দক্ষিনাঞ্চল

জ্জীবক বার্তা, বর্ষ-, সংখ্যা-২৭, এপ্রিল - মে ২০০৬

 

মাদার তেরেসা আমার আদর্শ, নারীত্ব আমার শক্তি - মরিয়ম মান্নান


এই প্রথম আমি একজন নারীর কন্ঠে শুনলাম পুরুষ সংক্রান্ত একটি শক্তিশালী উপমা, একটি যথাযথ বিশেষণ ৷ কুশল বিনিময়ের সময় তিনি অন্য একজন নারীকে জিজ্ঞাসা করছিলেন, "তোমার হাতুড়ি কেমন আছে"৷ স্বামী সংক্রান্ত এই রকম বাস্তব সম্মত, যুতসই এবং প্রতিবাদী ভাষা আমি কখনো কোন আক্রমণাত্মক নারীবাদী নারী কর্মীর কন্ঠেও শুনতে পাই নি ৷ তিনি একজন প্রান্তিক নারী ৷ তার নাম মরিয়ম মান্নান ৷ হতে চেয়েছিলেন কবি - হতে পারেন নি ৷ তাতে আশাহত নন ৷ কারণ মাদার তেরেসার জীবন ও কর্ম তার নিকট মনে হলো কবিতার চেয়েও অনেক বড় কিছু ৷ তাই জীবনের প্রারম্ভেই পা বাড়ান সে পথে ৷ পথ বড় দুর্গম ৷ তাই বলে থেমে যান নি ৷ আজও চলছে তার তেরেসীয় কায়দায় নিরন্তর পথ চলা ৷ মরিয়ম মান্নানের বয়স ৪৩ ৷ শরীরটি দুর্দান্ত পরিশ্রমী ৷ প্রাচীন পাথরের মতে শক্ত মনোবল ৷ সংবেদনশীল হৃদয় ৷ এবং এসবই যেন আর সব নির্যাতিত নারীদের জন্য নিবেদিত ৷ সংগ্রামমুখর জীবনের পথ পরিক্রমায় তিনি আজ অবহেলিত, নির্যাতিত, নিঃস্ব নারীদের নির্ভীক কাণ্ডারী; প্রান্তিক অঞ্চলে নারী জাগরণের পথ নির্দেশক; স্বমহিমায় পথ চলা একজন বলিষ্ঠ নারী ৷



মরিয়ম মান্নানের জন্ম ষাটের দশকের প্রারম্ভে ৷ ভারতের চব্বিশ পরগনার বাদড়িয়া থানার দেওড়া গ্রাম তার জন্মস্থান ৷ ১৯৬৫ সালের দাঙ্গায় দেশান্তরী হন ৷ রাতের অন্ধকারে সহায় সম্পত্তি ছেড়ে আল্লাহু আকবর আর বন্দে মাতরম ধ্বনির হিংস্রতার ভেতর দিয়ে শিশু মরিয়ম পরিবারের সাথে তীব্র অনিশ্চয়তার পথ পাড়ি দিয়ে উপস্থিত হন সাতক্ষীরা ৷ ছোট খাট তালুকের মালিক মধ্যবিত্ত শ্রেণীর পরিবারটি মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে পরিণত হন শরনার্থীতে, উদ্বাস্তুতে ৷ সাতক্ষীরা আসার পথে ওপাড় বাংলা ও এপাড় বাংলার বিভিন্ন রিফিউজি ক্যাম্পের অভিজ্ঞতা আর পথিমধ্যে ওত্‍ পেতে থাকা মৃত্যুভয় গাঢ় ছাপ ফেলে শিশু মরিয়মের মনে ৷ সাতক্ষীরা শহরের পিটিআইতে ৬ মাস উদ্বাস্তু জীবন-যাপনের পর লটারির মাধ্যমে মরিয়মের পরিবার স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ পায় সদর থানার চুপড়িয়া গ্রামে ৷ একদিকে জীবিকার সংকট অন্যদিকে চুপড়িয়াবাসীর সঙ্গে মরিয়মদের সাংস্কৃতিক ব্যবধান - দু'য়ে মিলে অস্তিত্বের সংকটে আবর্তিত হতে থাকে তারা ৷ মরিয়মের ভাষায়, "চুপড়িয়ার সাধারণ নারীরা ব্লাউজ, পেটিকোট পরতো না ৷ অন্যদিকে আমার মা-চাচীরা ওসব পরতো এবং কিছুটা সাজগোজও করতো ৷ দারুণভাবে নিন্দিত হতো এসব ৷ এমনকি কেউ কেউ বেশ্যার সঙ্গেও তুলনা করতো আমাদের"৷ অবশ্য মরিয়মের বাবা বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে চুপড়িয়াবাসীর মন জয় করেন ৷ কিন্তু তীব্র আর্থিক সংকটে পড়ে তারা তালা থানার পাটকেলঘাটার কুমিরা গ্রামে এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নেন ৷ মরিয়মের বাবা তার এক আত্মীয়ের দোকানে কাজ নেন ৷ এক সময় ছোট্ট মরিয়মের পরামর্শে তার পিতা খুব ছোট একটি দোকান করেন ৷

পাটকেলঘাটাতেই বিয়ে হয় তৃতীয় শ্রেণীতে পাঠরত শিশু মরিয়মের ৷ মরিয়মের পক্ষে কবুল বলেন তার পিতা ৷ স্বামী জনতা ব্যাংকের নবীন চাকুরে ৷ বাড়ি নোয়াখালী ৷ '৬৯ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত বিয়েটি মরিয়মের পিতার সচেতনতার কারণে রেজিস্ট্রিও হয় ৷ ৬৯ থেকে ৭১ ৷ খুব দ্রুত পার হয় সময়টা ৷ পিতার সংসার চলে আসে আবার চুপড়িয়ায় ৷ স্বামী চলে যায় কর্মস্থল যশোরে ৷ আর মরিয়ম যান শ্বশুর বাড়িতে ৷ চবি্বশপরগনা থেকে সাতক্ষীরা, সাতক্ষীরা থেকে এবার নোয়াখালী ৷

একদিকে ভিন্ন পরিবেশ, ভিন্ন সংস্কৃতি, রক্ষণশীল সমাজ, অন্যদিকে বাল্যবধু, পোড়খাওয়া মন আর ডানপিটে স্বভাব ৷ কিন্তু কোন অঘটন ঘটল না ভাল মানুষ শ্বশুরের কারণে ৷ মরিয়মকে তিনি ভালবাসতেন মেয়ের অধিক জেনে ৷ চঞ্চল স্বভাব, বার বার নীড় হারানো মন আর পশ্চিমবাংলার মিষ্টি ভাষা নরম করে দিয়েছিল শ্বশুরের অন্তর ৷ মরিয়মকে তিনি ভর্তি করে দেন সেনবাগ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে ৷ ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে ৷ শুরু হয় মরিয়মের জীবনের সাধনা ৷ নিজেকে গড়ে তোলার সংগ্রাম ৷ বাড়ির বউ হিসেবে সমস্ত কাজ শেষ করে স্কুলের ঘন্টা বাজার পরে মরিয়ম হাজির হতেন ক্লাসে ৷ স্বামী-শ্বশুর বাদে সবাই ঘোর বিরোধী ছিল মরিয়মের লেখা-পড়ার ব্যাপারে ৷ এ ছাড়া মরিয়মের ডানপিটে স্বভাবও সবাইকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছিল ৷ দেবর-ননদদের নিয়ে বিকেলে মাঠে খেলা করা, সিনেমা, নাটক, যাত্রা ইত্যাদি দেখা বাড়ির বউ হিসেবে কেউ মেনে নিতে পারে নি ৷ একবার স্কুলে 'পথের মেয়ে' নামক একটি নাটকে অভিনয়ও করেছিলেন মরিয়ম ৷ এর ফলে আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশির চাপে কিশোরী বধুর সংসার বুঝি ভেঙ্গে যায় যায় অবস্থা ৷ কিন্তু নমনীয় হন নি মরিয়ম ৷ যুক্তির আশ্রয়ে সেই প্রথম নারী হিসেবে বলিষ্ঠ প্রতিবাদ ৷ স্বামী, শ্বশুর এবং শিক্ষকদের কারণে রেহাই পেয়ে যান রক্ষণশীল সমাজের হিংস্র ছোবল থেকে ৷ এ প্রসঙ্গে মরিয়ম বলেন, "শৈশব থেকেই আমি আমার বাবাসহ বয়স্কদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে যুক্তি দিয়ে তর্ক করতাম ৷ এ অভ্যাসটা এখনও ছাড়তে পারি নি ৷ এ জন্য জীবনে অনেক ভোগান্তি হয়েছে ৷ কিন্তু ভোগান্তি থাকলেও এই তর্কই আমার জীবনে সফলতা এনে দিয়েছে ৷ সেদিন আমি বিনয়ের সাথে মুরুব্বীদের মুখের সামনে বলেছিলাম, খেলাধুলা করলে যাত্রা-সিনেমা দেখলে, নাটকে অভিনয় করলে বাড়ির মেয়েদের অর্থাত্‍ আমার ননদদের কোন দোষ হয় না, সমাজে তাদের কেউ খারাপ বলে না ৷ আর আমি বাড়ির বউ বলেই আমার চরিত্র নষ্ট হয়ে যায়? এ আপনাদের কেমন বিচার?"

এসএসসি পরীক্ষার আগেই গর্ভবতী হন মরিয়ম ৷ নিজের তীব্র আগ্রহ, স্বামী ও শ্বশুরের ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও প্রবল সামাজিক বাধার কারণে পরীক্ষা দেওয়া হয়ে ওঠে নি তার ৷ যথাসময়ে জন্ম নেয় সন্তান ৷ কন্যা সন্তান ৷ চারমাস বয়সে মারা যায় অতি আদরের প্রথম সন্তান ৷ অতঃপর জীবনের নিশানা খুঁজতে মরিয়ম উপস্থিত হন স্বামীর কর্মস্থল যশোরে ৷ বিয়ের ৬ বছর পরে এই প্রথম স্বামীর সঙ্গে একটানা প্রায় তিন বছর বসবাস ৷ এই সময়ে পর পর জন্ম নেয় দু'টি মেয়ে ৷ যশোর থেকে শ্বশুর মহাশয় নাতনীসহ পুত্রবধুকে নিয়ে যান নিজের কর্মস্থল চট্টগ্রাম ৷ চট্টগ্রামে দুই বছর থেকে আবার যশোর ৷ আত্মজীবন বিকাশের তীব্র তাড়নায় অস্থির হয়ে ওঠেন মরিয়ম ৷ সেই উদ্বাস্তু জীবনের মতো এখনো যেন আজ এখানে কাল সেখানে ৷ থিতু হওয়ার দৃঢ় মনোবল নিয়ে যশোরের নারী পুর্নবাসন কেন্দ্রে ১ বছরের বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ নেন ৷ দর্জি, উল, বাঁশ ও বেতের কাজ মনোযোগ সহকারে আয়ত্ব করেন ৷ প্রশিক্ষণে বেশ সুনাম অর্জন করেন ৷ নিজের আত্মবিশ্বাস দৃঢ়মূল হয় ৷ উন্মুক্ত হয় চিন্তা ও চেতনার দ্বার ৷ সে সময়ের স্মৃতি হাতড়ে মরিয়ম বলেন, "আমার নিজের পরিবারে সে রকম কোন আর্থিক সংকট ছিল না ৷ কিন্তু আমার মন চাইতো ঘর-কন্নার বাইরে কিছু করতে, বিশেষ করে অবহেলিত নারীদের জন্য কিছু করতে ৷ এ উদ্দেশ্যেই প্রশিক্ষণ নিয়ে ফিরে যাই চুপড়িয়া ৷ নিজে সুয়েটার বোনার কাজ শুরু করি, অন্যদেরকে শেখাই ৷ আর্থিকভাবেও লাভবান হই ৷ এভাবেই মাথায় প্রবেশ করে সংগঠন গড়ে তোলার চিন্তা ৷ একক প্রচেষ্টা থেকে মরিয়ম ধাবিত হলেন সম্মিলিত উদ্যোগ ও প্রচেষ্টার দিকে ৷ চুপড়িয়া গ্রামে সন্তানসহ অনেক তালাকপ্রাপ্তা নারী ছিলেন ৷ ভিক্ষাই ছিল তাদের জীবিকার প্রধান উপায় ৷ এই রকম অসহায় দুঃস্থ নারীদের নিয়ে ১৯৮১ সালের ডিসেম্বর মাসের ১৭ তারিখে মরিয়ম বেগম গড়ে তোলেন 'চুপড়িয়া মহিলা সংস্থা' ৷ সদস্য সংখ্যা ৪০ ৷ নয়জন কার্যকরী কমিটির সদস্য এবং এরা সবাই মোটের ওপর স্বাবলম্বী ৷ বাকীরা নিঃস্ব, ভিক্ষাই তাদের প্রধান পেশা ৷ প্রাথমিকভাবে সংস্থার সবাই একসঙ্গে চালসহ নানা দ্রব্য সংগ্রহ করে দানকৃত ২ শতক জমিতে তৈরি করেন অফিস ঘর ৷ সঞ্চয়, বয়স্ক শিক্ষা, সেলাই, নারকেলের ছোবড়া দিয়ে কাতা (দড়ি) তৈরি, খেজুরের পাতার মাদুর তৈরি এসবই ছিল প্রাথমিক কর্মকাণ্ড ৷

চুপড়িয়ার মতো একটি রক্ষণশীল গ্রামে নারীদের এই কর্মকাণ্ডে তৈরি হয় বাধা ৷ নারী পাচার, বেশ্যাবৃত্তি এসব অভিযোগের সাথে সাথে 'রাষ্ট্রপতি আসবেন', 'প্রধানমন্ত্রী অফিস উদ্বোধন করবেন' ইত্যাদি নানারকম তাচ্ছিল্যভরা বয়ান শুনতে হয়েছে মরিয়মকে ৷ কিন্তু দমে যান নি ৷ এসবের মধ্যেই ৮২ সালের জুন মাসে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর থেকে সংস্থাটি রেজিস্ট্রেশনপ্রাপ্ত হয় ৷ মূলত সদস্যদের শিক্ষা ও জীবিকা অর্জনের মাধ্যমেই চলতে থাকে সমিতির কার্যক্রম ৷ ১৯৮৮ সালের প্রলয়ঙ্করী বন্যায় ভেসে যায় সমিতির অফিস ঘর ৷ আক্রান্ত হয় মরিয়মের পরিবার ৷ মরিয়ম আবার চলে যান স্বামীর কর্মস্থল ঝিকরগাছায় ৷ সংস্থার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় ৷

চুপড়িয়ায় ফিরে আসেন '৯২ সালেই ৷ পুরানো সদস্যদের নিয়ে পূর্বের মতো একই পদ্ধতিতে পুনরায় গড়ে তোলেন 'চুপড়িয়া মহিলা সংস্থা'৷ চাঁদা তুলে সেলাই মেশিন ক্রয় করে শুরু করেন দর্জি প্রশিক্ষণ ৷ যুক্ত হতে থাকে বিত্তহীন নারী, জেগে উঠতে থাকে নিম্নবিত্তের নারী ৷ প্রশিক্ষণ চলা অবস্থায় একদিন হাজির হন থানা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তাসহ বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির একজন কর্মকর্তা ৷ ভয় পেয়ে যান মরিয়ম ৷ তিনি ভাবেন নিশ্চয় কোন চক্রান্ত ৷ হয়তো বন্ধ হয়ে যাবে সংস্থা ৷ কিন্তু ফল হয় উল্টো ৷ নিভৃতে নিঃস্ব নারীদের নিয়ে কাজ করার ফল হিসেবে 'চুপড়িয়া মহিলা সংস্থা' অনুদান পায় দেড় লক্ষ টাকা ৷ বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণ নিয়ে ২৩০ জন নারী গম বরাদ্দ পান ৷ 'চুপড়িয়া মহিলা সংস্থা' এনজিও তালিকাভুক্ত হয় ৷ আর পিছনে ফিরতে হয় নি ৷ ১৯৯৮-এ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়
CCDB ৷  CCDB অফিস ব্যবস্থাপনা, শিশু শিক্ষা, বয়স্ক শিক্ষা, নারী উন্নয়ন প্রভৃতি ক্ষেত্রে আর্থিক ও সাংগঠনিক সহযোগিতা প্রদান করে ৷ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তৈরি করে দেয় দক্ষ কর্মী ৷ নির্মাণ করে দেয় সাংগঠনিক কাঠামো ৷ স্বেচ্ছাব্রতী মন নিয়ে কাজে ঝাপিয়ে পড়েন মরিয়ম ৷ জাইকার এশিয়া আর্সেনিক নেটওয়ার্কের আওতায় কাজ শুরু করেন ৷ কাজ শুরু করেন নিরাপদ পানি ও জনসচেতনতার ৷ যুক্ত হন নারীপক্ষে'র দুর্বার প্রকল্পের সঙ্গে ৷ দুর্বার-এর সাতক্ষীরা অঞ্চলের দায়িত্ব পালন করেন দুই বছর ৷ দুর্বার-এর নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব নিয়ে সারা দেশে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন পরিচালনা করেন

১৯৯৮ সালের বন্যায় দুর্যোগ মোকাবেলা কর্মকাণ্ডে মরিয়মের সততা, আন্তরিকতা ও দায়িত্ববোধ সর্বস্তরের মানুষের নজর কাড়ে
৷ গোটা সাতক্ষীরায় প্রশাসন থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যে মরিয়মের নানা রকম কর্মতত্‍পরতার খবর ছড়িয়ে পড়ে ৷ এ সময় সাতক্ষীরার স্থানীয় এনজিওগুলো সংগঠিত হয়ে গঠন করে নেটওয়ার্ক ৷ নাম CDN ৷ মরিয়ম CDN-এর সভাপতি নির্বাচিত হন

ছোট ক্ষেত্র থেকে বড় ক্ষেত্রে কাজে নেমে সম্মুখীন হলেন নতুন নতুন প্রতিবন্ধকতার
৷ নিঃস্ব দরিদ্রদের মধ্যে স্বল্পশিক্ষিত মরিয়ম যে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন- বৃহত্‍ পরিসরে বিশেষ করে থানা, প্রশাসন, শিক্ষিতজন প্রমুখের সঙ্গে যখন কাজ করতে হয় তখন সেই স্বাচ্ছন্দ্য থাকে না ৷ কারণ শিক্ষিত মধ্যবিত্তজনেরা মরিয়মের স্বল্পশিক্ষার সুযোগ নিতে থাকে ৷ নানাভাবে তাকে ও তার সংগঠনকে দমিয়ে রাখার একটা প্রবনতা তিনি লক্ষ করেন ৷ দক্ষ লোকের অভাবে বিরাট কর্মএলাকা সুনিপুনতার সঙ্গে পরিচালনা করতে হিমসিম খাচ্ছিলেন ৷ এরকম অবস্থায় CDN -এর সিস্টার অর্গানাইজেশন 'অগ্রগতি সংস্থা'র মাধ্যমে মরিয়মের পরিচয় হয় দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-বাংলাদেশ এর সঙ্গে ৷ ২০০০ সালের ৩৭তম ব্যাচে গ্রহণ করেন উজ্জীবক প্রশিক্ষণ ৷ দারুণভাবে আলোড়িত হন মরিয়ম ৷ বাইরের জগতে সুষ্ঠু ও সুচারুভাবে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একজন মানুষের যে অন্তর্গত শক্তির প্রয়োজন হয় তার যোগান তৈরি হয় এই প্রশিক্ষণ থেকে ৷ প্রচলিত অর্থে একটি দরিদ্র দেশের দরিদ্রতম ও রক্ষণশীল অঞ্চলের নারী উন্নয়নে দার্শনিক দিকটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ৷ অতঃপর মরিয়ম নিজেকে আবিস্কার করেন একজন সচেতন, সংগ্রামী ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন নারী নেত্রী হিসেবে ৷ সাতক্ষীরার মানুষ মরিয়মকে এভাবেই জানে

চুপড়িয়ায় তো বটেই গোটা সাতক্ষীরার সমাজ উন্নয়ন ও নারী উন্নয়নের অপরিহার্য অনুঘটকে পরিণত হয়েছেন মরিয়ম
৷ নারী নির্যাতনে তার ভূমিকা অত্যন্ত বলিষ্ঠ ৷ যে ফতোয়াবাজরা একসময় নিকৃষ্টভাবে মরিয়মকে জ্বালাতন করেছে তারা এখন তাকে সমীহ করে ৷ তালাকপ্রাপ্ত, এসিড দগ্ধ, যৌতুকের শিকার, বঞ্চিত, নির্যাতিত নারীরা যে কোন সংকটে দৌড়ে আসে মরিয়মের নিকট ৷ তারা সান্ত্বনা পায়, শক্তি পায়, পায় ভরসা ৷ নারী পাচারকারীদের হাতে নাতে ধরে পুলিশে দেওয়া, এসিড দগ্ধ নারীদের চিকিত্‍সার জন্য ঢাকায় নিয়ে আসা মরিয়মের নিয়মিত কাজের অংশ ৷ সাতক্ষীরায় কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের ওপর মৌলবাদীরা যখন হিংস্র হয়ে ওঠে তখন প্রতিবাদী জনতার অগ্রসর কাতারে অবস্থান করে মরিয়ম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন ৷ মরিয়মের সংগঠনের পক্ষ থেকে চুপড়িয়ায় ১১ জন ধাত্রীমাতা নিয়োগ করা হয়েছে - যারা বিনা ফি'তে সেবা দেয় ৷ পারিবারিক ও সামাজিক দ্বন্দ্ব-কোন্দল নিরসনে মরিয়ম শালিশের মাধ্যমে ভূমিকা করেন ৷ কিছু কিছু অনুদান এবং মূলত স্ব-অর্থায়নে পরিচালিত 'চুপড়িয়া মহিলা সংস্থা'র কাজের কোন অন্ত নেই ৷ মধু চাষ, মাছ চাষ, হস্তশিল্প, স্বাস্থ্যপরিচর্চা (মা ও শিশু), রিং-স্ল্যাব বিতরণ, দর্জির কাজ, স্যাভলন ও সাবান বিতরণ, বিভিন্ন দিবস পালন, নানা ট্রেডে প্রশিক্ষণ, উজ্জীবক প্রশিক্ষণ, নারী নেতৃত্ব বিকাশ শীর্ষক প্রশিক্ষণ গ্রহণ ইত্যাদি এর অন্যতম ৷ এত কিছুর পরেও এক প্রশ্নের জবাবে মরিয়ম বলেন, "উমেদ ভাই, অন্যদের কাজকেই সব সময় নিজের কাজ মনে করেছি ৷ এ কারণে নিজের জন্য আলাদা করে কিছু করা হয় নি ৷ তবে নিজের সন্তানদেরকে আমি মানুষের মত মানুষ করার চেষ্টা করেছি এবং করছি ৷ সত্যি কথা বলতে কী মাদার তেরেসার জীবন আমাকে একটি পথ দেখায় ৷ সেই পথ ধরে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করি ৷ এটাই আমার আত্মতুষ্টি অথবা গর্ব ৷"

- আলী উমেদ

 

Previous Article<Index>Next Article


Home  / Feedback / Subscribe

© 2006 The Hunger Project-Bangladesh. All rights reserved.