|
নারী
উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে
মিলি যাকারিয়া
কমিশনার হতে চান
ঢাকার মিরপুর পল্লবী এলাকার একজন নেতৃস্থানীয় নারী মিলি যাকারিয়া ৷ বয়স
প্রায় ৪০ ৷ ঢাকাতেই জন্ম এবং বেড়ে ওঠা ৷ ১৯৯৮ সালে গড়ে তোলেন 'এসো মিলে করি'
নামক সংগঠন ৷ এখানে মূলত বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ দেওয়া হত ৷ সেলাই-কাটিং,
ব্লক-বাটিক, সুয়েটারে ফুল তোলা, আচার তৈরি ইত্যাদি প্রশিক্ষণ নিয়ে
ইতোমধ্যেই অনেক নারী স্বাবলম্বী হয়েছে ৷ ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন
পথশিশুদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ৷ ২০০৩ সালে গড়ে তোলেন 'চয়নিকা যুব মহিলা
সংস্থা' ৷ ২০০৪ সালে গড়ে তোলেন 'মিলি'স বিউটি পার্লার এন্ড বাটিক হাউজ',
২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেন 'মায়ের ছোঁয়া খাবার ঘর' নামক রেস্টুরেন্ট ৷ এছাড়া
'মেনস্ জোন' নামের একটি সেলুনেরও মালিক তিনি ৷ ১৯৯০ সালের শুরু থেকে মিলির
যে কর্মতত্পরতা শুরু হয় তা আজও অবিরাম গতিতে চলছে ৷ শত শত নারী মিলির
পরামর্শ নেয়, বিপদে আপদে সহযোগিতা চায় ৷ মিলিও মন উজাড় করে সেবা করে যান ৷
এরই মধ্যে বছর দুয়েক আগে 'কলকাতা একাত্ম'র আমন্ত্রণে পশ্চিমবঙ্গ সফর করেন
১৫ জনের একটি দলের সাথে ৷ ২০০৫ সালে দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-বাংলাদেশের পক্ষ
থেকে ব্যাঙ্গালোর যান দেশের ১০ জন বলিষ্ঠ নারীর একজন হিসেবে ৷ সেখানে
পঞ্চায়েতের কাজ পরিদর্শন করে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন ৷ পশ্চিমবঙ্গ যেবার যান
সেবার পশ্চিমবঙ্গ সরকারের যুবমন্ত্রী সেলিম, প্রবীণ রাজনীতিতিদ ফুলরেণু
গুহ প্রমুখের একান্ত সংস্পর্শ মিলির মধ্যে সঞ্চারিত করে অনুপ্রেরণা ৷ বিশেষ
করে মেদিনীপুরের বৈকুন্ঠপুরে মিলিকে দিয়ে যখন একটি চক্ষু হাসপাতাল উদ্বোধন
করানো হয় তখন তিনি অভিভূত না হয়ে পারেন না ৷

দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-বাংলাদেশের সঙ্গে মিলির যোগসূত্র স্থাপিত হয় ১৯৯৭
সালে রমনা পার্কের শতায়ূ অঙ্গনে অনুষ্ঠিত 'আত্মউন্নয়নে সুপ্ত শক্তির
বিকাশ' শীর্ষক কর্মশালার মাধ্যমে ৷ ২০০১ সালে মিরপুরের কারিতাসে মিলি অংশ
নেন ১২৫তম উজ্জীবক প্রশিক্ষণে ৷ যৌবনের প্রারম্ভ থেকে মিলি চেষ্টা
চালাচ্ছিলেন নিজ পায়ে দাঁড়ানোর ৷ নিজেকে নিংড়ে নিংড়ে অমানবিক শারীরিক
পরিশ্রম করে যাচ্ছিলেন
৷ কিন্তু বিকাশের গতি ছিল মন্থর
৷ রমনার কর্মশালা ও
উজ্জীবক প্রশিক্ষণ মিলিকে দিক-নির্দেশনা দেয়
৷ কৌশল অবলম্বী হলে, সংগঠিত
হলে, উদ্যমী হলে এমন কোন বাধা নেই, যা অতিক্রম করা অসম্ভব - দি হাঙ্গার
প্রজেক্ট-এর এই বক্তব্য তার মধ্যে প্রেরণা যোগায়, যোগায় শক্তি
৷ মিলি বুঝতে
পারেন তাকে সুদূর প্রসারী হতে হবে, লক্ষ্যের ব্যাপকতা বাড়াতে হবে
৷ এসব
অভিজ্ঞতা মিলির মধ্যে শক্তি সঞ্চারিত করে
৷ এ শক্তির নাম আত্মশক্তি
৷
মিরপুরের যে কোন অবহেলিত, নির্যাতিত নারীর আশ্রয়স্থল মিলি; যে কোন উদ্যোগী
নারীর আদর্শ মিলি
৷
এতটা স্বেচ্ছাব্রতী, আত্মনিবেদিত, বলিষ্ঠ নারীর নিজের বেদনা ও
সংগ্রামের কথা যখন বললেন তখন পৃথিবীর সব যন্ত্রণা ছাপিয়ে মিলির জীবনের
বেদনাময় ইতিহাসটিই যেন প্রধান হয়ে ওঠে
৷ যে কোন সংবেদনশীল মানুষের পক্ষেই
চোখের জল ধরে রাখা কষ্টকর হবে সেই বেদনার ইতিহাস শুনলে
৷ বিস্তারিত জানলে
যে কারো মধ্যেই তৈরি হবে পুরুষ, পরিবার ও সমাজবিরোধী ক্ষোভ
৷ মিলি আজ সফল
৷
এই সফল মানুষটি হয়ে ওঠার, বেড়ে ওঠার কাহিনী অত্যন্ত হৃদয় বিদারক
৷
মিলি যাকারিয়ার জন্ম ১৯৬৭ সালে ঢাকার মিরপুরে
৷ বাবা ছিলেন সরকারি
চাকুরে
৷ শৈশবে ঘটে যাওয়া মহান মুক্তিযুদ্ধ মিলির মনে গাঢ় ছাপ ফেলে
৷ ঐ
সময়ের ভীতি, অনিশ্চয়তা, বিভিন্ন এলাকায় পালিয়ে পালিয়ে দিন যাপনের অনেক
স্মৃতিই মনে রেখেছেন মিলি
৷ ১৯৭২ সালে মিরপুর-২ এ ন্যাশনাল বাংলা প্রাথমিক
বিদ্যালয়ে ভর্তি হন
৷ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে থাকা অবস্থায়ই তিনি যোগ দেন
শিশু-কিশোর সংগঠন 'শুভ্র সেনা'য়
৷ প্রাথমিক শিক্ষা শেষে ভর্তি হন মিরপুর
বাংলা হাই স্কুলে
৷ যোগ দেন দাদাভাই-এর কচিকাঁচার মেলার
'ভাস্কর'
নামক কিশোর
সংগঠনে
৷ বিভিন্ন বিষয়ে পারদর্শী চৌকশ ছাত্রী হিসেবে স্কুলের সবার
প্রিয়ভাজন হয়ে ওঠেন
৷ যদিও দুষ্টুমিতেও দক্ষতা কম ছিল না
৷ এসব গুণের সঙ্গে
যুক্ত হয় কচিকাঁচার মেলার সাংগঠনিক দক্ষতা
৷ এ প্রসঙ্গে মিলি বলেন, "তখনকার
'মুকুল ফৌজ' সংগঠনের সাথে প্রতিযোগিতামূলক সম্পর্ক ছিল 'ভাস্কর'-এর
৷ এই
প্রতিযোগিতার মনোভাবে আমার সাংগঠনিক দক্ষতা বৃদ্ধি পেয়েছিল
৷ এজন্য দাদাভাই
রোকনুজ্জামান আমাকে খুবই স্নেহ করতেন
৷" নাচ-গান-খেলাধুলা ও বিভিন্ন
সাংগঠনিক কাজে
তৎপর মিলির মধ্যে কৈশোর থেকেই 'মেয়েলী' ছিচকাঁদুনে
স্বভাবটি ছিল না ৷ স্কুলের, সংগঠনের কিংবা মহল্লার যে কোন অনুষ্ঠানের
মধ্যমনি ছিলেন তিনি ৷ অনেক আশা-আকাঙ্ক্ষা তার ৷ লেখাপড়া করে অনেক বড় হবেন ৷
১৯৭৯ সালে এই স্বপ্নের সঙ্গী হয় বড় ভাইয়ের বন্ধু সাদি ৷ অপরিণত বয়সের
দুর্বলতার কারণে ১৯৮০ সালে সাদির সঙ্গে গোপনে বিয়ে হয়ে যায় মিলির ৷ সাদি
বনেদি পরিবারের লাইন বিচ্যুত সন্তান ৷ মিলির পরিবার বেঁকে বসে এ কারণে ৷ অন্যদিকে মিলি
সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও তার ডানপিটে স্বভাবের কারণে তাকে
মেনে নেয় না সাদির পরিবার ৷ কোন পরিবারেই জায়গা হয় না ওদের ৷ অবশেষে সাদি
মিলিকে নিয়ে পালিয়ে আশ্রয় নেয় নানাবাড়ি জামালপুরে ৷ মিলির গর্ভে তখন
সন্তান ৷
কিশোরী মেয়ে মা হতে চলেছে ৷ বাবা-মা, ভাই-বোন,শ্বশুর-শশুড়ি আত্মীয়-স্বজন ছেড়ে
রাজধানী শহর ঢাকা থেকে এক শাড়ি পরে মফস্বল শহরে একধরনের আশ্রয় গ্রহণ ৷
নানাশ্বশুর বাদে কেউ মিলিকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করছে না ৷ মনখুলে কথা
বলার লোকের অভাব, সন্তানসম্ভবা মায়ের নানা রকম ইচ্ছা- এসব নিয়েই
চলছিল মিলির জীবন ৷ অন্যদিকে স্বামী অনেকদিন পর নানাবাড়ি এসে বন্ধু-বান্ধব
নিয়ে হৈ-হুল্লোর করে সময় কাটায় ৷ দায়িত্ববোধহীন মানুষের মতো শুধু বলতো
মানিয়ে নাও, সহ্য কর ৷ সহ্য করতে না পেরেই স্বামীসহ ফিরে আসেন মিরপুরে ৷
অপমানজনকভাবে আশ্রয় নেন শাশুড়ির কাছে ৷ শ্বশুর থাকেন সৌদি আরব ৷ বাসায়
দু'টি বেড রুম থাকার পরও বড় ছেলে ও তার বউয়ের থাকার জায়গা হয় বারান্দার
একটি খুপরি মতো জায়গায় ৷ গর্ভে অনাগত সন্তান অথচ ঘর মোছা থেকে বাসার সমস্ত
কাজ মিলিকেই করতে হতো ৷ যদিও বাসায় তিনটি কাজের মেয়ে ছিল ৷ মিলির ডেলিভারির
সময়ের ঠিক প্রাক মুহূর্তে শাশুড়ি বউকে আর বাসায় রাখতে রাজি হয় না ৷ মিলি
আশ্রয় নেয় মেজ বোনের বাসা শ্যামলীতে ৷ ১৯৮১ সালের ২ অক্টোবর এ বাসাতেই জন্ম
নেয় প্রথম সন্তান সাবিন ৷ প্রাথমিকভাবে স্বামী, শাশুড়ি কেউই খোঁজ নেন নি ৷
১৫ দিনের মাথায় ফিরে আসেন নবজাতকসহ সেই ছোট রুমে ৷ বাচ্চা পালনসহ বাসার
বেশিরভাগ কাজ করতে হত মিলিকে ৷ বাচ্চার ও নিজের সমস্ত খরচ চালাত মেজ বোন ৷
সাদীর এসব নিয়ে কোন মাথা ব্যথা ছিল না ৷ বাচ্চার পাঁচ মাস বয়সে সাদী চলে
যান সৌদি আরব ৷ মিলির ওপর নেমে আসে অমানিশার ঘোর অন্ধকার ৷
বাড়ির বড় সন্তানের স্ত্রী এবং ভালবেসে বিয়ে করা স্ত্রী পরিণত হয়
'অসহায় নারী' তে ৷ সারা
দিন ঘরমোছা, কাপড় কাচা, রান্না-বান্না নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন মিলি ৷ ছোট
ছেলেটি সারা দিন পেছনে ঘুর ঘুর করতো, একটু কোলে নেওয়ার, একটু আদর করার
সুযোগ পেত না ৷ এভাবে মিলি আক্রান্ত হন হাঁপানীতে ৷ স্বামী টাকা পাঠায় বিদেশ
থেকে, কিন্তু মিলি জানতে পারে না ৷ বাধ্য হয়ে শুরু করে সেলাইয়ের কাজ ৷ এক
পর্যায়ে সাদী মিলিকে সৌদি আরব নিয়ে যান ৷ ফেরত্ পাঠান ছয় মাসের মাথায় ৷ ৮৬
সালে সাদী আসেন এবং ছয় মাস থেকে চলে যান জার্মানী ৷ জার্মানী থেকে
সুইজারল্যান্ড ৷ আমাদের সমাজের একজন গৃহবধুর প্রচলিত অসহায়ত্ব, স্বামীর
দায়িত্বহীনতা, সামাজিক চাপ - সব মিলে ভেতরে ভেতরে বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন, নিতে থাকেন
নিজের পায়ে দাড়াঁনোর প্রস্ততি ৷
১৯৮৮ সালে তিনি এসএসসি পরীক্ষা দেন এবং পাশ করেন ৷ কোন একটি দু:খজনক কারণে মিলি এইসএসসি পরীক্ষার ফর্ম পূরণ
করতে পারলেন না ৷ এসব মিলে মিলিকে আরও জেদী করে তোলে ৷ বিশেষ করে স্কুল পড়ুয়া ছেলের
খরচ জোগাতে হিমশিম খেতে হয় ৷ '৯১তে ফিরে আসেন স্বামী ৷ তৈরি হয় নতুন সংকট ৷ সংসার ভেঙ্গে যায় যায় ৷
মিলি চলে যায় বাবার বাড়িতে ৷ মিলির মতে "আল্লার রহমতে সংসার টিকে থাকে"৷ অনেক
ঝড়-ঝাপটার মধ্য দিয়ে নির্মিত হয় মিলি ও সাদীর আলাদা সংসার ৷ কিন্তু মিলি
এতদিনে পরিণত হয়েছেন স্বতন্ত্র মিলিতে ৷ বস্তির স্কুলে চাকুরি করেন মাসিক
৫০০ টাকা বেতনে ৷ নানা রকম হাতের কাজ করে তা দোকানে দোকানে দেন ৷ অত্যাচার
আর অবহেলায় পাথরের মতো মনোবল নিয়ে রাতদিন পরিশ্রম করেন ৷ লক্ষ্য একটাই
ছেলেকে মানুষ করতে হবে; নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে; স্বামীর কোন রকম আর্থিক
সহযোগিতা গ্রহণ করা যাবে না ৷ মিলি সফল হয়েছেন ৷ কিন্তু অতিরিক্ত পরিশ্রম আর
মানসিক যাতনায় অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বেশ কয়েকবার ৷ কলকাতা গিয়েও চিকিত্সা
করিয়েছেন ৷ কিন্তু এক্ষেত্রে গ্রহণ করেন নি স্বামী বা অন্য কারো অর্থ ৷
মিলি আজ স্বাবলম্বী ৷ সম্পূর্ণ নিজের পায়ে দাঁড়ানো এক নারী ৷ নারী
উন্নয়নের নেত্রী ৷ জাতীয় রাজনীতির প্রবাহেও নিজেকে যুক্ত রাখেন সমান তালে ৷
মিলির সন্তান সাবিন - মায়ের পরিচয়কে বড় করে তুলে ধরতে গর্ববোধ করে ৷ মিলির
গর্বও এখানে ৷ মিলির আকাঙ্ক্ষা খুব বেশি নয় ৷ তিনি বলেন, "আমার সাবিনের মত
কোন মায়ের সন্তান যেন মায়ের স্নেহ থেকে বঞ্চিত না হয়, আমার পরিচিত কোন
নারী যেন আমার মত অত্যাচারিত না হয় - এটাই আমার বর্তমান ও ভবিষ্যত কর্মের
প্রধান লক্ষ্য ৷ আর এই কাজকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতাও
প্রয়োজন ৷ তাই আমার মধ্যে সিটি কর্পোরেশনের কমিশনার নির্বাচিত হওয়ার সুপ্ত
ইচ্ছা রয়েছে ৷"
- আলী উমেদ
|