটে যাওয়া মহান মুক্তিযুদ্ধ মিলির মনে গাঢ় ছাপ ফেলে ৷ ঐ সময়ের ভীতি, অনিশ্চয়তা, বিভিন্ন এলাকায় পালিয়ে পালিয়ে দিন যাপনের অনেক স্মৃতিই মনে রেখেছেন মিলি ৷ ১৯৭২ সালে মিরপুর-২ এ ন্যাশনাল বাংলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন ৷ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে থাকা অবস্থায়ই তিনি যোগ দেন শিশু-কিশোর সংগঠন 'শুভ্র সেনা'য় ৷ প্রাথমিক শিক্ষা শেষে ভর্তি হন মিরপুর বাংলা হাই স্কুলে ৷ যোগ দেন দাদাভাই-এর কচিকাঁচার মেলার 'ভাস্কর' নামক কিশোর সংগঠনে ৷ বিভিন্ন বিষয়ে পারদর্শী চৌকশ ছাত্রী হিসেবে স্কুলের সবার প্রিয়ভাজন হয়ে ওঠেন ৷ যদিও দুষ্টুমিতেও দক্ষতা কম ছিল না ৷ এসব গুণের সঙ্গে যুক্ত হয় কচিকাঁচার মেলার সাংগঠনিক দক্ষতা ৷ এ প্রসঙ্গে মিলি বলেন, "তখনকার 'মুকুল ফৌজ' সংগঠনের সাথে প্রতিযোগিতামূলক সম্পর্ক ছিল 'ভাস্কর'-এর ৷ এই প্রতিযোগিতার মনোভাবে আমার সাংগঠনিক দক্ষতা বৃদ্ধি পেয়েছিল ৷ এজন্য দাদাভাই রোকনুজ্জামান আমাকে খুবই স্নেহ করতেন ৷" নাচ-গান-খেলাধুলা ও বিভিন্ন সাংগঠনিক কাজে তৎপর মিলির মধ্যে কৈশোর থেকেই 'মেয়েলী' ছিচকাঁদুনে স্বভাবটি ছিল না ৷ স্কুলের, সংগঠনের কিংবা মহল্লার যে কোন অনুষ্ঠানের মধ্যমনি ছিলেন তিনি ৷ অনেক আশা-আকাঙ্ক্ষা তার ৷ লেখাপড়া করে অনেক বড় হবেন ৷ ১৯৭৯ সালে এই স্বপ্নের সঙ্গী হয় বড় ভাইয়ের বন্ধু সাদি ৷ অপরিণত বয়সের দুর্বলতার কারণে ১৯৮০ সালে সাদির সঙ্গে গোপনে বিয়ে হয়ে যায় মিলির ৷ সাদি বনেদি পরিবারের লাইন বিচ্যুত সন্তান ৷ মিলির পরিবার বেঁকে বসে এ কারণে ৷ অন্যদিকে মিলি সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও তার ডানপিটে স্বভাবের কারণে তাকে মেনে নেয় না সাদির পরিবার ৷ কোন পরিবারেই জায়গা হয় না ওদের ৷ অবশেষে সাদি মিলিকে নিয়ে পালিয়ে আশ্রয় নেয় নানাবাড়ি জামালপুরে ৷ মিলির গর্ভে তখন সন্তান ৷

কিশোরী মেয়ে মা হতে চলেছে ৷ বাবা-মা, ভাই-বোন,শ্বশুর-শশুড়ি আত্মীয়-স্বজন ছেড়ে রাজধানী শহর ঢাকা থেকে এক শাড়ি পরে মফস্বল শহরে একধরনের আশ্রয় গ্রহণ ৷ নানাশ্বশুর বাদে কেউ মিলিকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করছে না ৷ মনখুলে কথা বলার লোকের অভাব, সন্তানসম্ভবা মায়ের নানা রকম ইচ্ছা- এসব নিয়েই চলছিল মিলির জীবন ৷ অন্যদিকে স্বামী অনেকদিন পর নানাবাড়ি এসে বন্ধু-বান্ধব নিয়ে হৈ-হুল্লোর করে সময় কাটায় ৷ দায়িত্ববোধহীন মানুষের মতো শুধু বলতো মানিয়ে নাও, সহ্য কর ৷ সহ্য করতে না পেরেই স্বামীসহ ফিরে আসেন মিরপুরে ৷ অপমানজনকভাবে আশ্রয় নেন শাশুড়ির কাছে ৷ শ্বশুর থাকেন সৌদি আরব ৷ বাসায় দু'টি বেড রুম থাকার পরও বড় ছেলে ও তার বউয়ের থাকার জায়গা হয় বারান্দার একটি খুপরি মতো জায়গায় ৷ গর্ভে অনাগত সন্তান অথচ ঘর মোছা থেকে বাসার সমস্ত কাজ মিলিকেই করতে হতো ৷ যদিও বাসায় তিনটি কাজের মেয়ে ছিল ৷ মিলির ডেলিভারির সময়ের ঠিক প্রাক মুহূর্তে শাশুড়ি বউকে আর বাসায় রাখতে রাজি হয় না ৷ মিলি আশ্রয় নেয় মেজ বোনের বাসা শ্যামলীতে ৷ ১৯৮১ সালের ২ অক্টোবর এ বাসাতেই জন্ম নেয় প্রথম সন্তান সাবিন ৷ প্রাথমিকভাবে স্বামী, শাশুড়ি কেউই খোঁজ নেন নি ৷ ১৫ দিনের মাথায় ফিরে আসেন নবজাতকসহ সেই ছোট রুমে ৷ বাচ্চা পালনসহ বাসার বেশিরভাগ কাজ করতে হত মিলিকে ৷ বাচ্চার ও নিজের সমস্ত খরচ চালাত মেজ বোন ৷ সাদীর এসব নিয়ে কোন মাথা ব্যথা ছিল না ৷ বাচ্চার পাঁচ মাস বয়সে সাদী চলে যান সৌদি আরব ৷ মিলির ওপর নেমে আসে অমানিশার ঘোর অন্ধকার ৷

বাড়ির বড় সন্তানের স্ত্রী এবং ভালবেসে বিয়ে করা স্ত্রী পরিণত হয় 'অসহায় নারী' তে ৷  সারা দিন ঘরমোছা, কাপড় কাচা, রান্না-বান্না নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন মিলি ৷ ছোট ছেলেটি সারা দিন পেছনে ঘুর ঘুর করতো, একটু কোলে নেওয়ার, একটু আদর করার সুযোগ পেত না ৷ এভাবে মিলি আক্রান্ত হন হাঁপানীতে ৷ স্বামী টাকা পাঠায় বিদেশ থেকে, কিন্তু মিলি জানতে পারে না ৷ বাধ্য হয়ে শুরু করে সেলাইয়ের কাজ ৷ এক পর্যায়ে সাদী মিলিকে সৌদি আরব নিয়ে যান ৷ ফেরত্‍ পাঠান ছয় মাসের মাথায় ৷ ৮৬ সালে সাদী আসেন এবং ছয় মাস থেকে চলে যান জার্মানী ৷ জার্মানী থেকে সুইজারল্যান্ড ৷ আমাদের সমাজের একজন গৃহবধুর প্রচলিত অসহায়ত্ব, স্বামীর দায়িত্বহীনতা, সামাজিক চাপ - সব মিলে ভেতরে ভেতরে বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন, নিতে থাকেন নিজের পায়ে দাড়াঁনোর প্রস্ততি ৷

১৯৮৮ সালে তিনি এসএসসি পরীক্ষা দেন এবং পাশ করেন ৷ কোন একটি দু:খজনক কারণে মিলি এইসএসসি পরীক্ষার ফর্ম পূরণ করতে পারলেন না ৷ এসব মিলে মিলিকে আরও জেদী করে তোলে ৷ বিশেষ করে স্কুল পড়ুয়া ছেলের খরচ জোগাতে হিমশিম খেতে হয় ৷ '৯১তে ফিরে আসেন স্বামী ৷ তৈরি হয় নতুন সংকট ৷  সংসার ভেঙ্গে যায় যায় ৷ মিলি চলে যায় বাবার বাড়িতে ৷ মিলির মতে "আল্লার রহমতে সংসার টিকে থাকে"৷ অনেক ঝড়-ঝাপটার মধ্য দিয়ে নির্মিত হয় মিলি ও সাদীর আলাদা সংসার ৷ কিন্তু মিলি এতদিনে পরিণত হয়েছেন স্বতন্ত্র মিলিতে ৷ বস্তির স্কুলে চাকুরি করেন মাসিক ৫০০ টাকা বেতনে ৷ নানা রকম হাতের কাজ করে তা দোকানে দোকানে দেন ৷ অত্যাচার আর অবহেলায় পাথরের মতো মনোবল নিয়ে রাতদিন পরিশ্রম করেন ৷ লক্ষ্য একটাই ছেলেকে মানুষ করতে হবে; নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে; স্বামীর কোন রকম আর্থিক সহযোগিতা গ্রহণ করা যাবে না ৷ মিলি সফল হয়েছেন ৷ কিন্তু অতিরিক্ত পরিশ্রম আর মানসিক যাতনায় অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বেশ কয়েকবার ৷ কলকাতা গিয়েও চিকিত্‍সা করিয়েছেন ৷ কিন্তু এক্ষেত্রে গ্রহণ করেন নি স্বামী বা অন্য কারো অর্থ ৷

মিলি আজ স্বাবলম্বী ৷ সম্পূর্ণ নিজের পায়ে দাঁড়ানো এক নারী ৷ নারী উন্নয়নের নেত্রী ৷ জাতীয় রাজনীতির প্রবাহেও নিজেকে যুক্ত রাখেন সমান তালে ৷ মিলির সন্তান সাবিন - মায়ের পরিচয়কে বড় করে তুলে ধরতে গর্ববোধ করে ৷ মিলির গর্বও এখানে ৷ মিলির আকাঙ্ক্ষা খুব বেশি নয় ৷ তিনি বলেন, "আমার সাবিনের মত কোন মায়ের সন্তান যেন মায়ের স্নেহ থেকে বঞ্চিত না হয়, আমার পরিচিত কোন নারী যেন আমার মত অত্যাচারিত না হয় - এটাই আমার বর্তমান ও ভবিষ্যত কর্মের প্রধান লক্ষ্য ৷ আর এই কাজকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতাও প্রয়োজন ৷ তাই আমার মধ্যে সিটি কর্পোরেশনের কমিশনার নির্বাচিত হওয়ার সুপ্ত ইচ্ছা রয়েছে ৷"


- আলী উমেদ

 

Previous Article<Index>Next Article


Home  / Feedback / Subscribe

© 2006 The Hunger Project-Bangladesh. All rights reserved.