নারী পাতা

জ্জীবক বার্তা, বর্ষ-, সংখ্যা-২৭, এপ্রিল - মে ২০০৬

 

'নারী নেতৃত্ব বিকাশ' প্রশিক্ষণ এবং শাহনাজ পারভীন

বাংলাদেশের নারীরা রক্ষণশীলতায় আবদ্ধ, পশ্চাত্‍পদ এবং সমাজ ও পুরুষ শ্রেণী কর্তৃক নির্যাতিত, অবহেলিত, পীড়িত - এই বাস্তবতা আজ কেউ আর তেমন অস্বীকার করে না ৷ পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রে নারীদের এই দুর্বল অবস্থান যুগ যুগ ধরে টিকে থাকার অনেক কারণ রয়েছে, যার মধ্যে প্রধান হচ্ছে পুরুষতান্ত্রিকতা ৷ কিন্তু আমরা আমাদের অতীতের দিকে তাকালে - এবং বর্তমানেও - দেখা যায় সচেতন ও সাহসী প্রতিরোধ অনেক ক্ষেত্রেই পরিস্থিতিকে বদলে দেয় ৷ প্রতি

বাদ-প্রতিরোধের অর্ন্তশক্তি নারী ধারন করে ৷ কিন্তু বেশিরভাগ নারীর ক্ষেত্রেই এ শক্তির জাগরণ ঘটে না, থাকে সুপ্ত অবস্থায় ৷ সুপ্ত শক্তির জাগরণের জন্য প্রয়োজন ব্যক্তি, পরিবার, সংগঠন, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ৷ বাইরের সহযোগিতার স্পর্শে জেগে উঠবে নারীর মরিচিকা ধরা সুপ্ত অথচ শক্তিশালী প্রাণটি ৷ এই জাগিয়ে দেওয়ার কাজটি অনেকেই করছেন ৷ দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-বাংলাদেশ ২০০৬ সালের শুরু থেকেই সারা দেশের সম্ভাবনাময়ী নারীশক্তির বিকাশের লক্ষ্যে শুরু করেছে 'নারী নেতৃত্ব বিকাশ' শীর্ষক প্রশিক্ষণ ৷ এই প্রশিক্ষণের ফলে একদল নারী পুরানো ধ্যান-ধারণা ঝেড়ে ফেলে নেমে পড়েছেন আত্ম-অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে ৷ এমনি একজন নারী সাতক্ষীরার এ্যাডভোকেট শাহনাজ পারভীন ৷

শাহনাজ পারভীন সাতক্ষীরা জজকোর্টের উকিল ৷ ইচ্ছা-অনিচ্ছার দোলাচলে দুলতে দুলতে মার্চের শেষ সপ্তাহে যশোরের
RRF'-এ 'নারী নেতৃত্ব বিকাশ' শীর্ষক তিন দিনের প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করেন ৷ প্রশিক্ষণের আয়োজক দি-হাঙ্গার প্রজেক্ট-বাংলাদেশ ৷ প্রশিক্ষণের আগের এবং পরের শাহনাজ পারভীন যেন আলাদা মানুষ ৷ মানব কল্যাণের ও নারী জাগরণের ক্ষেত্রে তার সুপ্ত কর্মইচ্ছা আচ্ছাদন ভেদ করে, খোলস ছেড়ে বের হয়ে আসে এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে

ব্যাপক উদ্দীপনা নিয়ে ফিরে যান সাতক্ষীরা
৷ মার্চের মাঝামাঝি পলাশপোল এলাকায় জন্ম নেয় 'নবোদিত মহিলা সংঘ' নামে একটি নারী সংগঠন ৷ এই নারীরা প্রশিক্ষণের আগে শাহনাজের কাছে এসেছে বেশ কয়েক বার ৷ তিনি গা করেন নি, অহেতুক ঝামেলায় জড়াতে চান নি ৷ কিন্তু প্রশিক্ষণ থেকে ফিরে নিজের উদ্যোগে যোগাযোগ করলেন তাদের সাথে ৷ সংঘের উপদেষ্টা হিসেবে যুক্ত হয়ে শক্ত হাতে হাল ধরলেন এই সংগঠনের ৷ সিদ্ধান্ত নিলেন পলাশপোলের মাদক ব্যবসায়ী, মাদক সম্রাট আদর আলীর কবল থেকে মুক্ত করবেন যুব সমাজকে, উচ্ছেদ করবেন তাকে ৷ এর আগেও অনেকে চেষ্টা করেছেন, পারেন নি ৷ শাহনাজ পারভীন সংঘের ১৫০ জন সদস্যকে নিয়ে প্রাথমিকভাবে শুরু করেন আদর আলীর দোকান পাহারা দেওয়া ৷ অতঃপর ২১ এপ্রিল ২০০৬-এ সম্মিলিতভাবে তালা ঝুলিয়ে দেয়া হয় দোকানে ৷ চলতে থাকে নানা কর্মসূচি ৷ কিন্তু বন্ধ হয় না মাদক ব্যবসা ৷ আদর আলী বাড়িতেই পরিবারের সবার সহযোগিতায় এ ব্যবসা চালাতে থাকে ৷ ১১ মে রাতের বেলা 'নবোদিত নারী সংঘে'র সবাই লাঠিসোটা নিয়ে ঘেরাও করে আদর আলীর বাড়ি ৷ সাদা পোষাকে প্রবেশ করে পুলিশ - যারা আদর আলীর সহযোগী

তখন রাত প্রায় ১২টা
৷ বেজে ওঠে নারী সংগঠনের নিজস্ব সাইরেন ৷ জড়ো হয় প্রায় ৪৫০ নারী-পুরুষ ৷ বন্দী হয় দুই পুলিশ ৷ এরপর থানার সেকেন্ড অফিসার এসেও বন্দী হয় ৷ এক পর্যায়ে গভীর রাতে হাজির হন এএসপি দেলোয়ার হোসেন সাঈদী ৷ তিনি এসে গ্রেফতার করেন আদর আলীর স্ত্রীকে, ক্লোজ করেন দুই পুলিশকে ৷ পরবর্তীতে পৌর চেয়ারম্যান ও নবোদিত সংঘের যৌথসভায় এই সিদ্ধান্ত হয় যে আদর আলী এলাকার বাড়ি বিক্রি করে অন্য কোথাও চলে যাবে ৷ এই কাজে শাহনাজ ছাড়াও নেতৃত্বের ভূমিকায় ছিলেন সংঘের সভাপতি মমতাজ বেগম, সাধারণ সম্পাদিকা মিসেস মিরা, স্থানীয় মহিলা কমিশনার মর্জিনা বেগম, পৌর কমিশনার আনিস খান চৌধুরী বকুল, এডভোকেট আনোয়ার-উস-সাদাত প্রমুখ

প্রশিক্ষণ থেকে ফিরে শাহনাজ তার সহযোগীদের নিয়ে অনেক কাজে হাত দেন
৷ তাদের তত্‍পরতা ও চাপের ফলে পলাশপোল এলাকার কোন দোকানদার অপ্রাপ্ত বয়স্কদের নিকট সিগারেট বিক্রি করতে পারে না ৷ নারী পাচারসহ অসত্‍ কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকা একজন মহিলাকে ইতোমধ্যেই উচ্ছেদ করা হয়েছে গ্রাম থেকে ৷ হেরোইনসেবী স্বামীর কারণে প্রায় ভেঙ্গে যাওয়া একটি সংসার পুনর্গঠন করেছেন শাহনাজ ৷ সদর থানার মাগুরাতে তার উদ্যোগে গড়ে উঠেছে 'নবদীপ্ত নারী সংগঠন' ৷ এ ছাড়া 'সুজনে'র মানববন্ধনে যোগদান, লোডশেডিং-এর প্রতিবাদে পাওয়ার হাউজ ঘেরাও, পহেলা বৈশাখ উদ্যাপন, মিলাদ মাহফিলের আয়োজন প্রভৃতি কাজগুলো শাহনাজ বেগমের নেতৃত্বে 'নবোদিত নারী সংঘ' অত্যন্ত সুচারুভাবে পরিচালনা করে যাচ্ছে

একটি প্রচলিত উদাহারণ আছে ডিম নিয়ে
৷ ডিমের অভ্যন্তরীণ গুণ এবং বাইরে থেকে তাপ প্রয়োগ - এ দুয়ের সংযোগেই ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়ে আসে ৷ দু'টো দিকের কোনটিই কম গুরুত্বপূর্ণ নয় ৷ শাহনাজ এবং 'নারী নেতৃত্ব বিকাশ' শীর্ষক প্রশিক্ষণের সম্পর্কটি এরকমই ৷ কর্মশালায় অংশগ্রহণ করার পর থেকে প্রায় দুই মাস সময়ের মাঝে অনেকগুলো কাজ করে শাহনাজ আত্মশক্তিকে অনুভব করতে পারছেন ৷ নিজের ভেতর আবিষ্কার করেছেন বিশাল সম্ভাবনা ৷ তিনি মনে করেন, "এরকম প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নারীর ভেতরের শক্তি জাগরিত হবে, পরিবর্তিত হবে বাংলাদেশের নারীর বর্তমান অবস্থা"৷

- আলী উমেদ

 

Previous Article<Index>Next Article


Home  / Feedback / Subscribe

© 2006 The Hunger Project-Bangladesh. All rights reserved.