|
আলোকিত এক সমাজ কারিগর খোরশেদ আলম
টাঙ্গাইল জেলার নাগরপুর থানার গয়হাটা ইউনিয়ন পরষিদের সামনে বড় একটি
বাজার, বাজারে অনেকগুলো দোকানের মধ্যে একটি দোকানে অপেক্ষাকৃত বেশি ভিড়
৷
সব মানুষই যে এখানে কিছু কেনার জন্য এসেছে এমন নয়
৷ আগতদের মধ্যে কেউ
এসেছেন ইউনিয়ন পরিষদে দাবি উত্থাপন কীভাবে করবেন তা লেখার জন্য, কেউ
এসেছেন বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ নেবার জন্য, আবার কেউ কেউ তাদের কোন সুখের
খবর দেওয়ার জন্য
৷ প্রত্যেক দিনই দোকানের সামনে ভিড় বাড়তে থাকে, আসতে থাকে
নতুন মানুষ
৷
প্রতিদিন এত
ঝামেলা জ্বালাতন সহ্য করেন কিভাবে, বিরক্ত লাগে না?
প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিতেই হাসি মুখে উত্তর দিলেন, "বিরক্ত হবো কেন?" এরা আসে
বলেই নিজেকে সফল উজ্জীবক মনে হয়"৷ তার কাছে আসা মানুষের এই ভিড় হঠাত্ নয় ৷
এই অবস্থানে আসার পেছনে অনেক কাহিনী আছে, যা অন্য অনেকের জন্য অনূকরণীয়
হতে পারে ৷ তাইতো আজ সেই সফল মানুষ, সফল উজ্জীবকের সফলতার কাহিনী অন্যদের
জন্য তুলে ধরা ৷
খোরশেদ আলমের জন্ম ১৯৫৭ সালের গয়হাটা ইউনিয়নের কলাইনগর গ্রামের এক
ব্যবসায়ী পরিবারে ৷ বাবা দুখী মিয়া ও মা মজিরন নেছার মনে তখন অনেক কষ্ট ৷
কারণ তাদের ছেলে-মেয়ে জন্মানোর পর বেঁচে থাকে না ৷ অনেকের দেওয়া অনেক রকম
তাবিজ-কবচও কোন কাজে লাগে নি ৷ খোরশেদ আলমের বয়স যখন ১২ বছর তখন
প্রতিবেশীরা তার বাবা-মা'কে পরামর্শ দিলেন ছেলেকে বিয়ে দিতে ৷ পরামর্শ
অনুযায়ী ১৯৬৯ সালে বিয়ে হয় নুরুন্নাহারের সাথে ৷ বিয়ের পর ১৯৭২ সালে গয়হাটা
উদয়তারা স্কুল থেকে এসএসসি পাশ করেন ৷ এসএসসি পাশ করার পর বাবার ব্যবসায়ে
সহযোগিতা করার জন্য পড়াশুনার পাট চুকিয়ে দিতে হয় তাকে ৷ সদ্য স্বাধীন হওয়া
দেশে বাবার ব্যবসা দেখেশুনে কেটে যাচ্ছিল তার সময় ৷ ছোটবেলা থেকেই সমাজ
সেবার নেশা তাকে পেয়ে বসে ৷ গ্রামের মানুষের সাথে মিলে মিশে তাদের
সুখ-দুঃখের অংশীদার হয়ে ক্রমেই গ্রামের মানুষদেরকে আপন মানুষে পরিণত করেন
নিজেকে ৷
জনসেবা করার নেশা ছিল তার ছোটবেলা থেকে ৷ সেটাকেই আরও শক্তিশালী রূপ
দেন ১৯৯৮ সালে গয়হাটা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়ে ৷ গ্রামের 'গরিব'
মানুষদের 'অসহায় অক্ষম' মনে করে তাদের সাহায্যের জন্য নিজের ক্ষতি করতেও
দ্বিধা করতেন না তিনি ৷ এভাবেই চলছিল তার দিন ৷ হঠাত্ গয়হাটা ইউনিয়নের
চেয়ারম্যান আবুল হোসেনের কাছে স্বেচ্ছাব্রতী প্রতিষ্ঠান 'দি হাঙ্গার
প্রজেক্ট'-এর নাম ও উজ্জীবক প্রশিক্ষণের কথা শোনেন তিনি ৷ যাবেন কি যাবেন
না - এই সিদ্ধান্ত নিতে নিতেই কেটে যায় বেশ কিছু দিন ৷ তার পরই চেয়ারম্যান
উজ্জীবক আবুল হোসেন এক রকম জোর করেই তাকে ঢাকায় পাঠান ঢাকায় এলজিআরডি'তে
১৮তম ব্যাচের উজ্জীবক প্রশিক্ষণ নিতে ৷ প্রশিক্ষণের বিভিন্ন আলোচনায় অংশ
নিয়ে চিন্তা জগতে সংঘটিত হয় অন্য রকম এক বিপ্লব ৷ অথচ খোরশেদ আলমের জীবনের
শুরুটা ছিল এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে ৷
ইউপি সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর বেশির ভাগ সময় ইউনিয়ন পরিষদে দেওয়ার
কারণে ব্যবসার মন্দাভাব চলে আসে, আবার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা না থাকায়
জনসেবায়ও খুব একটা সফল হচ্ছিলেন না ৷ এই মানসিক টানাপোড়েন চলাকালীন সময়ে
চারদিনের প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করেন তিনি ৷ একনাগাড়ে বসে থাকার কারণে
প্রশিক্ষণের প্রথম দিনই ছিল তার কাছে বিরক্তিকর ৷ পরে অবশ্য পুরো প্রশিক্ষণ
তিনি উপভোগ করেছেন ৷ যত সময় গেছে প্রশিক্ষণের প্রতিটি আলোচনা তাকে নতুন
অনুভূতির সন্ধান দিয়েছে ৷ প্রশিক্ষণে জ্ঞানের রাজ্য, নারীর ক্ষমতায়ন,
আত্মশক্তি, ক্ষুধামুক্ত এলাকার বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধীয় আলোচনা এখনো তাকে
শক্তি যোগায় ৷
প্রশিক্ষণ শেষে এলাকার ফিরে এসে নতুন তাগিদ অনুভব করলেন নিজের ভেতর ৷
একাত্তুরের মহান মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করতে পারেন নি বলে মনের
ভিতরে কষ্ট ছিল ৷ সেই কষ্ট থেকে নিস্কৃতি পাওয়ার জন্য শুরু করলেন দ্বিতীয়
মুক্তিযুদ্ধ, যা ছিল অর্থনৈতিক মুক্তি আনার লক্ষ্যে ৷
কাজ শুরু করার জন্য খোরশেদ আলম প্রথমেই বেছে নিলেন নিজের গ্রামকে ৷
মানুষ সংগঠিত হয়ে জয় করতে পারে সব বাধা - এই মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হয়ে ২০০০
সালে কলাই নগর গ্রামে তৈরি করেন দু'টি সংগঠন, একটি নারীদের ও অন্যটি
পুরুষদের নিয়ে ৷ পুরুষদের নিয়ে সংগঠনটির নাম 'বলাইনগর ক্ষুধামুক্ত সমিতি'
যার সদস্য সংখ্যা ছিল ৩২ জন ৷ সমিতির সদস্যরা সাপ্তাহিক পাঁচ টাকা হারে
সঞ্চয় করে ৷ বর্তমানে সমিতির মোট সঞ্চয় ৬,৫০০ টাকা ৷ আর 'মহিলা সমিতি'র
সদস্য সংখ্যা ৪৪ জন ৷ তারাও পাঁচ টাকা হারে সঞ্চয় করে ৷
সমিতির সদস্যরা শুধুমাত্র সঞ্চয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, খোরশেদ
আলমের প্রচেষ্টায় সমিতির সদস্যগণ নিয়মিত মাসিক সভা করে ৷ এসব মিটিং-এ
সংগঠনের অবস্থা, অর্থনৈতিক হিসেব ছাড়াও বিভিন্ন সচেতনতা ও সামাজিক সমস্যা
নিয়ে কথা হয় ৷ সমিতির সদস্যদের সচেতনতার ফলে গ্রামে নারী নির্যাতন ও
বাল্যবিবাহ বন্ধ হয়েছে ৷ চিরতরে নির্মূল হয়েছে যৌতুকের মতো সামাজিক
সমস্যা ৷ এছাড়াও ২০০৩ সাল থেকে বলাইনগরের মায়েরা নিয়মিত স্বাস্থ্য সেবা
পাচ্ছে ৷
শুধু বলাইনগর নয় গোটা গয়হাটা ইউনিয়নেই খোরশেদ আলম ও অন্যান্য
উজ্জীবকরা নিরবিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছে ৷ স্থানীয় উজ্জীবকদের সম্মিলিত
চেষ্টায় গয়হাটা ইউনিয়ন এখন গোটা জেলায় দৃষ্টান্ত হিসেবে নিজস্ব ইমেজ তৈরি
করেছে ৷ এই ইউনিয়নে এখন নিয়মিত উন্মুক্ত বাজেট অধিবেশন, মাসিক সমন্বয়
মিটিং, স্ট্যাণ্ডিং কমিটির মিটিং অনুষ্ঠিত হয় ৷ খোরশেদ আলম ও স্থানীয়
উজ্জীবকদের তত্পরতায় গঠিত হয়েছে 'শিক্ষার মান উন্নয়ন কমিটি' ৷ এই কমিটি
ছাত্র-ছাত্রীদের ইউনিয়ন বৃত্তি প্রদান করে, যা এখন অন্যান্য ইউনিয়নেও
ছড়িয়ে পড়েছে ৷ এছাড়াও ইউনিয়নে নিয়মিত নারী দিবস, কন্যাশিশু দিবস-সহ বিভিন্ন
জাতীয় দিবস পালন করা হয় ৷
সামাজিক ভূমিকা পালনের পাশাপাশি খোরশেদ আলম পরিবারের আর্থিক দায়িত্বও
মনোযোগের সাথে পালন করছেন ৷ ভাইকে সাথে নিয়ে পারিবারিক ব্যবসাকে আবার
প্রতিষ্ঠিত করেছেন ৷ দি হাঙ্গার প্রজেক্টের সহযোগিতায় হাঁস-মুরগী পালন ও
সবজি চাষ প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজের বাড়িতেই এগুলোর চাষ করছেন, কাগজের ঠোঙ্গা
বানিয়ে বিক্রি করছেন - এসব মিলিয়ে মাসে প্রায় পাঁচ হাজার টাকা বাড়তি আয়
করেন ৷ অথচ সব মিলিয়ে তিনি মূলধন বিনিয়োগ করেছিলেন মাত্র তিন হাজার টাকা ৷
এভাবেই নীরবে বলাইনগরসহ গোটা গয়হাটা ইউনিয়নের বদলে যাওয়ার কারিগর হয়ে
নিজেকে তৈরি করেছেন খোরশেদ আলম ৷ শুধু বলাইনগর নয় গোটা দেশের অর্থনৈতিক
মুক্তির জন্য দরকার খোরশেদ আলমের মতো আরও আলোকিত কারিগর ৷ আমরা জানি তাদের
ছোঁয়ায় এই বাংলাদেশ একদিন বদলে যাবে ঠিকই ৷
- তুহিন আফসারী
|