রূপসা পাড়ের অদম্য জীবনের কথকতা
খুলনা শহর থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে যেতে থাকলে প্রায় ৮ কি.মি পরে চোখে পড়বে- একটি
জায়গা ঘিরে গড়ে উঠেছে বেশ ক'টি ছোট ছোট দোকান
৷
জায়গাটুকু পেরিয়ে একটু সামনে এগুলেই ফেরিঘাট
৷
এখানে এসে মিলেছে রূপসা, কাজীবাছা আর শৈলমারী- এই তিন নদীর স্রোতধারা
৷
পাঁচ থেকে সাত মিনিটেই ফেরি পৌছে যাবে ওপাড়ে
৷
এখানে রয়েছে একটি বড় বাজার
৷
এটিই বটিয়াঘাটার মূল বাজার
৷
বাজারে আর ফেরিঘাটে চোখে পড়বে ব্যস্ত মানুষের চলাচল
৷
'ব্যস্ত ঘড়ির কাঁটা' থেমে যায় যে 'বৃষ্টিমুখর লাজুক গাঁয়ে' এটি তেমন মন্থর গ্রাম নয়
একটি গতিশীল জনপদের প্রানচাঞ্চল্য এখানে অনুভব করা যাবে সহজেই
৷
এখানে এলে কৃষাণের শ্রম, ঘাম আর সারল্যমাখা জনজীবনের আহবানে এক মূহুর্তে মুছে যায়
নাগরিক ক্লান্তি
৷
ক্লান্তিহরা এই সবুজ জনপদের সাফল্যের ইতিবৃত্তই আজকের গল্প
৷
|
২নং বটিয়াঘাটা ইউনিয়নের আয়তন ১১০.২৭ কিমি ৷ মোট ১৮টি গ্রাম রয়েছে এ ইউনিয়নে ৷ জনসংখ্যা- পুরুষ: ৯৪২৫, মহিলা: ৯১৮২ জন ৷ ইউনিয়নের অধিকাংশ মানুষই কৃষিজীবি ৷ |

একজন মনোরঞ্জন মন্ডল-
তৃনমূলের কাঙ্খিত জনপ্রতিনিধির প্রতিমূর্তি
২নং বটিয়াঘাটা ইউনিয়নের
চেয়ারম্যান মনোরঞ্জন মন্ডল
৷
১৯৯৬ সাল থেকে তিনি এ ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আছেন
৷
রাজনীতির সাথেও তাঁর সম্পৃক্ততা দীর্ঘদিনের
৷
লুটপাট, অর্থ, অস্ত্র আর ক্ষমতার রাজনীতি নয়, গণমানুষের প্রকৃত মুক্তির লড়াই-এ
সামিল থেকে রাজনীতি করেছেন মনোরঞ্জন মন্ডল
৷
তাঁর গণসম্পৃক্ততাই তাঁকে মানুষের কাছে আস্থার পাত্র করে তুলেছে
৷
এই আস্থাই তাকে দিয়েছে নেতৃত্ব, দিয়েছে কর্মপ্রেরণা আর প্রতিশ্রুতি পালনে তাঁকে
করেছে দায়বদ্ধ
৷
১৯৯৯ সালে সাতক্ষীরায় অনুষ্ঠিত ২২-তম উজ্জীবক প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছিলেন মনোরঞ্জন
মন্ডল
৷ চারদিনব্যাপি এ প্রশিক্ষণে প্রাধান্য পেয়েছিলো যেসব বিষয়, তার মধ্যে ছিলো-
মানুষের আত্মশক্তির গুরুত্ব ও ক্ষমতা, আমাদের দারিদ্রের প্রকৃত কারণ উন্মোচন,
প্রচলিত উন্নয়ন কৌশলগুলোর ত্রুটি ও অসারতা, বিকল্প উন্নয়ন কৌশলের অন্বেষা,
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান তথা ইউনিয়ন পরিষদের দায়িত্বের ব্যাপকতা, স্থানীয় জনগণের
সম্পৃক্ততায় স্থানীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রনয়ণ, নারীর ক্ষমতায়ন ইত্যাদি। দায়িত্বশীল
নেতা মনোরঞ্জন মন্ডলের দায়িত্বের বোধ আরও শানিত হয়েছিলো এ প্রশিক্ষণে
৷ তাঁর সচেতন
নেতৃত্বে বটিয়াঘাটা ইউনিয়ন পরিষদ এখন অত্যন্ত সক্রিয়
৷ স্ট্যান্ডিং কমিটির সভা হয়
নিয়মিত
৷ সভায় সবার মতামতের প্রেক্ষিতে গ্রহণ করা হয় সিদ্ধান্ত
৷ সংরক্ষিত মহিলা আসনে
নির্বাচিত প্রতিনিধিরা পরিষদের কাজে অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন
৷ ইউনিয়নে
ট্যাক্স কালেকশনের হার অত্যন্ত সন্তোষজনক
৷ গড়ে প্রতিবছর ৮৩-৮৫% রাজস্ব আদায় হয়
এখানে
৷ তবে গত অর্থবছরে ফসলহানির কারণে এই হার সামান্য কমে গিয়েছিলো
৷ শিক্ষা,
পুষ্টি, স্যানিটেশন, জন্মনিয়ন্ত্রন আর যৌতুক রোধের মতো সামাজিক বিষয়গুলোতে
বটিয়াঘাটায় অনন্য সাফল্য অর্জিত হয়েছে
৷ হিন্দু সম্প্রদায়ের বিয়েতে যৌতুক এক অভিশপ্ত
প্রথা
৷ এর উচ্ছেদে ইউনিয়নের গন্যমাণ্য ব্যক্তিবর্গকে নিয়ে গঠিত হয়েছে-'যৌতুক নিরোধ
কমিটি'
৷ এই কমিটির উদ্যোগে সারা বছর তো বটেই, পূজার সময় মন্ডপে মন্ডপে যৌতুকবিরোধী
প্রচারণা চালানো হয়
৷ ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে মহিলা মেম্বারদের নেতৃত্বে এ কমিটি তার
কার্যক্রম পরিচালনা করে
৷ ২০০২ এর শেষের দিকে মনোরঞ্জন বাবুর উদ্যোগে বটিয়াঘাটায়
অনুষ্ঠিত হয় ৬১-তম উজ্জীবক প্রশিক্ষণ
৷ এ প্রশিক্ষণে ইউনিয়ন পরিষদের সকল সদস্য-সহ
মোট ৬৫ জন 'উজ্জীবক' হিসেবে শপথ নেন
৷ পরবর্তীতে এখানে অনুষ্ঠিত ১৫৫-তম, ২৩৯-তম,
৪১৩-তম উজ্জীবক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এ ইউনিয়নে উজ্জীবকদের সংখ্যা আরও বাড়ে
৷ এই
উজ্জীবকগণই স্থানীয় নেতৃত্বের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে এলাকার সামাজিক-অর্থনৈতিক
পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তনে নিরন্তর ভূমিকা রেখে চলেছেন
৷ বটিয়াঘাটায় যে
গণসম্পৃক্ত উন্নয়ন প্রচেষ্টা
শুরু হয়েছে, তা সম্ভব
হয়েছে মনোরঞ্জন মন্ডলের মতো দায়বোধসম্পন্ন ও কর্মঠ নেতার আন্তরিক কর্মোদ্যোগের
কারণে
৷
শিক্ষাই শক্তি
ইউনিয়ন পরিষদ আর উজ্জীবকদের সমন্বিত নেতৃত্বে জীবনমানের সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে
যে কর্মকান্ড পরিচালিত হচ্ছে
বটিয়াঘাটায়, তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র- শিক্ষা, চেয়ারম্যান মনোরঞ্জন মন্ডল
ব্যক্তিগতভাবে শিক্ষকতা পেশার সাথে যুক্ত
৷ তিনি নিজে উচ্চশিক্ষিত এবং তাঁর
শিক্ষাভাবনা অত্যন্ত আধুনিক
৷ উন্নত রাষ্ট্রের শিক্ষাপদ্ধতির সাথে প্রত্যক্ষ পরিচয়
থাকায় তিনি সর্বদাই চেষ্টা করেন তাঁর ইউনিয়নের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আধুনিক
শিক্ষাদানপ্রনালী চর্চা করার
৷ প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার ক্লান্তিকর একঘেয়েমি দূর
করতে নিজে সচেতন প্রচেষ্টা চালান তাঁর শ্রেনীকক্ষে
৷ অন্যান্য শিক্ষকদেরকেও
সৃষ্টিশীল হয়ে উঠতে সহায়তা করেন
৷
বটিয়াঘাটা ইউনিয়নে প্রাইমারি স্কুলের মোট সংখ্যা ১৮টি- এর মধ্যে ১২টি সরকারি, হাইস্কুল ৬টি- ৩টি মেয়েদের ও ৩টি ছেলেদের এবং রয়েছে
একটি ডিগ্রী কলেজ
৷ শিক্ষার ইউনিয়নব্যাপি কার্যক্রমকে তত্ত্বাবধান এবং শিক্ষা
প্রতিষ্ঠানসমূহে শিক্ষার অগ্রগতি পর্যালোচনা করার জন্য গঠিত হয়েছে 'ইউনিয়ন শিক্ষা
কমিটি'
৷ এই কমিটিতে আছেন ইউনিয়নের নির্বাচিত প্রতিনিধি, শিক্ষক ও অভিভাবক
প্রতিনিধি
৷ স্কুলের ছাত্র উপস্থিতির হার এবং শিক্ষার মান নিয়মিত এই কমিটির মাধ্যমে
মনিটরিং করা হয়
৷ এর পাশাপাশি কমিটির পক্ষ থেকে নিয়মিত পরিচালনা করা হয় উদ্ধুদ্ধকরণ
কর্মসূচি
৷ আনুষ্ঠানিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাইরেও উজ্জীবকদের ব্যক্তিগত ও যৌথ
উদ্যোগে গড়ে উঠেছে ছোট-বড় অনেকগুলো অনানুষ্ঠানিক শিক্ষালয়
৷
এগুলো মূলত উজ্জীবকদের স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতেই পরিচালিত
৷
|
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম |
শিক্ষক সংখ্যা |
ছাত্র-ছাত্রী |
| মাইটভাঙ্গা গণ-শিক্ষা কেন্দ্র | ৩ জন | ৪৫ জন |
| হেতালবুনিয়া বয়ষ্ক শিক্ষা কেন্দ্র | ২ জন | ২৪ জন(নিয়মিত), ১০ জন(অনিয়মিত) |
| হেতালবুনিয়া ফ্রি কোচিং সেন্টার | ৩ জন | ২৮ জন |
| রক্তিম রবি পাঠশালা (মক্তব) | ১ জন | ২১ জন |
| উদ্দীপন স্কুল | ৫ জন | ১৪৫ জন |
| বাগলোডাঙা বয়স্ক শিক্ষা কেন্দ্র | ২ জন | ২৫ জন |
| হোগলবুনিয়া গণ-শিক্ষা কেন্দ্র | ২ জন | ২৭ জন |
চেয়ারম্যানের
ঐকান্তিক প্রচেষ্টা, শিক্ষা কার্যক্রমে ইউপি বডির সংশ্লিষ্টতা,
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে নিয়মিত মনিটরিং এবং উজ্জীবকদের প্রচারাভিযান ও ধারাবাহিক
উদ্যোগের ফলে বটিয়াঘাটা অনন্য সাফল্য অর্জন করেছে শিক্ষাক্ষেত্রে।
ইউনিয়নে সাক্ষরতার হার এখন শতকরা ৯৮ ভাগ।
এক ঝাঁক উদ্যমী তরুণ হাল ধরেছে জীবনের.....
বটিয়াঘাটা ফেরিঘাটের এপাড়ে ঘাট সংলগ্ন জমিতে রয়েছে একটি তিন বিঘার পুকুর। তার পাড়ে
একটি কুড়ে। কুড়েতে বস্তা ভরে রাখা আছে মাছের খাবার৷ কাজল মল্লিক যখন গামলা থেকে এই
খাবার ছিটিয়ে দিতে থাকেন পুকুরের পানিতে, তখন পুকুরের নিথর জল কেঁপে ওঠে প্রচন্ড
আলোড়নে। ঝাঁকে ঝাঁকে মাছ মাথা তোলে পানির উপর। তাদের পিচ্ছিল রূপালী শরীরে রোদ পড়ে
ঝলমলিয়ে ওঠে পুকুরের পানি। সেদিকে তাকিয়ে কাজলের চোখেও ঝিলিক দিয়ে যায় আশার আশ্বাস।
সুপদ মল্লিকের ছোট ছেলে কাজল মল্লিক এই পুকুর থেকে প্রথম মৌসুমেই লাভ করেছেন দেড়
লাখ টাকা। চলতি মৌসুমে তার লাভের লক্ষমাত্রা আড়াই লাখ টাকা। ২৭০-তম ব্যাচে উজ্জীবক
প্রশিক্ষণ নেয়া কাজল মল্লিকের জীবন আজ পাল্টে গেছে পুরোপুরি।
বেকার জীবনের হতাশাভরা আলস্য হার মেনেছে সাফল্যভরা কর্মোদ্দীপনার কাছে।
কাজল মল্লিকের মতোই বটিয়াঘাটার এক ঝাঁক তরুণ নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন নিজেদের
জীবনের দায়িত্ব
৷ উজ্জীবক প্রশিক্ষণের শিক্ষা পাল্টে দিয়েছে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি
৷
প্রশিক্ষণের সুগভীর প্রেরণা দীপংকরকে করে তুলেছে সামাজিক আন্দোলনের অসাধারন সংগঠক,
বাউন্ডুলে পল্লব মোবাইলের দোকান দিয়ে এখন জীবনকে গুছিয়ে নিয়েছেন, অলস দিন কাটানো
ঝংকার এখন এলাকায় দক্ষ ইলেকট্রিশিয়ান হিসেবে সুপরিচিত
৷ দীপংকর, পল্লব, ঝংকারের মতো
তরুণদের সংখ্যা এখন দিন দিন বাড়ছে বটিয়াঘাটায়
৷ এই তরুণ উজ্জীবকরা কেবল নিজেদের
জীবনের গতিমুখই পাল্টে দিচ্ছে না, পাল্টে দিতে চাইছে তাদের সামাজিক জীবনটিকেও
৷ তাই
নিজস্ব জীবিকার তাগিদ মেটাবার পর তারা একযোগে কাজ করছে শিক্ষার প্রসারে, পরিবেশ
সংরক্ষণে, যৌতুক-পাচার-বাল্য বিবাহ রোধের মতো সামাজিক সমস্যাগুলোর নিরসনে
৷
|
© 2005 The Hunger Project-Bangladesh. All rights reserved. |