|
'নারী নেতৃত্ব বিকাশ' প্রশিক্ষণ এবং শাহনাজ পারভীন
বাংলাদেশের নারীরা রক্ষণশীলতায় আবদ্ধ, পশ্চাত্পদ এবং সমাজ ও পুরুষ
শ্রেণী কর্তৃক নির্যাতিত, অবহেলিত, পীড়িত - এই বাস্তবতা আজ কেউ আর তেমন
অস্বীকার করে না
৷ পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রে নারীদের এই দুর্বল অবস্থান যুগ
যুগ ধরে টিকে থাকার অনেক কারণ রয়েছে, যার মধ্যে প্রধান হচ্ছে
পুরুষতান্ত্রিকতা
৷ কিন্তু আমরা আমাদের অতীতের দিকে তাকালে - এবং বর্তমানেও
- দেখা যায় সচেতন ও সাহসী প্রতিরোধ অনেক ক্ষেত্রেই পরিস্থিতিকে বদলে দেয়
৷
প্রতি
বাদ-প্রতিরোধের অর্ন্তশক্তি নারী ধারন করে ৷ কিন্তু বেশিরভাগ নারীর
ক্ষেত্রেই এ শক্তির জাগরণ ঘটে না, থাকে সুপ্ত অবস্থায় ৷ সুপ্ত শক্তির
জাগরণের জন্য প্রয়োজন ব্যক্তি, পরিবার, সংগঠন, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ
সহযোগিতা ৷ বাইরের সহযোগিতার স্পর্শে জেগে উঠবে নারীর মরিচিকা ধরা সুপ্ত
অথচ শক্তিশালী প্রাণটি ৷ এই জাগিয়ে দেওয়ার কাজটি অনেকেই করছেন ৷ দি হাঙ্গার
প্রজেক্ট-বাংলাদেশ ২০০৬ সালের শুরু থেকেই সারা দেশের সম্ভাবনাময়ী
নারীশক্তির বিকাশের লক্ষ্যে শুরু করেছে 'নারী নেতৃত্ব বিকাশ' শীর্ষক
প্রশিক্ষণ ৷ এই প্রশিক্ষণের ফলে একদল নারী পুরানো ধ্যান-ধারণা ঝেড়ে ফেলে
নেমে পড়েছেন আত্ম-অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে ৷ এমনি একজন নারী সাতক্ষীরার
এ্যাডভোকেট শাহনাজ পারভীন ৷
শাহনাজ পারভীন সাতক্ষীরা জজকোর্টের উকিল ৷ ইচ্ছা-অনিচ্ছার দোলাচলে
দুলতে দুলতে মার্চের শেষ সপ্তাহে যশোরের
RRF'-এ 'নারী নেতৃত্ব বিকাশ'
শীর্ষক তিন দিনের প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করেন
৷ প্রশিক্ষণের আয়োজক দি-হাঙ্গার
প্রজেক্ট-বাংলাদেশ
৷ প্রশিক্ষণের আগের এবং পরের শাহনাজ পারভীন যেন আলাদা
মানুষ
৷ মানব কল্যাণের ও নারী জাগরণের ক্ষেত্রে তার সুপ্ত কর্মইচ্ছা
আচ্ছাদন ভেদ করে, খোলস ছেড়ে বের হয়ে আসে এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে
৷
ব্যাপক উদ্দীপনা নিয়ে ফিরে যান সাতক্ষীরা
৷ মার্চের মাঝামাঝি পলাশপোল
এলাকায় জন্ম নেয় 'নবোদিত মহিলা সংঘ' নামে একটি নারী সংগঠন
৷ এই নারীরা
প্রশিক্ষণের আগে শাহনাজের কাছে এসেছে বেশ কয়েক বার
৷ তিনি গা করেন নি,
অহেতুক ঝামেলায় জড়াতে চান নি
৷ কিন্তু প্রশিক্ষণ থেকে ফিরে নিজের উদ্যোগে
যোগাযোগ করলেন তাদের সাথে
৷ সংঘের উপদেষ্টা হিসেবে যুক্ত হয়ে শক্ত হাতে হাল
ধরলেন এই সংগঠনের
৷ সিদ্ধান্ত নিলেন পলাশপোলের মাদক ব্যবসায়ী, মাদক সম্রাট
আদর আলীর কবল থেকে মুক্ত করবেন যুব সমাজকে, উচ্ছেদ করবেন তাকে
৷ এর আগেও
অনেকে চেষ্টা করেছেন, পারেন নি
৷ শাহনাজ পারভীন সংঘের ১৫০ জন সদস্যকে নিয়ে
প্রাথমিকভাবে শুরু করেন আদর আলীর দোকান পাহারা দেওয়া
৷ অতঃপর ২১ এপ্রিল
২০০৬-এ সম্মিলিতভাবে তালা ঝুলিয়ে দেয়া হয় দোকানে
৷ চলতে থাকে নানা
কর্মসূচি
৷ কিন্তু বন্ধ হয় না মাদক ব্যবসা
৷ আদর আলী বাড়িতেই পরিবারের সবার
সহযোগিতায় এ ব্যবসা চালাতে থাকে
৷ ১১ মে রাতের বেলা 'নবোদিত নারী সংঘে'র
সবাই লাঠিসোটা নিয়ে ঘেরাও করে আদর আলীর বাড়ি
৷ সাদা পোষাকে প্রবেশ করে
পুলিশ - যারা আদর আলীর সহযোগী
৷
তখন রাত প্রায় ১২টা
৷ বেজে ওঠে নারী সংগঠনের নিজস্ব সাইরেন
৷ জড়ো হয়
প্রায় ৪৫০ নারী-পুরুষ
৷ বন্দী হয় দুই পুলিশ
৷ এরপর থানার সেকেন্ড অফিসার
এসেও
বন্দী হয়
৷ এক পর্যায়ে গভীর রাতে হাজির হন এএসপি দেলোয়ার হোসেন
সাঈদী
৷ তিনি এসে গ্রেফতার করেন আদর আলীর স্ত্রীকে, ক্লোজ করেন দুই
পুলিশকে
৷ পরবর্তীতে পৌর চেয়ারম্যান ও নবোদিত সংঘের যৌথসভায় এই সিদ্ধান্ত
হয় যে আদর আলী এলাকার বাড়ি বিক্রি করে অন্য কোথাও চলে যাবে
৷ এই কাজে
শাহনাজ ছাড়াও নেতৃত্বের ভূমিকায় ছিলেন সংঘের সভাপতি মমতাজ বেগম, সাধারণ
সম্পাদিকা মিসেস মিরা, স্থানীয় মহিলা কমিশনার মর্জিনা বেগম, পৌর কমিশনার
আনিস খান চৌধুরী বকুল, এডভোকেট আনোয়ার-উস-সাদাত প্রমুখ
৷
প্রশিক্ষণ থেকে ফিরে শাহনাজ তার সহযোগীদের নিয়ে অনেক কাজে হাত দেন
৷
তাদের তত্পরতা ও চাপের ফলে পলাশপোল এলাকার কোন দোকানদার অপ্রাপ্ত
বয়স্কদের নিকট সিগারেট বিক্রি করতে পারে না
৷ নারী পাচারসহ অসত্ কাজের
সঙ্গে যুক্ত থাকা একজন মহিলাকে ইতোমধ্যেই উচ্ছেদ করা হয়েছে গ্রাম থেকে
৷
হেরোইনসেবী স্বামীর কারণে প্রায় ভেঙ্গে যাওয়া একটি সংসার পুনর্গঠন করেছেন
শাহনাজ
৷ সদর থানার মাগুরাতে তার উদ্যোগে গড়ে উঠেছে 'নবদীপ্ত নারী সংগঠন'
৷
এ ছাড়া 'সুজনে'র মানববন্ধনে যোগদান, লোডশেডিং-এর প্রতিবাদে পাওয়ার হাউজ
ঘেরাও, পহেলা বৈশাখ উদ্যাপন, মিলাদ মাহফিলের আয়োজন প্রভৃতি কাজগুলো শাহনাজ
বেগমের নেতৃত্বে 'নবোদিত নারী সংঘ' অত্যন্ত সুচারুভাবে পরিচালনা করে
যাচ্ছে
৷
একটি প্রচলিত উদাহারণ আছে ডিম নিয়ে
৷ ডিমের অভ্যন্তরীণ গুণ এবং বাইরে
থেকে তাপ প্রয়োগ - এ দুয়ের সংযোগেই ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়ে আসে
৷ দু'টো
দিকের কোনটিই কম
গুরুত্বপূর্ণ নয়
৷ শাহনাজ এবং 'নারী নেতৃত্ব বিকাশ' শীর্ষক
প্রশিক্ষণের সম্পর্কটি এরকমই
৷ কর্মশালায় অংশগ্রহণ করার পর থেকে প্রায় দুই
মাস সময়ের মাঝে অনেকগুলো কাজ করে শাহনাজ আত্মশক্তিকে অনুভব করতে পারছেন
৷
নিজের ভেতর আবিষ্কার করেছেন বিশাল সম্ভাবনা
৷ তিনি মনে করেন, "এরকম
প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নারীর ভেতরের শক্তি জাগরিত হবে, পরিবর্তিত হবে
বাংলাদেশের নারীর বর্তমান অবস্থা"৷
- আলী উমেদ
|