|
মাদার তেরেসা আমার আদর্শ, নারীত্ব আমার শক্তি - মরিয়ম মান্নান
এই প্রথম আমি একজন নারীর কন্ঠে শুনলাম পুরুষ সংক্রান্ত একটি শক্তিশালী
উপমা, একটি যথাযথ বিশেষণ ৷ কুশল বিনিময়ের সময় তিনি অন্য একজন নারীকে
জিজ্ঞাসা করছিলেন, "তোমার হাতুড়ি কেমন আছে"৷ স্বামী সংক্রান্ত এই রকম
বাস্তব সম্মত, যুতসই এবং প্রতিবাদী ভাষা আমি কখনো কোন আক্রমণাত্মক
নারীবাদী নারী কর্মীর কন্ঠেও শুনতে পাই নি ৷ তিনি একজন প্রান্তিক নারী ৷ তার
নাম মরিয়ম মান্নান ৷ হতে চেয়েছিলেন কবি - হতে পারেন নি ৷ তাতে আশাহত নন ৷
কারণ মাদার তেরেসার জীবন ও কর্ম তার নিকট মনে হলো কবিতার চেয়েও অনেক বড়
কিছু ৷ তাই জীবনের প্রারম্ভেই পা বাড়ান সে পথে ৷ পথ বড় দুর্গম ৷ তাই বলে থেমে
যান নি ৷ আজও চলছে তার তেরেসীয় কায়দায় নিরন্তর পথ চলা ৷ মরিয়ম মান্নানের বয়স
৪৩ ৷ শরীরটি দুর্দান্ত পরিশ্রমী ৷ প্রাচীন পাথরের মতে শক্ত মনোবল ৷ সংবেদনশীল
হৃদয় ৷ এবং এসবই যেন আর সব নির্যাতিত নারীদের জন্য নিবেদিত ৷ সংগ্রামমুখর
জীবনের পথ পরিক্রমায় তিনি আজ অবহেলিত, নির্যাতিত, নিঃস্ব নারীদের নির্ভীক
কাণ্ডারী; প্রান্তিক অঞ্চলে নারী জাগরণের পথ নির্দেশক; স্বমহিমায় পথ চলা
একজন বলিষ্ঠ নারী ৷

মরিয়ম মান্নানের জন্ম ষাটের দশকের প্রারম্ভে ৷ ভারতের চব্বিশ পরগনার
বাদড়িয়া থানার দেওড়া গ্রাম তার জন্মস্থান ৷ ১৯৬৫ সালের দাঙ্গায় দেশান্তরী
হন ৷ রাতের অন্ধকারে সহায় সম্পত্তি ছেড়ে আল্লাহু আকবর আর বন্দে মাতরম
ধ্বনির হিংস্রতার ভেতর দিয়ে শিশু মরিয়ম পরিবারের সাথে তীব্র অনিশ্চয়তার পথ
পাড়ি দিয়ে উপস্থিত হন সাতক্ষীরা ৷ ছোট খাট তালুকের মালিক মধ্যবিত্ত শ্রেণীর
পরিবারটি মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে পরিণত হন শরনার্থীতে, উদ্বাস্তুতে ৷
সাতক্ষীরা আসার পথে ওপাড় বাংলা ও এপাড় বাংলার বিভিন্ন রিফিউজি ক্যাম্পের
অভিজ্ঞতা আর পথিমধ্যে ওত্ পেতে থাকা মৃত্যুভয় গাঢ় ছাপ ফেলে শিশু মরিয়মের
মনে ৷ সাতক্ষীরা শহরের পিটিআইতে ৬ মাস উদ্বাস্তু জীবন-যাপনের পর লটারির
মাধ্যমে মরিয়মের পরিবার স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ পায় সদর থানার চুপড়িয়া
গ্রামে ৷ একদিকে জীবিকার সংকট অন্যদিকে চুপড়িয়াবাসীর সঙ্গে মরিয়মদের
সাংস্কৃতিক ব্যবধান - দু'য়ে মিলে অস্তিত্বের সংকটে আবর্তিত হতে থাকে তারা ৷
মরিয়মের ভাষায়, "চুপড়িয়ার সাধারণ নারীরা ব্লাউজ, পেটিকোট পরতো না ৷
অন্যদিকে আমার মা-চাচীরা ওসব পরতো এবং কিছুটা সাজগোজও করতো ৷ দারুণভাবে
নিন্দিত হতো এসব ৷ এমনকি কেউ কেউ বেশ্যার সঙ্গেও তুলনা করতো আমাদের"৷ অবশ্য
মরিয়মের বাবা বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে চুপড়িয়াবাসীর মন জয় করেন ৷ কিন্তু তীব্র
আর্থিক সংকটে পড়ে তারা তালা থানার পাটকেলঘাটার কুমিরা গ্রামে এক আত্মীয়ের
বাড়িতে আশ্রয় নেন ৷ মরিয়মের বাবা তার এক আত্মীয়ের দোকানে কাজ নেন ৷ এক সময়
ছোট্ট মরিয়মের পরামর্শে তার পিতা খুব ছোট একটি দোকান করেন ৷
পাটকেলঘাটাতেই বিয়ে হয় তৃতীয় শ্রেণীতে পাঠরত শিশু মরিয়মের ৷ মরিয়মের
পক্ষে কবুল বলেন তার পিতা ৷ স্বামী জনতা ব্যাংকের নবীন চাকুরে ৷ বাড়ি
নোয়াখালী ৷ '৬৯ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত বিয়েটি মরিয়মের পিতার
সচেতনতার কারণে রেজিস্ট্রিও হয় ৷ ৬৯ থেকে ৭১ ৷ খুব দ্রুত পার হয় সময়টা ৷
পিতার সংসার চলে আসে আবার চুপড়িয়ায় ৷ স্বামী চলে যায় কর্মস্থল যশোরে ৷ আর
মরিয়ম যান শ্বশুর বাড়িতে ৷ চবি্বশপরগনা থেকে সাতক্ষীরা, সাতক্ষীরা থেকে
এবার নোয়াখালী ৷
একদিকে ভিন্ন পরিবেশ, ভিন্ন সংস্কৃতি, রক্ষণশীল সমাজ, অন্যদিকে
বাল্যবধু, পোড়খাওয়া মন আর ডানপিটে স্বভাব ৷ কিন্তু কোন অঘটন ঘটল না ভাল
মানুষ শ্বশুরের কারণে ৷ মরিয়মকে তিনি ভালবাসতেন মেয়ের অধিক জেনে ৷ চঞ্চল
স্বভাব, বার বার নীড় হারানো মন আর পশ্চিমবাংলার মিষ্টি ভাষা নরম করে
দিয়েছিল শ্বশুরের অন্তর ৷ মরিয়মকে তিনি ভর্তি করে দেন সেনবাগ উচ্চ বালিকা
বিদ্যালয়ে ৷ ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে ৷ শুরু হয় মরিয়মের জীবনের সাধনা ৷ নিজেকে গড়ে
তোলার সংগ্রাম ৷ বাড়ির বউ হিসেবে সমস্ত কাজ শেষ করে স্কুলের ঘন্টা বাজার
পরে মরিয়ম হাজির হতেন ক্লাসে ৷ স্বামী-শ্বশুর বাদে সবাই ঘোর বিরোধী ছিল
মরিয়মের লেখা-পড়ার ব্যাপারে ৷ এ ছাড়া মরিয়মের ডানপিটে স্বভাবও সবাইকে
ক্ষুব্ধ করে তুলেছিল ৷ দেবর-ননদদের নিয়ে বিকেলে মাঠে খেলা করা, সিনেমা,
নাটক, যাত্রা ইত্যাদি দেখা বাড়ির বউ হিসেবে কেউ মেনে নিতে পারে নি ৷ একবার
স্কুলে 'পথের মেয়ে' নামক একটি নাটকে অভিনয়ও করেছিলেন মরিয়ম ৷ এর ফলে
আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশির চাপে কিশোরী বধুর সংসার বুঝি ভেঙ্গে যায়
যায় অবস্থা ৷ কিন্তু নমনীয় হন নি মরিয়ম ৷ যুক্তির আশ্রয়ে সেই প্রথম নারী
হিসেবে বলিষ্ঠ প্রতিবাদ ৷ স্বামী, শ্বশুর এবং শিক্ষকদের কারণে রেহাই পেয়ে
যান রক্ষণশীল সমাজের হিংস্র ছোবল থেকে ৷ এ প্রসঙ্গে মরিয়ম বলেন, "শৈশব
থেকেই আমি আমার বাবাসহ বয়স্কদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে যুক্তি দিয়ে তর্ক
করতাম ৷ এ অভ্যাসটা এখনও ছাড়তে পারি নি ৷ এ জন্য জীবনে অনেক ভোগান্তি হয়েছে ৷
কিন্তু ভোগান্তি থাকলেও এই তর্কই আমার জীবনে সফলতা এনে দিয়েছে ৷ সেদিন আমি
বিনয়ের সাথে মুরুব্বীদের মুখের সামনে বলেছিলাম, খেলাধুলা করলে
যাত্রা-সিনেমা দেখলে, নাটকে অভিনয় করলে বাড়ির মেয়েদের অর্থাত্ আমার
ননদদের কোন দোষ হয় না, সমাজে তাদের কেউ খারাপ বলে না ৷ আর আমি বাড়ির বউ
বলেই আমার চরিত্র নষ্ট হয়ে যায়? এ আপনাদের কেমন বিচার?"
এসএসসি পরীক্ষার আগেই গর্ভবতী হন মরিয়ম ৷ নিজের তীব্র আগ্রহ, স্বামী ও
শ্বশুরের ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও প্রবল সামাজিক বাধার কারণে পরীক্ষা দেওয়া
হয়ে ওঠে নি তার ৷ যথাসময়ে জন্ম নেয় সন্তান ৷ কন্যা সন্তান ৷ চারমাস বয়সে মারা
যায় অতি আদরের প্রথম সন্তান ৷ অতঃপর জীবনের নিশানা খুঁজতে মরিয়ম উপস্থিত হন
স্বামীর কর্মস্থল যশোরে ৷ বিয়ের ৬ বছর পরে এই প্রথম স্বামীর সঙ্গে একটানা
প্রায় তিন বছর বসবাস ৷ এই সময়ে পর পর জন্ম নেয় দু'টি মেয়ে ৷ যশোর থেকে
শ্বশুর মহাশয় নাতনীসহ পুত্রবধুকে নিয়ে যান নিজের কর্মস্থল চট্টগ্রাম ৷
চট্টগ্রামে দুই বছর থেকে আবার যশোর ৷ আত্মজীবন বিকাশের তীব্র তাড়নায় অস্থির
হয়ে ওঠেন মরিয়ম ৷ সেই উদ্বাস্তু জীবনের মতো এখনো যেন আজ এখানে কাল সেখানে ৷
থিতু হওয়ার দৃঢ় মনোবল নিয়ে যশোরের নারী পুর্নবাসন কেন্দ্রে ১ বছরের
বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ নেন ৷ দর্জি, উল, বাঁশ ও বেতের কাজ মনোযোগ সহকারে
আয়ত্ব করেন ৷ প্রশিক্ষণে বেশ সুনাম অর্জন করেন ৷ নিজের আত্মবিশ্বাস দৃঢ়মূল
হয় ৷ উন্মুক্ত হয় চিন্তা ও চেতনার দ্বার ৷ সে সময়ের স্মৃতি হাতড়ে মরিয়ম
বলেন, "আমার নিজের পরিবারে সে রকম কোন আর্থিক সংকট ছিল না ৷ কিন্তু আমার মন
চাইতো ঘর-কন্নার বাইরে কিছু করতে, বিশেষ করে অবহেলিত নারীদের জন্য কিছু
করতে ৷ এ উদ্দেশ্যেই প্রশিক্ষণ নিয়ে ফিরে যাই চুপড়িয়া ৷ নিজে সুয়েটার বোনার
কাজ শুরু করি, অন্যদেরকে শেখাই ৷ আর্থিকভাবেও লাভবান হই ৷ এভাবেই মাথায়
প্রবেশ করে সংগঠন গড়ে তোলার চিন্তা ৷ একক প্রচেষ্টা থেকে মরিয়ম ধাবিত হলেন
সম্মিলিত উদ্যোগ ও প্রচেষ্টার দিকে ৷ চুপড়িয়া গ্রামে সন্তানসহ অনেক
তালাকপ্রাপ্তা নারী ছিলেন ৷ ভিক্ষাই ছিল তাদের জীবিকার প্রধান উপায় ৷ এই রকম
অসহায় দুঃস্থ নারীদের নিয়ে ১৯৮১ সালের ডিসেম্বর মাসের ১৭ তারিখে মরিয়ম
বেগম গড়ে তোলেন 'চুপড়িয়া মহিলা সংস্থা' ৷ সদস্য সংখ্যা ৪০ ৷ নয়জন কার্যকরী
কমিটির সদস্য এবং এরা সবাই মোটের ওপর স্বাবলম্বী ৷ বাকীরা নিঃস্ব, ভিক্ষাই
তাদের প্রধান পেশা ৷ প্রাথমিকভাবে সংস্থার সবাই একসঙ্গে চালসহ নানা দ্রব্য
সংগ্রহ করে দানকৃত ২ শতক জমিতে তৈরি করেন অফিস ঘর ৷ সঞ্চয়, বয়স্ক শিক্ষা,
সেলাই, নারকেলের ছোবড়া দিয়ে কাতা (দড়ি) তৈরি, খেজুরের পাতার মাদুর তৈরি
এসবই ছিল প্রাথমিক কর্মকাণ্ড ৷
চুপড়িয়ার মতো একটি রক্ষণশীল গ্রামে নারীদের এই কর্মকাণ্ডে তৈরি হয়
বাধা ৷ নারী পাচার, বেশ্যাবৃত্তি এসব অভিযোগের সাথে সাথে 'রাষ্ট্রপতি
আসবেন', 'প্রধানমন্ত্রী অফিস উদ্বোধন করবেন' ইত্যাদি নানারকম তাচ্ছিল্যভরা
বয়ান শুনতে হয়েছে মরিয়মকে ৷ কিন্তু দমে যান নি ৷ এসবের মধ্যেই ৮২ সালের জুন
মাসে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর থেকে সংস্থাটি রেজিস্ট্রেশনপ্রাপ্ত হয় ৷ মূলত
সদস্যদের শিক্ষা ও জীবিকা অর্জনের মাধ্যমেই চলতে থাকে সমিতির কার্যক্রম ৷
১৯৮৮ সালের প্রলয়ঙ্করী বন্যায় ভেসে যায় সমিতির অফিস ঘর ৷ আক্রান্ত হয়
মরিয়মের পরিবার ৷ মরিয়ম আবার চলে যান স্বামীর কর্মস্থল ঝিকরগাছায় ৷ সংস্থার
কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় ৷
চুপড়িয়ায় ফিরে আসেন '৯২ সালেই ৷ পুরানো সদস্যদের নিয়ে পূর্বের মতো একই
পদ্ধতিতে পুনরায় গড়ে তোলেন 'চুপড়িয়া মহিলা সংস্থা'৷ চাঁদা তুলে সেলাই
মেশিন ক্রয় করে শুরু করেন দর্জি প্রশিক্ষণ ৷ যুক্ত হতে থাকে বিত্তহীন নারী,
জেগে উঠতে থাকে নিম্নবিত্তের নারী ৷ প্রশিক্ষণ চলা অবস্থায় একদিন হাজির হন
থানা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তাসহ বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির একজন কর্মকর্তা ৷ ভয়
পেয়ে যান মরিয়ম ৷ তিনি ভাবেন নিশ্চয় কোন চক্রান্ত ৷ হয়তো বন্ধ হয়ে যাবে
সংস্থা ৷ কিন্তু ফল হয় উল্টো ৷ নিভৃতে নিঃস্ব নারীদের নিয়ে কাজ করার ফল
হিসেবে 'চুপড়িয়া মহিলা সংস্থা' অনুদান পায় দেড় লক্ষ টাকা ৷ বিভিন্ন ট্রেডে
প্রশিক্ষণ নিয়ে ২৩০ জন নারী গম বরাদ্দ পান ৷ 'চুপড়িয়া মহিলা সংস্থা' এনজিও
তালিকাভুক্ত হয় ৷ আর পিছনে ফিরতে হয় নি ৷ ১৯৯৮-এ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়
CCDB
৷ CCDB
অফিস ব্যবস্থাপনা, শিশু শিক্ষা, বয়স্ক শিক্ষা, নারী উন্নয়ন
প্রভৃতি ক্ষেত্রে আর্থিক ও সাংগঠনিক সহযোগিতা প্রদান করে
৷ প্রশিক্ষণের
মাধ্যমে তৈরি করে দেয় দক্ষ কর্মী
৷ নির্মাণ করে দেয় সাংগঠনিক কাঠামো
৷
স্বেচ্ছাব্রতী মন নিয়ে কাজে ঝাপিয়ে পড়েন মরিয়ম
৷ জাইকার এশিয়া আর্সেনিক
নেটওয়ার্কের আওতায় কাজ শুরু করেন
৷ কাজ শুরু করেন নিরাপদ পানি ও
জনসচেতনতার
৷ যুক্ত হন নারীপক্ষে'র দুর্বার প্রকল্পের সঙ্গে
৷ দুর্বার-এর
সাতক্ষীরা অঞ্চলের দায়িত্ব পালন করেন দুই বছর
৷ দুর্বার-এর নির্বাচন
কমিশনের দায়িত্ব নিয়ে সারা দেশে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন পরিচালনা করেন
৷
১৯৯৮ সালের বন্যায় দুর্যোগ মোকাবেলা কর্মকাণ্ডে মরিয়মের সততা,
আন্তরিকতা ও দায়িত্ববোধ সর্বস্তরের মানুষের নজর কাড়ে
৷ গোটা সাতক্ষীরায়
প্রশাসন থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যে মরিয়মের নানা রকম কর্মতত্পরতার খবর
ছড়িয়ে পড়ে
৷ এ সময় সাতক্ষীরার স্থানীয় এনজিওগুলো সংগঠিত হয়ে গঠন করে
নেটওয়ার্ক
৷ নাম CDN
৷ মরিয়ম CDN-এর সভাপতি নির্বাচিত হন
৷
ছোট ক্ষেত্র থেকে বড় ক্ষেত্রে কাজে নেমে সম্মুখীন হলেন নতুন নতুন
প্রতিবন্ধকতার
৷ নিঃস্ব দরিদ্রদের মধ্যে স্বল্পশিক্ষিত মরিয়ম যে
স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন- বৃহত্ পরিসরে বিশেষ করে থানা, প্রশাসন, শিক্ষিতজন
প্রমুখের সঙ্গে যখন কাজ করতে হয় তখন সেই স্বাচ্ছন্দ্য থাকে না
৷ কারণ
শিক্ষিত মধ্যবিত্তজনেরা মরিয়মের স্বল্পশিক্ষার সুযোগ নিতে থাকে
৷ নানাভাবে
তাকে ও তার সংগঠনকে দমিয়ে রাখার একটা প্রবনতা তিনি লক্ষ করেন
৷ দক্ষ লোকের
অভাবে বিরাট কর্মএলাকা সুনিপুনতার সঙ্গে পরিচালনা করতে হিমসিম খাচ্ছিলেন
৷
এরকম অবস্থায়
CDN
-এর সিস্টার অর্গানাইজেশন 'অগ্রগতি সংস্থা'র মাধ্যমে
মরিয়মের পরিচয় হয় দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-বাংলাদেশ এর সঙ্গে
৷ ২০০০ সালের ৩৭তম
ব্যাচে গ্রহণ করেন উজ্জীবক প্রশিক্ষণ
৷ দারুণভাবে আলোড়িত হন মরিয়ম
৷ বাইরের
জগতে সুষ্ঠু ও সুচারুভাবে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একজন মানুষের যে
অন্তর্গত শক্তির প্রয়োজন হয় তার যোগান তৈরি হয় এই প্রশিক্ষণ থেকে
৷ প্রচলিত
অর্থে একটি দরিদ্র দেশের দরিদ্রতম ও রক্ষণশীল অঞ্চলের নারী উন্নয়নে
দার্শনিক দিকটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে
৷ অতঃপর মরিয়ম
নিজেকে আবিস্কার করেন একজন সচেতন, সংগ্রামী ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন নারী
নেত্রী হিসেবে
৷ সাতক্ষীরার মানুষ মরিয়মকে এভাবেই জানে
৷
চুপড়িয়ায় তো বটেই গোটা সাতক্ষীরার সমাজ উন্নয়ন ও নারী উন্নয়নের
অপরিহার্য অনুঘটকে পরিণত হয়েছেন মরিয়ম
৷ নারী নির্যাতনে তার ভূমিকা অত্যন্ত
বলিষ্ঠ
৷ যে ফতোয়াবাজরা একসময় নিকৃষ্টভাবে মরিয়মকে জ্বালাতন করেছে তারা এখন
তাকে সমীহ করে
৷ তালাকপ্রাপ্ত, এসিড দগ্ধ, যৌতুকের শিকার, বঞ্চিত,
নির্যাতিত নারীরা যে কোন সংকটে দৌড়ে আসে মরিয়মের নিকট
৷ তারা সান্ত্বনা
পায়, শক্তি পায়, পায় ভরসা
৷ নারী পাচারকারীদের হাতে নাতে ধরে পুলিশে দেওয়া,
এসিড দগ্ধ নারীদের চিকিত্সার জন্য ঢাকায় নিয়ে আসা মরিয়মের নিয়মিত কাজের
অংশ
৷ সাতক্ষীরায় কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের ওপর মৌলবাদীরা যখন হিংস্র হয়ে ওঠে
তখন প্রতিবাদী জনতার অগ্রসর কাতারে অবস্থান করে মরিয়ম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
পালন করেন ৷ মরিয়মের সংগঠনের পক্ষ থেকে চুপড়িয়ায় ১১ জন ধাত্রীমাতা নিয়োগ
করা হয়েছে - যারা বিনা ফি'তে সেবা দেয় ৷ পারিবারিক ও সামাজিক
দ্বন্দ্ব-কোন্দল নিরসনে মরিয়ম শালিশের মাধ্যমে ভূমিকা করেন ৷ কিছু কিছু
অনুদান এবং মূলত স্ব-অর্থায়নে পরিচালিত 'চুপড়িয়া মহিলা সংস্থা'র কাজের কোন
অন্ত নেই ৷ মধু চাষ, মাছ চাষ, হস্তশিল্প, স্বাস্থ্যপরিচর্চা (মা ও শিশু),
রিং-স্ল্যাব বিতরণ, দর্জির কাজ, স্যাভলন ও সাবান বিতরণ, বিভিন্ন দিবস
পালন, নানা ট্রেডে প্রশিক্ষণ, উজ্জীবক প্রশিক্ষণ, নারী নেতৃত্ব বিকাশ
শীর্ষক প্রশিক্ষণ গ্রহণ ইত্যাদি এর অন্যতম ৷ এত কিছুর পরেও এক প্রশ্নের
জবাবে মরিয়ম বলেন, "উমেদ ভাই, অন্যদের কাজকেই সব সময় নিজের কাজ মনে করেছি ৷
এ কারণে নিজের জন্য আলাদা করে কিছু করা হয় নি ৷ তবে নিজের সন্তানদেরকে আমি
মানুষের মত মানুষ করার চেষ্টা করেছি এবং করছি ৷ সত্যি কথা বলতে কী মাদার
তেরেসার জীবন আমাকে একটি পথ দেখায় ৷ সেই পথ ধরে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করি ৷
এটাই আমার আত্মতুষ্টি অথবা গর্ব ৷"
- আলী উমেদ
|