|
অংশগ্রহনমূলক উন্নয়ন ভাবনা
গণগবেষকদের ইউনিয়ন সমাবেশ

'নিজের অধিকারই যদি আদায় করতে না পারলাম তাহলে আর কিসের গবেষক, কিসের
উজ্জীবক হলাম? ... বাধা তো আসবেই
৷ বাধা এলেই গবেষকদের, উজ্জীবকদের থামলে
চলে না
৷ কারণ অন্যের অধিকার আদায়েও গবেষকদের দায়িত্ব রয়েছে
৷ ... আমরা
মুক্তিনগরে সংগঠন গড়ে তুলেছি, আরো সংগঠন গড়ে তুলব
৷ কারণ আমরা এখন জানি,
সংগঠন মানেই একতা
৷ আর একতা থাকলে কেউ আমাদের ঠেকাতে পারবে না
৷' কথাগুলো
বলেছেন খামার ধনারুহা গ্রামের কলেজে পড়া ছাত্র আব্দুল মমিন, যিনি নিজেকে
গণগবেষক বলে পরিচয় দেন
৷ গত ২২ মার্চ, ২০০৬-এ গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার
মুক্তিনগর ইউনিয়নে অনুষ্ঠিত গণগবেষকদের সমাবেশে মমিন এসব কথা বলেন
৷
সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন মুক্তিনগর ইউনিয়নের ১৫৬ জন গণগবেষক, যারা অধিকাংশই
অতি দরিদ্র শ্রেণীর
৷ অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ১৫১ জনই ছিলেন নারী গবেষক
৷ এই
গণগবেষকগণ সমাবেশের মধ্য দিয়ে একত্রিত হন তাদের গণগবেষণা পর্যালোচনা ও
অভিজ্ঞতা বিনিময় করতে
৷
মমিনের মতোই বলিষ্ঠ ও উদ্দীপ্ত ভঙ্গিতে সমাবেশে গণগবেষক রমিসা বেগম,
আজেদা বেগম, এনামুল হক, মোমেনা বেগম, জয়নাল আবেদীনসহ অনেকেই কথা বলেন
৷
তাঁরা যা বলেন তাকে ঠিক কোনো বক্তব্য বলা যায় না, যেন তাঁদের সঞ্চিত
অভিজ্ঞতার সাহসী ও প্রতিবাদী প্রকাশ
৷ সমাবেশের শুরুতেই অংশগ্রহণমূলক
ভাবনার স্পষ্ট প্রতিফলন চোখে পড়ে
৷ আয়োজকদের (গণগবেষক) একজন রমিসা বেগম
উপস্থিত সকলকে স্বাগত জানান এবং মুক্ত প্রশ্ন ছুড়ে দেন তাদের প্রতি-
সারাদিনে আমরা আজ কী করবো? প্রশ্ন শেষ হতে না হতেই উত্তর দেবার জন্য হাত
ওঠে দশ বারো জন গবেষকের
৷ তাঁরা একে একে যা বললেন তা গুছিয়ে বললে দাঁড়ায়-
বয়োজেষ্ঠ্য গণগবেষকদের অভিজ্ঞতা শুনবো, তাঁদের সফলতা-ব্যর্থতা শুনবো, বাধা
ও বাধা অতিক্রম করার কথা শুনবো, সংগঠন কীভাবে আরো সক্রিয় রাখা যায় এবং
নিস্ক্রিয় সংগঠনকে কীভাবে আবারো প্রাণ দেয়া যায় তাও শুনবো, সঞ্চিত অর্থ কী
কী কাজে লাগালে বেশি লাভ হবে তা শুনবো, অন্য এলাকার ইউনিয়নে ইউনিয়নে কী
ধরনের সফলতা অর্জিত হচ্ছে তা ঢাকা থেকে আগত ভাইদের কাছে শুনবো, শেষে আমরাও
বলবো
৷ এভাবে সারাদিনের এজেন্ডা চূড়ান্ত হলো
৷
গণগবেষকদের স্বাগত জানাতে এসেছিলেন স্থানীয় বেসরকারি সংগঠন উদয়ন-এর
নির্বাহী পরিচালক শাহদত হোসেন মণ্ডল
৷ তিনি বললেন, "আপনারা গবেষক, এখানে
নিজেদের গণগবেষক বলে পরিচয় দিচ্ছেন, এটা একটা ব্যতিক্রমি ঘটনা
৷ সম্মানিত
গণগবেষকবৃন্দ, আমি আপনাদের সম্মান ও শ্রদ্ধা জানাচ্ছি
৷ আপনাদের গবেষণা
সম্পর্কে কিছু কিছু আমি জানি
৷ ... আপনারা এখন অনেক অধিকার-সচেতন
৷ নিজেদের
অধিকার আদায়ে আপনারা যে কারো থেকে বেশি সোচ্চার
৷ আপনাদের সংগঠন গড়ে তোলার
প্রক্রিয়া এবং আপনাদের একতা উদ্দীপনামূলক
৷ ... আপনারা এগিয়ে চলুন, আমার
লাল সালাম রইল আপনাদের প্রতি
৷" শুধু বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠনেই নয়, এলাকার
জনগোষ্ঠীর মধ্যেও এক ধরনের ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে এই গণগবেষণার
৷ প্রবীণ
রাজনীতিক এম এ সোলায়মান আলাপকালে জানান, 'এখানকার কিছু নারী, যাঁরা
দরিদ্র, তাঁরাই না-কি কিসব বিষয়ে গবেষণা করছে, একথা শুনেছি, বিস্তারিত
এখনও জানার সুযোগ হয় নি
৷ তবে বিস্তারিত না জানলেও একথা বলতে পারি, তাঁরা
সচেতন হয়ে উঠছে, যে সচেতনতা আগে চোখে পড়ে নি
৷ ... যেমন, এ এলাকায়
বাল্যবিবাহ আগেও প্রচলিত ছিল, খুব একটা প্রতিরোধ-উদ্যোগ দেখি নি, যে
দু'একটা উদ্যোগ থাকত, তা ছিল শুধুমাত্র শিক্ষিতদের মধ্যে
৷ কিন্তু এখন
দেখি, এই সকল নারী-গবেষকরা বাল্যবিবাহ একেবারে ঠেকিয়ে দিচ্ছেন
৷ আমার
দৃষ্টিতে যেটা খুবই আকর্ষণীয় তা হলো, তাঁরা সংগঠিত, তাঁদের মধ্যে একতা আছে
বলেই এটা যে কারো চেয়ে বেশি পারছে
৷'

উন্নয়ন ভাবনার মূল কথাই হলো- মানুষের সৃজনশীলতার মুক্তি, বলেছেন
গণগবেষণার অন্যতম উদ্ভাবক অর্থনীতিবিদ আনিসুর রহমান
৷ মুক্তিনগর ইউনিয়নে
সেই সৃজনশীলতা মুক্তিরই যেন বান ডেকেছে
৷ গণগবেষক রমিসা বেগমের কথাতেও সেই
প্রতিধ্বনি স্পষ্ট হয়ে ওঠে
৷ তিনি বলেন, "আজকে আমরা সবাই কথা বলব
৷ শুধু
'শোনা উল্লা' হবো না, এতদিন তাই হয়েছিলাম এবং ঠকেছি
৷ আমরা এখানে আজ আমাদের
অধিকার আদায়ের কথা বলব
৷ অধিকার কেউ কাউকে দেয় না, আদায় করে নিতে হয়
৷ ...
প্রথমে উজ্জীবক, পরে গণগবেষক হবার পর বুঝেছি, নিজের অধিকার নিজেকেই আদায়
করতে হবে
৷ তার উপর যারা দুর্বল, তাদের অধিকার আদায়েও কাজ করতে হবে
৷ আপনারা
ভালো করে শোনেন, আমি গত সপ্তাহেও একটা বাল্যবিবাহ বন্ধ করেছি
৷ গত মাসে
দু'টি বন্ধ করেছি
৷ প্রথমে আমার কথা শুনতে চায় নি, পরে মমিন, এনামুলকে নিয়ে
বোঝাই, তাতেও পুরো কাজ না হওয়ায় চেয়ারম্যানকে জানাই
৷ এরপর সে বিয়ে বন্ধ
হয়
৷ এর আগে আর এক মেয়ের বাবা-মা কথা শোনে নি, কাজীকে বলেছি, এ বিয়ে পড়াবেন
না, কারণ এটা বেআইনী
৷ কাজী কথা না শোনায় কাজীর বিরুদ্ধে মামলা করে দিয়েছি
৷
... এভাবেই আমরা এ এলাকা থেকে বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে চাই
৷ আপনারা সবাই কি
তা চান? বলেন, রমিসা বু যেখানে আছে আপনারা সেখানে থাকবেন
৷ সবাই চিত্কার
করে বলে - আমরা আছি
৷ ... আমরা ঠিক থাকলে থানাও কিছু করতে পারবে না
৷ তবুও
আমাকে যদি ধরে, আপনারা কি বসে থাকবেন? সবাই বলে - না
৷ ... পুলিশ কতজনকে
ধরবে, থানায় জায়গা হবে না
৷ ... আমরা বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করব, করব, করব
৷"
চিন্তার স্বাধীনতা থাকলে এবং তার চর্চার সুযোগ থাকলে মানুষ যে কতখানি
স্পষ্টবাদী হয়ে ওঠে তার প্রমাণ মেলে গণগবেষক মোমেনা বেগমের কথায়
৷ তিনি
বলেন, "... ভাইরে, উজ্জীবক না হলে আর গবেষণা না করলে বোকাই থাকি যেতাম
৷
এখন দেখি কেটা ঠকায় হামাক
৷ সেদিন এক ভ্যানচালক বলে যে, মেয়েরা এসব
(বাল্যবিবাহ বন্ধ) করে বলে পুরুষদের হায়াত কমে যাচ্ছে
৷ এ কথা শোনার পর তো
আমার খুব রাগ হলো৷ আমি বলি, কিভাবে হায়াত কমে? উত্তর দিতে না পারলে বলেছি,
না জেনে কথা বলেন কেন? খবরদার এই ধরনের কথা আর জীবনে বলবেন না
৷ ... আমিও
একটা বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে গিয়ে বিপদে পড়েছিলাম
৷ আমার বাড়িঘর ভাঙ্গতে
চেয়েছিল
৷ আমি ভয় করি নি
৷ আমিও বলেছি, বিয়া পড়াতে পারলে পড়ান, আমি থানায়
ফোন করব
৷ ওই বিয়া হয় নাই
৷ পরে মেয়ের বয়স হলে বিয়া হয়, যৌতুক ছাড়া
৷ ...
গরীবের বিচার নাই বাহে
৷ তাই হামারগরে একতা না হলে চলবে না
৷ ... আমাদের
সমিতিতে
বর্তমানে ৬০,০০০ টাকা আছে ৷ এই টাকা আমরা নিজেরা খাটাই ৷ ওইসব কিস্তি
দেয়া ঋণ ব্যবসা করি না ৷ কাউকে আমরা ওই কিস্তি দেয়া ঋণের টাকা নিতেও দেই
না ৷ আমাদের টাকা আমরা কৃষি ও ব্যবসায় লাগাবো ৷ তখন আমাদের আরো শক্তি
বাড়বে ৷"
গণগবেষণার ফলে ঘটেছে চিন্তার স্ফূরণ ৷ সে কথাই বললেন গণগবেষক জয়নাল
আবেদীন, "উজ্জীবক হলে অনেক দূর পৌঁছা যায়, অনেক উন্নয়ন করা যায় ৷ আমি
গবেষণা করি ৷ গবেষণা করে অনেক কিছু আবিষ্কার করা যায় ৷ চিন্তা করে নতুন পথ
বের করা যায় ৷ আমি নতুন পথ খুঁজে পেয়েছি ৷ এখন আমি বুঝি, আমি কী করতে পারি,
কীভাবে তা করতে পারি ৷ ... কৃষক একতা সমিতি গঠন করেছি ৷ বর্তমানে সেখানে
সঞ্চয় ২৬,০০০ টাকা ৷ সবাই সপ্তাহে দুই টাকা করে জমাই ৷ এ টাকা দিয়ে ছাগল,
গরু কিনেছিলাম ৷ সে গরু মরে যায়, লোকসান হয় ৷ পরে গবেষণা করে বের করেছি, গরু
ছাগলে আর হবে না ৷ এখন জমিতে বিনিয়োগ করি ৷ জমি বন্ধক নিয়েছি ৷ সে জমি চাষ
করি ৷ এতে কোনো লোকসান নেই ৷ গবেষণা না করলে এটা জানা হতো না ৷ ... আমার বউ
এবার কলেজে ভর্তি হবে ৷ সবাই হাসে ৷ আমার ভালো লাগে ৷ বউকে শিক্ষিত করেছি ৷
অথচ আমি মুর্খ ৷ আমি সচেতন হয়েছি বলেই এটা করেছি ৷ গবেষক না হলে এটা খুঁজেই
পেতাম না ৷" গণগবেষক আজেদা বেগম বলেন, "... গবেষক হবার পর বছরখানেক আগে গড়ে
ওঠা এবং প্রায় স্থবির হয়ে যাওয়া ২৮টা সমিতিকে সক্রিয় করি ৷ আমার সংগঠনে এখন
৭০,০০০ টাকা আছে ৷ ... হামরা গবেষক হবার পর এখন খালি একপাকে চিন্তা করি না,
নানানটা চিন্তা করি ৷ ... অন্যায় দেখলে বাহে এখন হামার গায়ের রক্ত খালি
টগবগ করে ওঠে ৷ অ্যালা পুলিশ হোঁক আর যাই হোঁক, কাক্কোই মানবার নই ৷"
"আত্মশক্তিতে বলীয়ান ব্যক্তি কখনো দরিদ্র থাকতে পারে না"-এর প্রতিফলন
অস্পষ্ট করে হলেও দেখা যায় পুরো মুক্তিনগরে, আর স্পষ্ট করে এই গণগবেষকদের
জীবনে ৷ গণগবেষকরা এখানে নিজেদের সমস্যা নিজেরাই চিহ্নিত করেন, এর সমাধানের
পথও তারাই খুঁজে বের করেন, অন্যের জন্য স্বাধীনভাবে চিন্তা করার সুযোগ
সৃষ্টি করেন, পালন করেন সহায়কের ভূমিকা ৷ এসবের ফলাফলও পাচ্ছেন তারা ৷ এভাবে
নিজেদের পারদর্শিতা নিজেরা দেখে, অন্যদের দ্বারা প্রশংসিত হয়ে তারা আরো
আত্মশক্তিতে বলীয়ান হয়ে উঠছেন ৷ তরুণ (ছাত্র) গণগবেষক এনামুল হক বলেন,
'আমরা প্রতিদিন শিখছি ৷ শিখছি মানুষের সাথে কথা বলতে গিয়ে, শিখছি কোনো
সমস্যা চিহ্নিত করতে ও তার সমাধানের পথ খুঁজতে গিয়ে, শিখছি ভুল করেও ৷ ...
এভাবে চলতে থাকলে আমরা পুরো মুক্তিনগরের চেহারা পাল্টে দিতে পারবো ৷ এমনকি
পুরো বাংলাদেশকেও ক্ষুধামুক্ত করে তুলতে আমাদের বেগ পেতে হবে না ৷ ...
আমাদের একটু সমস্যা, তা হলো এভাবে কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিল না, এখন হচ্ছে ৷
... উজ্জীবক হবার পর বুঝেছি যে আমরা কীভাবে এতদিনের পুরোনো চিন্তা,
সংস্কৃতিতে আঘাত করছি ৷'
- মানিক মাহমুদ
|